সালাফী হলো, যারা সালাফে সালেহীনের পদ্ধতির উপর চলে, কিতাবুল্লাহ(আল্লাহর কালাম – কোরআন) এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর অনুসরণ করে, সে পথে দাওয়াত দেয় এবং এর উপর আমল করে। আর উল্লেখিত কাজ-কর্ম যারাই সম্পাদন করে তারা সবাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

“সালাফে সালেহীন” (السلف الصالح) বলতে সেই পূর্বসূরিদের বোঝানো হয়, যারা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের ধারক-বাহক।
১/ সাহাবা
২/ তাবেয়ীন
৩/ তাবা-তাবেয়ীন

“আহলুস সুন্নাত” অর্থ “সুন্নাহর অনুসারী” এবং “ওয়াল জামাত” অর্থ “একতা বা সম্মিলিত দল”। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

“আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে শুধু একটি দল জান্নাতে যাবে। তা হলো ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’।” (তিরমিজি: ২৬৪১)

পরবর্তী সময়ে, “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ” শব্দগুচ্ছটি আকীদাহ (বিশ্বাস) এবং মাজহাব (ইসলামী আইন) উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন মাজহাব (যেমন, হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি) নিজেদের “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ” হিসেবে পরিচয় দেন, কারণ তারা সকলেই রাসূল (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্দেশনা অনুসরণ করার দাবি করেন​।

ইসলামে দল বা জামাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। রাসুল সাঃ বলেন,
“তোমরা জামাতকে ধরে রাখো, কেননা নেকির কাজ জামাতের মধ্যেই রয়েছে, আর জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে শয়তানের শিকার হওয়া।” (তিরমিজি: 2165)

অনেকেই মনে করে যে প্রচলিত অন্যান্য দল বা সংগঠনের মত সালাফিয়্যাহ ও একটি দল বা সংগঠন। আসলে সালাফিয়্যাহ তেমন কোন দল বা সংগঠনে নয় যা উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট। বরং মানহাজে সালাফিয়্যাহ হলো সালাফে সালেহীনের(মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার পরবর্তী তিন প্রজন্ম) প্রতি সম্বন্ধ করা ও তাদের মানহাজ অনুসরণ করা। আর এই মানহাজের অনুসারী দল হচ্ছে “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ”।

সালাফি আক্বীদাহ কোন যুক্তি বা দর্শন দিয়ে প্রমানিত নয়। এই আক্বীদাহ শুধুমাত্র কোরআন এবং সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত। যার কারনে সালাফি আক্বীদাহে কোন ভুল নাই আবার কোন সংশোধন বা পরিবর্তনের সুযোগ নাই। সালফে সালেহীনগন কোরআন এবং সুন্নাহকে যেভাবে বুঝেছেন এবং আমল করেছেন ঠিক সেইভাবে সেই ‘বুঝ’ নিতে হবে এবং আমল করতে হবে, এটাই সালাফিজম। এই কারনে সালাফি আক্বীদাহ পোষন করা সবচাইতে নিরাপদ। কারন আমরা দেখেছি যুগে যুগে আক্বীদাহের মাঝে বিভ্রান্তি প্রবেশ করেছে যা ইতিপূর্বে রাসুল সাঃ আমাদের বলে গিয়েছেন,

“মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার যুগের লোকেরা, এরপর তারা যারা তাদের পরে আসবে, এরপর তারা যারা তাদের পরে আসবে। এরপর এমন এক জাতি আসবে, যাদের কেউ সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই শপথ করবে এবং শপথ করার আগেই সাক্ষ্য দেবে।”
(সহিহ বুখারি: হাদিস 2652, সহিহ মুসলিম: হাদিস 2535)

“শেষ যুগে এমন মিথ্যাবাদী দাজ্জালরা আসবে, যারা তোমাদের কাছে এমনসব (বানোয়াট) হাদিস নিয়ে আসবে যা তোমরা কিংবা তোমাদের পূর্বপুরুষরা কখনো শোননি। সুতরাং, তোমরা তাদের থেকে সাবধান থেকো, যেন তারা তোমাদের বিভ্রান্ত বা বিপথগামী করতে না পারে।”
(সুনান আত-তিরমিজি: হাদিস 2222)

“কিয়ামতের আগে অনেক মিথ্যাবাদী আসবে। অতএব, তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাকো।” (সহিহ মুসলিম: হাদিস 2937)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন,
‘‘তোমাদের উপর ওয়াজিব হলো আমার সুন্নাত এবং আমার মৃত্যুর পর আমার ছাহাবায়ে কিরামের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে। আর তোমরা ধর্মের নামে নব আবিষ্কৃত বিষয়াবলি থেকে সতর্ক থাকবে কেননা প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।’’
জামে তিরমিজি — (হাদিস নম্বর: 2676) সুনান আবু দাউদ — (হাদিস নম্বর: 4607) মুসনাদ আহমদ — (হাদিস নম্বর: 17145)

তাহলে পরিষ্কার বুঝা গেলো যে সাহাবায়ে কেরামের উপর ভালো ধারণা রাখা এবং তাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। কিন্তু শিয়ারা কিছু সাহাবীদের উপর ভালো ধারণা রাখে না। এভাবে সালাফিজমের মূল নীতি দিয়ে খুব সহজেই ভ্রান্ত আক্বীদাহ ধরে ফেলা সম্ভব।

বিগত পর্বের কিছু আক্বীদাহ যদি খুব সংক্ষেপে রিক্যাপ করি এবং এর সাথে সালাফিজম তুলনা করি,

আল্লাহর সিফাত মাখলুকের মত যারা বলে এরা হচ্ছে মুজাসসিমা। আর মুশাব্বিহা হলো তাশবি করা, সাদৃশ্য করা, মাখলুক বা সৃষ্টির সাথে আল্লাহকে সাদৃশ্য করে ফেলেছে এরা। এজন্যে এই মতবাদকে বলা হয় মুজাসসিমা-মুশাব্বিহা।

আর জাহাম ইবনে সফওয়ানের মতবাদকে বলা হয় মুয়াত্তিলা। যা ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (৬) – জাহমিয়া মতবাদে বিস্তারিত লিখা আছে।

মুজাসসিমা-মুশাব্বিহা এবং মুয়াত্তিলার মাঝামাঝি হচ্ছে আহলুস সুন্না ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত আল্লাহর কোন সিফাত অস্বীকার করেনা আবার ব্যাখ্যাও করেনা বা আল্লাহর সিফাতকে কোন মাখলুক না মানুষ মতও মনে করেনা। যেভাবে বলা আছে ঠিক সেভাবে বিশ্বাস করে। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন, ‘তার মতো কিছুই নেই, তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’ (আশ-শুরা, ৪২/১১)। ইমাম মালেক রা: বলেছেন, আল্লাহর সিফাত আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবে ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এর ধরন সম্পর্কে আমরা জানিনা এবং এ সম্পর্কে কোন প্রশ্নও করবোনা।

মনে আছে? ইমাম আশয়ারী হাম্বলী মেথডলজিতে যুক্ত হয়ে আবার বের হয়ে গিয়েছিলেন। কারন সেখানে যুক্তি-বুদ্ধির সুযোগ কম। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহে বিশ্বাসী। যার প্রমান ওনার আক্বীদাহের বই আলফিকহুল আকবার যা বাংলায় অনুবাদ ব্যাখ্যা করেছেন খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাঃ)।

আসলে আক্বীদাহের মূলনীতি সোজা রাস্তায়, সহজ ও সরল বিশ্বাসে। এই ব্যাপারে ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাজির একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়,

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাজি ছিলেন একজন বিখ্যাত ইসলামী দার্শনিক, তাফসীরবিদ, এবং আশআরি মতবাদের অন্যতম প্রধান সমর্থক। তিনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময় যুক্তিবাদ, দার্শনিক বিতর্ক এবং ইসলামের বিষয়গুলোকে যুক্তি ও দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ করার জন্য ব্যয় করেছিলেন। তবে তার জীবনের শেষ সময়ে তিনি এই জটিল দর্শন ও যুক্তি-নির্ভর পথকে অকার্যকর এবং অস্থির মনে করেছিলেন। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের সরল ও সহজ বিশ্বাসের প্রশংসা করেছিলেন।

ইমাম রাজি তার মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় বলেছেন: “আমি জীবনভর দর্শন ও যুক্তি নিয়ে গবেষণা করেছি, কিন্তু এসব থেকে কোনো প্রকৃত শান্তি বা তৃপ্তি পাইনি। যদি সম্ভব হয়, নিসাপুরের সেই বৃদ্ধার আক্বীদাহ আমাকে এনে দাও।”

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাজি একবার নিসাপুর গিয়েছিলো এবং সেখানে সবাই তার পিছনে দৌড়াচ্ছিলো তো এক বুড়ি জিজ্ঞেস করছিলো তোমরা দৌড়াচ্ছ কেন? তো উত্তর আসলো যে এখানে একজন আলেম এসেছে যে আল্লাহর অস্তিত্ব সমপর্কে ১০১ টা দলিল জানে। তো বুড়ি তখন বললো যে আলহামদুলিল্লাহ আমার ১০১ টা সন্দেহ নাই দলিলেরও দরকার নাই।

ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাজি মৃত্যুর সময় বলছিলেন যে শয়তান তো আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। একবার বলছে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্ভব। আরেকবার বলছে সম্ভব না। তো এই সম্ভব আর অসম্ভবের মাঝে আমার ঈমান চলে যাচ্ছে। তোমরা কে আছ ঐ বুড়ির ঈমান এনে দাও আনি সেই ঈমান নিয়ে মরতে চাই।

এজন্যে বলা হয় শেষ জীবনে উনি সহিহ আক্বীদাহে ফিরে এসেছিলেন কিন্তু ওনার অনুসারীগন ফিরে আসেনাই।

আরো একটি বিষয় এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, তা হচ্ছে অনেক প্রসিদ্ধ ইমাম ছিলেন, যারা দীনের অপরিসীম খেদমত করেছেন। উস্তাদ বা পরিবেশ বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা কোনো কোনো সময় পরবর্তী জাহমিয়াদের কোনো কোনো মত গ্রহণ করেছেন বলে দেখা যায়। তাদেরকে জাহমী যেমন বলা যাবে না, তেমনি তাদেরকে এসব ভুলের কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বাইরেও বলা যাবে না। বরং বলা হবে, তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ইমাম, যদিও তারা অমুক অমুক মাসআলায় ভুল করেছেন। তাদের ভুলগুলো তুলে ধরে সাবধান করতে হবে যাতে কেউ তা গ্রহণ না করে। সাথে সাথে তাদের সম্মানের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। যেমন ইমাম নাওয়াওয়ী, ইমাম ইবন হাজার। তারা আসলে আশ‘আরী বা মাতুরিদী মতবাদের লোক নন, যদিও তাদের মধ্যে কিছু কিছু মাসআলায় আশআারী ও মাতুরিদীদের মতবাদ দেখা গেছে। তাদের ব্যাপারে খারাপ কোনো কথা বলা কোনোভাবেই সমীচিন হবে না। তবে যারা এসব ভ্রান্ত জাহমী আকীদা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তাদেরকে আশ‘আরী ও মাতুরিদীই বলতে হবে, তারা কখনো আহলুস সুন্নাত এর ইমাম নন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *