ইসলামের প্রথম দিকের যুগে (খুলাফায়ে রাশেদিন এবং উমাইয়া যুগে) আক্বীদাহ বা বিশ্বাসের বিষয়গুলো কোরআন ও সুন্নাহর সরল ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। কিন্তু আব্বাসীয় খিলাফতের (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের পর) সময় গ্রিক দর্শন এবং বিজ্ঞান আরবিতে অনূদিত হয়।

ইসলামি সোনালী যুগে মুসলিম পণ্ডিতরা গ্রীক দর্শনের চিন্তাভাবনাকে ইসলামের তাওহিদি বিশ্বদর্শনের সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষত হুনাইন ইবনে ইসহাক, আল-ফারাবি, এবং ইবনে সিনার মতো চিন্তাবিদরা এরিস্টটল, প্লেটো এবং সক্রেটিসের দার্শনিক ধারণাগুলোকে নতুন রূপ দেন।

বিশেষত আল-মামুনের যুগে (৮১৩–৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ), বাইতুল হিকমা (জ্ঞানভবন) প্রতিষ্ঠা এবং গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞান আরবিতে অনুবাদের মাধ্যমে ইসলামি দুনিয়ায় যুক্তিবাদ (র‍্যাশনালিজম) ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।

গ্রিক দর্শনের মূল বিষয়বস্তু ছিল যুক্তি এবং চিন্তার বিশ্লেষণ। এগুলো ইসলামি চিন্তকদের প্রভাবিত করে। তারা বিভিন্ন দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যুক্তি ও কোরআন-সুন্নাহর মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর ফলে ইসলামের বিশ্বাসব্যবস্থায় বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মতবিরোধ দেখা দেয়। এতে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন আক্বীদাহ মাজহাব। এর মধ্যে কিছু মূলধারার অংশ হয়ে ওঠে, আবার কিছু বাতিল (প্রত্যাখ্যাত) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই মতবিরোধের মূল বিষয়গুলো ছিল আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী), কোরআনের সৃষ্ট বা অসৃষ্ট হওয়া, মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও ভাগ্য নির্ধারণের ভূমিকা, এবং আল্লাহর সত্তার স্বরূপ।

ইসলামের ইতিহাসে গ্রিক দর্শনের প্রভাব ইসলামি চিন্তায় প্রবেশের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং প্রাথমিক বিতর্কগুলোর সূচনা মুতাযিলা মতবাদ থেকেই হয়। তারা যুক্তি এবং চিন্তাকে (আকল) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করত এবং কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দিত।

উমাইয়া যুগে মুতাজিলা আন্দোলনের আবির্ভাব হয়। ওয়াসিল ইবনে আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। তিনি ছিলেন হাসান বসরির শিষ্য, একটি মাসলাকে কেন্দ্রকরে তিনি হাসান বসরীর মতবাদ থেকে বের হয়ে নিজে একটি মতাদর্শ চালু করেন, যা মুতাজিলা মতবাদ নামে পরিচিতি পায়।

ঘটনা :-
একদিন ইমাম হাসান আল বসরী (রঃ) এর মজলিসে একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি কোন মুসলমান কবিরা গুনাহ করে সে কি মুসলিম থাকবে না অমুসলিম হয়ে যাবে? হাসান আল বসরী উত্তর দেন তিনি মুনাফেক। কিন্তু তার শিষ্য ওয়াসিল বিন আতা বলেন যে তিনি মুসলিমও নয় অমুসলিমও নয়,তার স্থান এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে। ইমাম হাসান আল বসরী (রঃ) এ মত প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে ওয়াসিল বিন আতা ইমামের দল পরিত্যাগ করে মসজিদের এক পাশে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। কিছু লোক ওয়াসিল বিন আতার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। ইমাম হাসান আল বসরী (রঃ) বলেন ‘ইতাজিলা আন্না’ (সে আমাদের ত্যাগ করেছে)। এখান থেকেই ওয়াসিল বিন আতার সম্প্রদায় মুতাজিলা নামে পরিচিতি পায়। শীঘ্রই ওয়াসিলের দলে কিছু নতুন লোক জুটে যায় যারা মূলত গ্রিক সহ অন্যান্য দর্শনের আলোকে ইসলাম ধর্মকে মূল্যায়ন করতো। পরবর্তী ওয়াসিল না থাকলেও এই দার্শনিকরাই মুতাজিলাকে সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে একটি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

মুতাজিলারা প্রচার করে, কুরআন আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির মতোই সাধারণ একটি সৃষ্টি। তাই একে প্রয়োজন মতো পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে। আরো বলত, “আল্লাহ কথা বলেন (কালাম)”—এই গুণটি আল্লাহর সত্তার অংশ হতে পারে না। এদের দাবি ছিল যে কোরআন সৃষ্ট, কারণ আল্লাহর কালাম যদি অনন্ত হয়, তাহলে এটি আল্লাহর সত্তার মতো চিরন্তন হতে পারে না। এরকম আরো ৫টা স্তম্ভ আছে তাদের। উইকিপিডিয়ায় মুতাজিলা লিখে সার্চ করে জেনে নিতে পারেন।

এ সমস্ত কারণে খলিফা আল-মামুনের সময়ে (৮১৩–৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) “কোরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট” এই প্রশ্নে ইসলামী দুনিয়া বিভক্ত হয়। যাকে “মিহনা” (ধর্মীয় নিপীড়ন) বলা হয়। আল-মামুন মুতাযিলার মতবাদ গ্রহণ করে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে নিপীড়ন করেন, কারণ তিনি কোরআনের চিরন্তনতা (অসৃষ্ট) মতবাদ সমর্থন করেন।

আহমদ বিন হাম্বল বাগদাদে আবু হানিফার ছাত্র আবু ইউসুফ ও মালিক বিন আনাসের ছাত্র ইমাম শাফির কাছে পড়াশুনা করেন। আহমদ ইবনে হাম্বল তার সমস্ত জীবন ব্যাপী মুতাজিলা যুক্তিবাদী মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। তৎকালীন সময়ে খলিফা হারুনুর রশীদের পুত্র মামুন ও তৎপরবর্তী খলিফা মুতাসিম ও মুতাসিকের খিলাফতের সময়ে খলীফার অনুকুলে থাকা মুতাজিলাদের বিরোধিতা করায় তিনি একটি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে কারাবাস ও কঠোর সাজাপ্রাপ্ত হন এবং এ সময় তার উপর কঠোর নির্যাতন ও অত্যাচার চালানো হয়।

মুতাজিলাগণ যে মনে করতো, (খালক্বে কুরআন) কুরআনকে আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির অনুরূপ ও সংশোধনযোগ্য, এর বিরোধিতায় আহমদ বিন হাম্বল বলেন, কুরআন আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির মত কোন সৃষ্টি নয় বরং তা সরাসরি আল্লাহর বাণী ও আল্লাহরই নিজস্ব বিশুদ্ধ বক্তব্য, তাই তা সম্পূর্ণ নির্ভূল ও তথা তা সংশোধনের সামান্যতম প্রয়োজন নেই, এবং তার মানবীয় যৌক্তিক পৃথক কোন ব্যাখ্যারও দরকার নেই। পরিশেষে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের আমলে তিনি মুক্তি পান ও বাগদাদে ফিরে আসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *