জাবরিয়া সম্প্রদায়:-
আরবি ‘জাবর’ শব্দ হতে ‘জাবরিয়া’ শব্দটি উদগত হয়েছে। ‘জাবর’ অর্থ হচ্ছে বাধ্যতা, নিয়তি, অদৃষ্ট, বাধ্যবাধকতা। অদৃষ্টবাদ (Fatalism) বা আল্লাহর স্বেচ্ছাচারে বিশ্বাস করার জন্য এ সম্প্রদায় ‘জাবরিয়া সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত। এটা জাহম বিন সাফওয়ান এর জাহামি মতবাদের একটা ব্রাঞ্চ বলা যেতে পারে।
জাবরিয়া সম্প্রদায় উমাইয়া বংশের শাসনামলে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। অন্য কথায় উমাইয়া শাসকগণ জাবরিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। যারা মনে করে মানুষের কর্মের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাও নেই; মানুষ জড় পদার্থ বা পুতুলসম। তথা- “ছায়াবাজি পুতুলরূপে গড়াইয়া মানুষ যেমনে নাচায় তেমনে নাচে পুতুলের কি দোষ?” তাদের মতে, মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী নয়।
তাদের এই কথা মোটেও ঠিক নয়। কারণ মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে জন্মগতভাবেই বিবেক, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা সেটআপ করা আছে। যা দিয়ে মানুষ ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করে ভালকে ভাল হিসেবে গ্রহণ এবং মন্দকে মন্দ হিসেবে বর্জন করার ক্ষমতা রাখে। তার মাঝে এই স্বাধীনতা আছে বলেই চলার পথে ইসলামী জীবনবিধান দেওয়া হয়েছে এবং তার ভাল-মন্দ আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষকে জড়পদার্থের মতো পুতুল ও অসহায় করে সৃষ্টি করা হয়নি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার প্রতি সামান্যতম অবিচারও করবেন না।
জাবরিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠিত কোন স্কুল অব থট (চিন্তাধারা) নয়, তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী এই শব্দটি ব্যবহার করেছে তাদের বিরোধীদের মতবাদের সমালোচনার জন্য।
যেমনঃ
আশ’আরীরা প্রথমে “জাবরিয়া” শব্দটি জাহম ইবনে সাফওয়ানের অনুসারীদের জন্য ব্যবহার করেছিল।
আবার মু’তাজিলারা আশ’আরীদের “জাবরিয়া” বলে অভিহিত করত। তাদের মতে, আশ’আরীরা মুক্ত ইচ্ছার (free will) প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে আশ’আরীরা এই দাবিকে নাকচ করে।
কাদারিয়া সম্প্রদায়:-
মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণকারী হিসেবে ইসলামে কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তাঁদের কাদারিয়া বলা হয় কারণ তাঁরা এই মত পোষণ করেন মানুষের কাজ করার ‘কাদর’ বা শক্তি আছে।
জাবরিয়ার সাথে কম্পেয়ার করলে,
জাবরিয়া মতবাদে বলা হয় যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় কিছুই করতে পারে না, আল্লাহই সব কাজ করেন। মানুষ এখানে পুতুলের মতো, তার নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা বা ক্ষমতা নেই।
কাদারিয়া এর উল্টো মতবাদ ধারন করে এই যে, মানুষই তার কাজের মূল কর্তা। আল্লাহ মানুষকে কাজ করার শক্তি দিয়েছেন, কিন্তু মানুষ নিজেই নিজের কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী।
এখানে কাদারিয়ারা আবার যেটা ত্রুটি করেছে যে – এরা আল্লাহকে একমাত্র ক্ষমতার অধিকারী স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে বান্দার কাজকে আলাদা একটি ক্ষমতা মনে করে। এটি তাওহিদের (আল্লাহর একত্ব) মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হ্যা মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ কারন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা তার নিজের নয়। এটি আল্লাহ প্রদত্ত একটি সুযোগ, যা আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশে কাজ করে।
তাদের কিছু মতবাদ পরে মু’তাজিলিদের দ্বারা গৃহীত হয় এবং আশআরিয়দের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়।
নোট: কাদারিয়া এবং কাদেরিয়া কিন্তু এক নয়। কাদারিয়া হচ্ছে একটা সম্প্রদায় যারা আক্বীদাহগত বিভ্রান্তিতে আছে আর কাদেরিয়া হচ্ছে একটা সুফি তরিকার নাম। এরকম আরো ১২৬ তরিকা আছে। এ সম্পর্কে পরবর্তী সিরিজে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
এর পর আসে মু’তাজিলারা। মু’তাজিলা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়ে গেছে আক্বীদাহ সিরিজের ৬ষ্ঠ পর্বে। এরা মূলত যুক্তিদর্শন দিয়ে ইসলামকে চর্চা করতে গিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তবে এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো, গ্রিক দর্শনের প্রভাবের প্রাথমিক ধারক হিসেবে মু’তাজিলারা প্রাধান্য পায়। তাই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ধারাবিহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে তাদেরকে আগে আলোচনা করতে হয়েছে।
মুশাব্বিহা এবং মুজাসসিমা :-
“মুশাব্বিহা” শব্দটি এসেছে “তাশবীহ” থেকে, যার অর্থ হলো তুলনা করা বা সাদৃশ্য করা। মুশাব্বিহারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা বলে আল্লাহর হাত (ইয়াদ), চোখ (আয়ন), এবং মুখ (ওয়াজহ) আছে, এবং সেগুলো সৃষ্টির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো হলেও বিশেষ ধরনের।
আর “মুজাসসিমা” শব্দটি এসেছে “জিসম” (দেহ) থেকে। মুজাসসিমারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর জিসম বা দেহ রয়েছে। আল্লাহর অস্তিত্বের জন্য জিসম বা দেহ থাকা জরুরি। দেহ ছাড়া কোনো অস্তিত্ব হতে পারে না।
এই উভয় দলই দেহবাদী আক্বীদায় বিশ্বাসি। দেহবাদী আক্বীদা হলো, সৃষ্টির মতো আল্লাহ তাআলার দেহ সাবস্ত করা। যেমন মানুষের হাতের মতো আল্লাহর হাত, পায়ের মতো তার পা। যারা এ আক্বীদায় বিশ্বাসী তাদের বলা হয়ে মুজাসসিমা। আর এই আক্বীদা সম্পর্কে বিভ্রান্ত দলগুলোর মাঝে একটি হলো মুশাব্বিহা।
মুরজিয়া :-
আক্বীদাহ সিরিজ ৪ নাম্বারে খারেজিদের দুইটি বৈশিষ্ট আলোচনা করেছিলাম – পাপের কারণে মুসলিমকে কাফির বলা এবং কাফির হত্যার ঢালাও বৈধতা দাবি করা। এজন্যে এদেরকে উগ্রপন্থী বলা হতো। আর এই মুরজিয়া হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। এরা মনে করে ঈমানের সাথে আমলের কোনো সম্পর্ক নেই। ঈমান থেকে আমল বা কর্ম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ঈমানের জন্য শুধু অন্তরের ভক্তি বা বিশ্বাসই যথেষ্ট। ইসলামের কোনো বিধিবিধান পালন না করেও একব্যক্তি ঈমানের পূর্ণতার শিখরে আরোহণ করতে পারে। আর এরূপ ঈমানদার ব্যক্তির কবীরা গোনাহ তার কোনো ক্ষতি করে না। যত গোনাহই করুক না কেন সে জান্নাতী হবে।
শাব্দিকভাবে মুরজিয়া শব্দটি আরবি শব্দ ইরজা’ থেকে এসেছে যার অর্থ – বিলম্বিত করা। মুরজিয়াগোষ্ঠী ঈমান থেকে আ’মলকে বিলম্বিত করে এবং তাকফীরকে বিলম্বিত করে।
মুরজিয়াগোষ্টী সহ এখন পর্যন্ত যত দল নিয়ে উল্লেখ করেছি এবং সামনে করবো সবারই অনেক বড় বড় ইতিহাস রয়েছে। এবং সবাই যে ধর্ম নিয়ে স্ট্যাডি করতে গিয়ে এসব ভ্রান্ত আক্বীদাহের জন্ম দিয়েছে তা কিন্তু নয়। বরং বেশির ভাগ ভ্রান্ত আক্বীদাহই জন্ম হয়েছে তাদের দল ভারি করা কিংবা মুরতাদ শাসকগোষ্ঠীকে সুরক্ষা ও গদিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে। যেমন এই মুরজিয়া। শিয়া এবং খারেজিদের উৎপত্তিও রাজনৈতিক কারনে। এবং বেশিরভাগ আক্বীদাহের আবার বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। আমি কেবল মূল কন্সেপ্টটা তুলে ধরে বুঝার চেষ্টা করেছি। কারন আমার উদ্দ্যেশ্য শুধু এই ভ্রান্ত আক্বীদাহগুলা চিনে রাখার এবং এগুলো থেকে বিরত থাকা।
Leave a Reply