ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সৃষ্টির শুরুতে আক্বীদাহে গণ্ডগোল বা বিভ্রান্তি সর্বপ্রথম সূচনা করেছিল ইবলিস (শয়তান)। ইবলিস ছিল আল্লাহর একজন অত্যন্ত ইবাদতগুজার সৃষ্টি। কিন্তু যখন আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং তাঁকে সম্মান জানাতে নির্দেশ দেন, তখন ইবলিস অহংকার করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে। এটি ছিল প্রথমবারের মতো তাওহিদের (তাওহীদ উল-ইবাদাহ – আল্লাহর ইবাদতে এককত্ব লঙ্ঘন) বিরোধিতা এবং শিরকের বীজ বপনের সূচনা। ইবলিস আল্লাহর হুকুম মানেনি এবং নিজের অহংকারকে প্রাধান্য দিয়েছে। এটা মুসলিমদের জন্য অনেক বড় একটা শিক্ষা। যা সরাসরি আক্বীদাহ এর সাথে সম্পৃক্ত।

এরপর নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ে ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর ছিল নেককার ব্যক্তি। যখন তারা মারা গেল, তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে কুমন্ত্রণা দিল যে, তাদের স্মরণে মূর্তি তৈরি করো, যাতে মানুষ নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু যখন সেই প্রজন্ম মারা গেল এবং নতুন প্রজন্ম এল, তখন শয়তান তাদের বলল, ‘তোমাদের পূর্বপুরুষেরা এসব মূর্তির উপাসনা করত’, এবং এইভাবে ধীরে ধীরে শিরক চালু হয়ে গেল। (সহিহ বুখারি: ৪৯২০, তাফসির ইবনে কাসির: সূরা নূহ ২৩ আয়াতের ব্যাখ্যা)

এই ঘটনাটি কোরআনেও উঠে এসেছে,
“তারা (নূহের সম্প্রদায়) বলল, ‘তোমরা তোমাদের দেবতাদের ছেড়ে দিও না, এবং ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর—এদেরও ছেড়ে দিও না।’ __সূরা নূহ (৭১:২৩)

এই ছিলো শয়তানের দ্বারা শির্ক এর সূচনা, আর যদি আমাদের শেষ নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম ইসলামের পূর্ণতা প্রতিষ্ঠার পর সময়কাল ধরি, তাহলে যে দুটি বিভ্রান্তিকর মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে, সেগুলো হলো খারিজি এবং শিয়া।

শিয়া মতবাদের জন্ম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নেতৃত্বের প্রশ্নে মতবিরোধ থেকে। এটি প্রথমে একটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে শুরু হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে, এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক সীমারেখায় না থেকে ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক আকিদার রূপ নেয়।

আর খারেজিরা একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত, যারা সিফফিন যুদ্ধের সালিশির (arbitration) সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা আলী (রা.) এবং মুআবিয়া (রা.) উভয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং তাদের আকিদার মূল ভিত্তি ছিল চরমপন্থা এবং বিভেদ।

সুতরাং আমরা বলতে পারি খারেজিরাই প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পর গনিমতের সম্পদ (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) বণ্টন করছিলেন। বণ্টনের সময়, জুল খুয়াইসিরাহ নামের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করে বলেছিল:

“হে মুহাম্মদ, আপনি ইনসাফ করেননি!”

এই মন্তব্য শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত বিস্মিত হন এবং উত্তরে বলেন:

“দুর্ভাগ্য তোমার! আমি যদি ইনসাফ না করি, তবে আর কে করবে? যদি আমি ইনসাফ না করি, তাহলে তো আমি ধ্বংস হয়ে যাব।”
(সহীহ বুখারি, হাদিস: ৩১৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬৪)

রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন:

“এই ব্যক্তি এবং তার অনুসারীরা ধর্ম থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন তীর শিকারের দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়।”

রাসূলুল্লাহ (সা) জুল খুয়াইসিরাহের আচরণ দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে তার এই চরমপন্থী মানসিকতা ভবিষ্যতে আরও বড় একটি সমস্যার কারণ হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন:

“এই ব্যক্তির বংশ বা চিন্তাধারা থেকে এমন একটি দল উদ্ভূত হবে, যারা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের গলা অতিক্রম করবে না। তারা মানুষকে হত্যা করবে এবং নিজেদের ছাড়া অন্যদের কাফির মনে করবে।”
(সহীহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬৩)

জুল খুয়াইসিরাহের এই বিদ্রোহী মানসিকতা পরবর্তীতে খারিজি আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল।

আল-খারিজি শব্দটি তাদের বিরোধীরা আলীর সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে যাওয়ার বাস্তবতা থেকে একটি বহিরাগত হিসেবে ব্যবহার করে। নামটি এসেছে আরবী মূল خرج থেকে, যার প্রাথমিক অর্থ “চলে যাওয়া” অথবা “বের হতে”

৬৫৭ সালে চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) এবং সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধ হয়। যখন মুয়াবিয়ার সেনারা পরাজয়ের পথে ছিল, তারা কুরআন উঁচিয়ে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়। এই আহ্বানে আলীর কিছু সেনা (বিশেষ করে ধার্মিক দল) শান্তি আলোচনার পক্ষে চাপ দেয়। আলী (রা.) তাদের দাবিতে বাধ্য হয়ে সালিশি কমিটি গঠন করেন। আলীর সেনাবাহিনীর একটি অংশ, যারা সালিশিতে আপত্তি জানিয়েছিল, দাবি করে যে, কেবল আল্লাহরই বিচার করার অধিকার আছে এবং মানব-নির্ধারিত সালিশি মেনে নেওয়া ভুল। তারা “বিচার শুধুমাত্র আল্লাহর” স্লোগান তুলে আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আর এরাই হচ্ছে খারেজি বা খাওয়ারিজ “خوارج” অর্থ “বাহিরে যাওয়া” বা “বিচ্ছিন্ন হওয়া”।

খারেজিরা সর্বপ্রথম তাকফিরের ধারণাটি নিয়ে আসে। তাকফির (عَتَفَّر) অর্থ হলো “কুফর বা শিরক” ঘোষণা করা। তারা বিশ্বাস করত যে, কেউ যদি ইসলামের মূল দিকগুলি থেকে সরে যায়, তাদের কাফের বলে গণ্য করতে হবে। এই ধারণা সম্পর্কে প্রথম কৌশলগতভাবে আলোচনা করা হয়েছিল ইসলামের প্রথম শতকে, যখন আলী ইবন আবি তালিব (রা.) এবং তার শত্রুদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল।

খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর খারেজীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপারে বলেন:
(১) ইসলামের নির্দেশনা বা কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে নিজেদের বুঝকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা। এক্ষেত্রে সাহাবীগণের মতামতের গুরুত্ব অস্বীকার করা।
(২) হাদীস মানলেও সুন্নাত বা আলোচ্য ও বিতর্কিত বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)এর প্রায়োগিক কর্ম ও কর্মপদ্ধতির গুরুত্ব অস্বীকার করা।
(৩) পাপের কারণে মুসলিমকে কাফির বলা।
(৪) কাফির হত্যার ঢালাও বৈধতা দাবি করা।
(৫) রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের শরয়ী গুরুত্ব অস্বীকার করা।
(৬) রাষ্ট্রপ্রধান ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পাপের কারণে রাষ্ট্রকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করা।
(৭) এরূপ রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্যকারী নাগরিকদেরকে কাফির বলা।
(৮) এরূপ কাফির রাষ্ট্র ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বৈধ বলা।
(৯) জিহাদকে ফরয আইন, বড় ফরয ও দীনের রুকন বলে দাবি করা।
(১০) ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের নামে শাস্তি প্রদান।
(১১) তাদের মতের বিরোধী সকল আলিমকে অবজ্ঞা করা।

শিয়াঃ
শিয়ারা মতবিরোধ সৃষ্টি করেছে ইমামত(নেতৃত্ব) নিয়ে। শিয়াদের কাছে ইমামত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। শিয়াদের মতে, ইমামত কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এই ইমামতকে তারা ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় এবং সামগ্রিক নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। তবে এটি কেবলমাত্র রাসুলের বংশধরদের জন্য নির্ধারিত।

শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, ইমাম হতে হলে নবী (সা.)-এর বংশধর হওয়া আবশ্যক। বিশেষ করে আহলুল বাইতের অন্তর্ভুক্ত, যাদের মধ্যে আলী (রা.), ফাতিমা (রা.), হাসান (রা.), এবং হুসাইন (রা.) রয়েছেন।

শিয়ারা মনে করে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পরে আবু বকর (রা.), উমর (রা.), এবং উসমান (রা.)-কে খলিফা নির্বাচন করা সঠিক হয়নি। তাদের মতে, প্রথম খলিফা হওয়ার অধিকার ছিল আলী (রা.)-এর। এই কারণে শিয়ারা প্রথম তিন খলিফাকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করে এবং আলী (রা.)-কে প্রথম বৈধ ইমাম ও খলিফা হিসেবে বিবেচনা করে।

শিয়ারা ১২ জন ইমামের একটি ধারাবাহিক তালিকা মেনে চলে, যারা যুগে যুগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করে, এই ইমামগণ নির্ভুল, পাপমুক্ত (মাসুম) এবং আল্লাহ কর্তৃক বিশেষভাবে নির্বাচিত। এই ১২ ইমাম হলো:
আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)
হাসান ইবনে আলী (রা.)
হুসাইন ইবনে আলী (রা.)
আলী জয়নুল আবেদিন
মুহাম্মদ আল বাকির
জাফর সাদিক
মুসা আল কাজিম
আলী রেজা
মুহাম্মদ তাকি
আলী নাকি
হাসান আল আসকারী
মুহাম্মদ আল মাহদি (গায়েব ইমাম)

শিয়াদের মতে, ১২তম ইমাম মুহাম্মদ আল মাহদি শিশু বয়সে ‘গায়েব’ (অদৃশ্য) হয়ে যান। তাদের বিশ্বাস, তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং কেয়ামতের আগে ইমাম মাহদি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। তার আগমন বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং সমস্ত অন্যায় দূর করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *