মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামি (রাযি.) বলেনঃ

ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আমাদের মাঝে কিছু দাস-দাসী আছে, যাদের আমরা মুক্ত করতে চাই। আমি কি তাদের পরীক্ষা করতে পারি? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, করো।’ তখন আমি এক দাসীকে ডেকে আনলাম। নবী (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, – ‘আল্লাহ কোথায়?’ সে বলল, ‘আসমানে।'(সামা السَّمَاءُ বা উপরের দিকে) এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, – ‘আমি কে?’ সে বলল, ‘আপনি আল্লাহর রাসুল।’ তখন নবী (সা.) বললেন, ‘তাকে মুক্ত করে দাও। নিশ্চয় সে একজন মুমিন।’ (সহিহ মুসলিমঃ হাদিস ৫৩৭, সুনান আবু দাউদঃ ৯৩০, মুসনাদ আহমাদঃ ২১৫১৬)

সাধারণত বিভিন্ন যুদ্ধ, বিজয়, কিংবা বাণিজ্যের মাধ্যমে আরবদের মাঝে দাস হিসেবে অনারবরা(আজমি/আরবীয় বংশ, ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরে থাকা লোকজন) আসতো। তারা হয়তো ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে নতুন ছিল বা তাদের পূর্ব বিশ্বাস থেকে প্রভাবিত ছিল। ধারণা করা হয় এই দাসীও অনারব (আজমি) হওয়ায় নবী (সা.) তার আক্বীদাহ যাচাই করার জন্য প্রশ্ন করেন।

বাংলাদেশে বর্তমান ইসলামিক কালচার খুব একটা সুবিধা না আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশের সাধারন মুসলিম এত এত মত/দল/আক্বীদাহের মাঝে, নিজেকে যাচাই করার জন্য হলেও এই প্রশ্নের মাধ্যমে পরিক্ষা করে নেওয়া উচিৎ। “আল্লাহ সত্বাগতভাবে সর্বোত্র বিরাজমান” – এই আক্বীদাহ বাংলাদেশের অনেক মুসলিম রাখে। এবং এর প্রধান কারন হচ্ছে বাংলাদেশে আশআরি-মাতুরিদির এবং সুফীবাদের প্রভাব।

🚩 বাংলাদেশে ইসলামের সূচনা এবং বর্তমান ইসলামিক কালচার নিয়ে বিস্তারিত পর্ব আসছে ইনশাল্লাহ।

গত পর্বে আমরা মূল ধারার আশআরি-মাতুরিদি সম্পর্কে জেনেছি এবং এক কথায় এটা বুঝেছি – এরা উভয়ই মুতাযিলার যুক্তিবাদী দর্শন ও বিতর্কমূলক চিন্তাধারার বিরোধিতা করলেও কিছু ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতিগত কৌশল গ্রহণ করেছে। আশআরি আক্বীদার মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহর কিছু কিছু সিফাতকে নিজেদের আক্বল দিয়ে ব্যাখ্যা করা। আর মাতুরিদির মূল বিষয় হচ্ছে আক্বল দিয়ে কোরআন হাদিসের যেসব বিষয় যুক্তিতে মিলবে তা ঠিক আছে, কিন্তু যা যুক্তিতে মিলবেনা সেটার আলাদা একটা ব্যাখ্যা বের করা। এবং এরা এভাবেই আলাদা একটা যুক্তিবিদ্যা বের করেছে নাম দিয়েছে মানতেক। মানতেক (المنطق) শব্দটি আরবি ভাষায় এসেছে, যার অর্থ “যুক্তিবিদ্যা” বা “লজিক”।

উদাহরনস্বরুপ,

“আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা আরশে ইস্তিওয়া(উপরে উঠা) করেছেন” (সূরা আল-আ’রাফ — ৭:৫৪), এই কথার উপর এরা যুক্তি আরোপ করে প্রশ্ন উত্থান করে, – যদি আল্লাহ আরশ সৃষ্টি করে তার পর ইস্তিওয়া করেন তাহলে আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? – যদি ইস্তিওয়া করেন তাহলে আল্লাহ স্থান পরিবর্তন করেন, সৃষ্টিকর্তা কি স্থানের মুখাপেক্ষি? – যদি ইস্তিওয়া করেন তাহলে আল্লাহর আকার সাব্যস্ত হয়, আল্লাহর কি আকার আছে? – আকার সাব্যস্ত হলে দেহ বিশিষ্ট বুঝায়, আল্লাহর কি দেহ আছে? – দেহ সাব্যস্ত হলে মুজাসসিমা (পর্ব ১০ এ বিস্তারিত বলা আছে..) আক্বীদা বুঝাবে। ইত্যাদি।

এইভাবে এরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং সালাফিদেরকে মুজাসসিমা আক্বীদার অনুসারী বলে অপপ্রচার করে। অথচ এই ❝যদি❞, ❝কেন❞, ❝কিভাবে❞ ইত্যাদি সকল প্রকার যুক্তি-তর্ক হতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত মুক্ত-পবিত্র। যুক্তি তর্ক করে এই ইস্তিওয়া কে ভিন্ন অর্থ প্রদান করলে এই মর্মে কোরআনের সকল আয়াতসমূহ যেমন, সুরা ইউনুস (১০:৩), সুরা ত্বহা (২০:৫), সুরা ফুরকান (২৫:৫৯) ইত্যাদি অস্বীকার করা হয়।

তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ হচ্ছে, “আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।” __সূরা আল-বাকারা (২:২৮৫)

কোন যুক্তি তর্ক কিংবা প্রশ্ন উত্থান করবোনা। প্রশ্ন তোলা ইহুদিদের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “ইহুদিরা অহংকার ও অযথা প্রশ্ন করে ধ্বংস হয়েছে। অতএব, তোমরা যেটুকু আদেশ পেয়েছ, তা পালন করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮৮)

এবং একইসাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ হচ্ছে, “তাঁর মতো কিছুই নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” __সূরা আশ-শূরা (৪২:১১)

অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ইস্তিওয়া(উপরে উঠা) বিশ্বাস করে এবং একই সাথে বিশ্বাস করে আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা কারো মত নন। তাই “তিনি আরশ সৃষ্টির আগে কোথায় ছিলেন” – আমরা জানিনা এই প্রশ্নও করবোনা। এই ছাঁচের (pattern) সকল প্রশ্নের উত্তর হবে এমনঃ ➡️ যদি ইস্তিওয়া করেন তাহলে কি আল্লাহ স্থান পরিবর্তন করেন? এর উত্তর আমরা জানিনা আর এই প্রশ্নও করিনা। ➡️ আল্লাহর কি আকার আছে? আমরা জানিনা এই প্রশ্নও করিনা। ➡️ আল্লাহর কি দেহ আছে? আমরা জানিনা এই প্রশ্নও করিনা। বরং মুজাসসিমা বা মুশাব্বিহা ফিরকা আল্লাহর এ সকল বিশেষণ সৃষ্টির বিশেষণের মত বলে কল্পনা করেছে। পক্ষান্তরে মু’তাযিলী, জাহমী, কাদারী ও অন্যান্য বিভ্রান্ত ফিরকা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন যুক্তিতে মহান আল্লাহর অন্যান্য সকল বিশেষণ ও কর্ম অস্বীকার করেছে। তারা বলে মহান আল্লাহকে শ্রবণ, দর্শন, হস্ত, মুখমণ্ডল, আরশের উপর সমাসীন হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, কথা বলা ইত্যাদি বিশেষণ বা কর্মে বিশেষিত করার অর্থই হলো তাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। তাই কুরআন ও হাদীসে ব্যাবহৃত এ সকল বিশেষণকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমন, তাঁর হস্ত অর্থ তাঁর ক্ষমতা বা করুণা, আরশের উপর সমাসীন হওয়ার অর্থ আধিপত্য লাভ করা, ক্রোধান্বিত হওয়ার অর্থ শাস্তি প্রদানের ইচ্ছা করা, ইত্যাদি। (বিস্তারিত বিগত পর্বগুলোতে আলোচনা করে এসেছি..)

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত এ বিষয়ে ওহীর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে। তাঁরা সকল সিফাত বা বিশেষণ তার প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস করে এবং বিশেষনের ধরন ও প্রকৃতির বিষয় মহান আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন। সাথে সাথে তাঁরা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, আল্লাহর এ সকল সিফাত বা বিশেষণ কোনভাবেই সৃষ্টির বিশেষণের মত নয়।

ইমাম আবু হানিফা বলেন, “যে ব্যক্তি বলে যে, আমি জানি না আল্লাহ আকাশে আছেন না জমিনে, সে কাফের। কারণ, আল্লাহ বলেন, ‘তিনি আরশে আছেন।’ আর আল্লাহর আরশ আকাশের উপরে।” (সূত্র: আল-ফিকহ আল-আকবার) তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ আরশের উপরে আছেন, কিন্তু তাঁর আরশে ইস্তিওয়া (উপর অবস্থান করা) এমনভাবে নয় যা সৃষ্টির অবস্থার সাথে তুলনীয়।” অর্থাৎ, আল্লাহর ইস্তিওয়া প্রমাণিত, কিন্তু এটি কিভাবে ঘটেছে তা বোঝার বা কল্পনা বা anthropomorphism করার চেষ্টা করা উচিত নয়। কুরআনে আসা আল্লাহর সিফাতগুলোতে বিশ্বাস স্থাপনের কথা বলেছেন, যেমনটি এসেছে, কিন্তু এগুলোর প্রকৃতি বা “কাইফিয়াত” সম্পর্কে অনুসন্ধান করা বিদআত।

ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ “ইস্তিওয়া প্রমাণিত, কিন্তু এর প্রকৃতি অজ্ঞাত; এই ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করা ওয়াজিব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।”

তবে এখানে ইস্তিওয়া অর্থ সমাসীন বা আসীন বা আসন করেছেন বা বসে আছেন ইত্যাদি অর্থও করা যাবেনা। অথবা অথিষ্ঠিত, প্রতিষ্ঠিত ইত্যাদি অর্থও নেওয়া যাবেনা। কারন এগুলো ইস্তিওয়া-এর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে। আমরা অতিরিক্ত অর্থ গ্রহন করবোনা। যে কথাটা যেভাবে বলা আছে সেই কথাটা ঠিক সেইভাবে গ্রহন করতে হবে।

এই ব্যাপারে আরো বিস্তারিত ব্যখ্যা নিয়ে অসাধারন একটা বই হচ্ছে, “রহমান আরশের উপর উঠেছেন” __ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

“আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা উপরে আছেন” – এই মর্মে প্রধান যে ৩টি দলিল উত্থাপিত হয়ঃ

১/ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “আমাদের প্রভু (আল্লাহ) প্রতিটি রাতের শেষ তৃতীয় ভাগে নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন.. (সহীহ বুখারি: ১১৪৫, সহীহ মুসলিম: ৭৫৮)

২/ মুনাজাত বা দোয়ার সময় হাত উপরের দিকে তোলা.. (এই ব্যাপারে ইবন কুল্লাব-এর বক্তব্য বিস্তারিত দলিল সহ সামনে দিচ্ছি..)

৩/ নবী মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে এক রাতে মক্কা থেকে প্রথমে বাইতুল মাকদিস (জেরুজালেম) পৌঁছান এবং এরপর তিনি আসমান বা আকাশে আরো উপরে উঠে যান। যে ঘটনাকে মেরাজ বলা হয়। এবং সেখানে ৫০ ওয়াক্ত সালাত পাবার পরে মূসা (আ:) যে বললেন, “আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের (বোঝা) হালকা করার জন্য আরয করুন” (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৭)

আবারো বুঝার চেষ্টা করুন, অবশ্যই এগুলো এমনভাবে বোঝা উচিত নয় যেন আল্লাহ স্থান পরিবর্তন করেন বা আল্লাহ কোন স্থানে অবস্থান করেন। কারণ আল্লাহ স্থান ও সময়ের ঊর্ধ্বে। এটি আল্লাহর সিফাত যা আমাদের বোধগম্যের বাইরে। তাই আমরা আল্লাহর কোন সিফাতকে আমাদের সাথে বা আমাদের কোন কর্মের সাথে কল্পনাও করবোনা।

কিন্তু এর বিপরীতে ইলমুল কালাম চর্চাকারীরা কোরআন থেকে ২টি ঘটনার যুক্তি পেশ করে,

১/ মূসা (আ:) এর সাথে আল্লাহ সুবহানাওয়াতালার কথোপকথন যা সূরা আল-আরাফ(৭)-এ উল্লেখ আছে। তাহলে কি আল্লাহ তূর পাহাড়ে আছেন?

২/ ইব্রাহিম (আঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি। তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করবেন।” সূরা আস-সাফফাত (৩৭:৯৯), তাহলে কি আল্লাহ ফিলিস্তিনের দিকে আছেন?

এখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ ঐ আগের মতই, “তাহলে” যুক্তি দিয়ে আমরা প্রশ্ন উত্থান করে কোরআনের আয়াত অস্বীকার করতে যাবোনা।

১/ যেই মূসা (আ:) তূর পাহাড়ে গিয়েছেন সেই মূসা (আ:)-ই মেরাজে রাসুল (সা:)-কে বলেছেন “আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান..। আর এই হাদিসে “إِلَى (ইলা)” শব্দটি উর্ধ্বমুখী বোঝানোর মূল কারন হচ্ছে, – “মেরাজের সম্পূর্ণ ঘটনাই ওপরের দিকে”।

২/ যেই আল্লাহ মূসা (আ:) এবং ইব্রাহিম (আ:) এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন সেই আল্লাহই আমাদের জানিয়েছেন, “আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা আরশে ইস্তিওয়া(উপরে উঠা) করেছেন” এবং “তাঁর মতো কিছুই নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”।

আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। এই ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করা ওয়াজিব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।

“আর আকাশে রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং যা তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।” (সুরা আদ-ধারিয়াত, আয়াত ২২) “বলুন, আকাশ ও পৃথিবী থেকে কে তোমাদেরকে রিজিক দান করে? বলুন, আল্লাহ।” (সুরা সাবা, আয়াত ২৪)

📘 ইবন আল-ক্বাইয়্যিম, – ইবন ফাওরাকের মাধ্যমে, – ইবন কুল্লাবের বক্তব্য অব্যাহতভাবে উল্লেখ করছেনঃ

“…আর আমরা আগে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি, – জামাআতের (আহলুস সুন্নাহর) মাযহাবের সঠিকতার পক্ষে। যদি এর বাইরে আর কিছু সাক্ষ্য না-ও থাকত, তবে এগুলোই যথেষ্ট ছিল। এবং তা কীভাবে যথেষ্ট হবে না, যখন আল্লাহ মানুষের ফিতরাহ্‌-তে (জন্মগত প্রকৃতি) এবং তাদের বাস্তব উপলব্ধিতে এমন একটি সত্য স্থাপন করেছেন যে, — “আল্লাহ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে”, যার মতো স্পষ্ট এবং নিশ্চিত আর কিছুই নেই। বরং তুমি পৃথিবীর কোনো মানুষকে (আরব বা অনারব – মুমিন বা কাফির) এ প্রশ্ন করবে; “তোমার রব কোথায়?”, তাহলে সে বলবে; “আসমানের উপর।” যদি সে মুখে প্রকাশ করতে পারে, তবে বলবে; আর যদি মুখে প্রকাশ করতে না পারে, তবে হাত দিয়ে উপরে ইশারা করবে। সে কখনো মাটির দিকে, জমিনের দিকে কিংবা পাহাড়ের দিকে ইশারা করবে না। আর আমরা কাউকে দেখিনি যে দোয়া করে অথচ হাত আকাশের দিকে তোলে না। এবং আমরা এমন কাউকে পাইনি, জাহমিয়্যাহ ছাড়া, যারা তাদের রব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বলে; “তিনি সর্বত্র আছেন।” এভাবেই তারা বলে।

দলিলঃ

📗 اجتماع الجيوش الإسلامية على غزو المعطلة والجهمية Ijtima’ Al-Juyoosh Al-Islamiyyah ‘ala Harb Al-Mu’atilah Wa Al-Jahmiyyah (নামটা ইংরেজীতেও দিলাম যাতে সার্চ করে বের করতে পারেন)

এখানে ইবন কুল্লাব উল্লেখ করছেন যে, “সকল সৃষ্টির ফিতরাহ অনুযায়ী আল্লাহ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে” — এটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান। কিন্তু পরবর্তী যুগের আশ’আরিরা (যারা জাহমিয়্যাহ ও মু’তাযিলার পথে চলে) স্বীকার করে যে যদি তারা তাদের আকীদা মানুষের সামনে নিজস্ব দার্শনিক ভাষায় তুলে ধরে, যেমনঃ

“আল্লাহ জিস্‌ম নন (দেহ নন), জাওহার নন (স্বতন্ত্র সত্তা নন), ‘আরায নন (আকস্মিক গুণ নন), তিনি কোনো স্থান (মাকান)-এ নন, কোনো দিক (জিহাহ)-এ নন, তিনি স্থান দখলকারী নন (মুতাহাইয়্যিজ), মহাবিশ্বের মধ্যে নন, মহাবিশ্বের বাইরে নন…”

তাহলে অধিকাংশ মানুষ নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়বে। অর্থাৎ, “যদি নবী ﷺ আশ‘আরি কালামের ভাষায় আল্লাহকে ব্যাখ্যা করতেন, মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান আনত না। কারণ সাধারণ মানুষ তাদের ফিতরাহ অনুযায়ী শুধু আকাশের দিকে হাত তুলে দো’আ করেই আল্লাহকে বোঝে।” এই কারণে, আল-গাজ্জালী (মৃ. ৫০৫ হি.), ফাখরুদ্দীন আর-রাযী (মৃ. ৬০৬ হি.), এবং অন্যান্য পরবর্তী আশ’আরিরা একটি কৌশলগত পন্থা শিক্ষা দিয়েছেন—

➡️ সাধারণ মানুষকে আহ্বান করবে তাদের ফিতরাহ অনুযায়ী—যে আল্লাহ আসমানের উপরে, আরশের উপরে। ➡️ প্রথমে এই স্বাভাবিক ধারণা দিয়ে ঈমানের পথে ডাকা হবে। ➡️ পরে ধীরে ধীরে তাদের দার্শনিক ভাষা পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।

নইলে শুরুতেই তাদের তত্ত্ব শোনালে মানুষ নাস্তিক হয়ে যেতো। এসমস্ত কথা তাদের নিজস্ব গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় রয়েছে।

দলিলঃ

إلجام العوام عن علم الكلام (Iljāmu al-ʿAwām ʿan ʿIlmi al-Kalām)

এছাড়াও, ফাখরুদ্দীন আর-রাযী তার বই Asas al-Taqdis (أساس التقديس) – তে যা উল্লেখ করেছে তা না বললেই নয়,

“সালাফের পদ্ধতি বেশি নিরাপদ, আর খালাফের পদ্ধতি (দার্শনিক ব্যাখ্যা) বেশি বোধগম্য।”

অর্থাৎ, দার্শনিক ভাষায় আল্লাহকে ব্যাখ্যা করলে মানুষ মনে করবে “আল্লাহ কোথাও নেই”, ফলে নাস্তিকতা (تعطيل) তৈরি হবে। এছাড়াও, ফাখরুদ্দীন আর-রাযী Asaasut-Taqdees-এ (পৃষ্ঠা ২১৫–২১৯) দাবি করেন যে আল্লাহ ও তাঁর সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান নিতে খবরুল-ওয়াহিদ (এমন হাদিস যা প্রচুর সংখ্যক লোক একইভাবে বর্ণনা করেনি) গ্রহণ করা বৈধ নয়, কারণ এ ধরনের হাদিস নিশ্চিত (ইলম-ই-ইয়াকিন) নয় বরং ধারণাগত জ্ঞান দেয়, এবং সাহাবাদের বর্ণনা সংখ্যায় তাওয়াতুরে পৌঁছায় না; উপরন্তু জাল হাদিসের প্রচার ও দীর্ঘ সময় পরে মুখস্থ থেকে বর্ণনার কারণে নির্ভুলতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা Majmoo’ al-Fataawa (১/৪৫৯)-এ এই অবস্থানকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে বলেন—রাযী প্রকৃতপক্ষে অথেনটিক সুন্নাহকে অবজ্ঞা করছেন এবং তার বদলে আবু মা‘শার (জ্যোতিষবিদ ও জাদু-সংক্রান্ত কুসংস্কারমূলক বিশ্বাসী)-এর মত ভ্রান্ত ব্যক্তির কথাকে আকীদার ভিত্তি বানাচ্ছে, যা Zanādiqah-দের পথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

Zanādiqah (زنادقة) মানে হচ্ছে, গোপন কাফের—যারা ইসলামের ভেতর থেকেই ধর্মকে আঘাত করে। ভিতরে কুফর লুকিয়ে রেখে বাইরে মুসলমান সেজে থাকে। যারা মুনাফিকদের থেকেও বেশি বিপজ্জনক। দ্বীনের মূল ভিত্তি নষ্ট করতে দার্শনিক, আগুস্তিক, মজুসি বা গ্রিক চিন্তা ব্যবহার করে।

ইমাম মালিক বলেন—যে ব্যক্তি কালামের মাধ্যমে দ্বীন চাইবে, সে জিন্দীক হবে; (Damm al-Kalâm 4/115, 872–874)। ইমাম আবু হানিফা প্রথমে এটিকে জ্ঞান মনে করলেও পরে নিজের অবস্থান বদলান এবং বলেন সালাফ কখনও এই পথে যাননি, তাই এটিকে ত্যাগ করা উচিত (Manāqib Abī Hanīfah p.137–138)। ইমাম শাফিঈ কালামের লোকদের শাস্তি দেওয়ার মতো কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং বলেন—কালাম বিতর্ক মানুষকে তা‘তীল ও বিদআতে ঠেলে দেয় (Manāqib al-Shāfiʿī 1/462; Damm al-Kalām 4/295–309)। ইমাম আহমদ বলেন—যে ব্যক্তি কালামে লিপ্ত হয় সে সফল হবে না এবং শেষ পর্যন্ত জাহমিয়াহ–র মতো বিভ্রান্তিতে পড়বে (Siyar 11/291; al-Ibānah 2/54)

আল্লাহ সর্বত্র – নাকি সর্বজ্ঞ?

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। তিনি যা কিছু তোমরা করো, তা দেখেন।” (সূরা হাদীদ: ৪)

স্কলারগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, “আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন” বলতে আল্লাহ কি বুঝিয়েছেন তা ঠিক পরের আয়াতেই পাওয়া যায় – “তিনি যা কিছু তোমরা করো, তা দেখেন”।

অর্থাৎ, আল্লাহর জ্ঞান, দৃষ্টি এবং শক্তি তোমাদের ওপর সর্বদা রয়েছে। তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছু দেখেন, এবং সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী/নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই বলা হয়, – “আল্লাহ সর্বজ্ঞ”, “সর্বদ্রষ্টা”, “সর্বশক্তিমান”। কিন্তু এটা বুঝায় না যে – তিনি “সর্বত্র অবস্থানশীল” বা “সত্বাগতভাবে সর্বত্র”।

খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের (১৯৫৮ – ২০১৬) তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, – “হরির উপরে হরি, হরিতে শোভা পায় হরিকে দেখিয়া হরি, হরিতে লুকায়, তথা সর্বজীবে ঈশ্বর এই বিশ্বাসের আরেক নামই আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান”। এটি হিন্দু দর্শনের “ব্রহ্মন” (Brahman) একটি অত্যন্ত মৌলিক ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। আবার এই ধারণাটা হুলুল (hulool – حلول – আল্লাহ সৃষ্টির ভেতরে প্রবেশ করেন)-এর সাথে সম্পৃক্ত। আর হুলুলের ধারনা হিন্দু ধর্মের “অবতার” ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ‘হুলুল’ পরিভাষাটি সুফিবাদের একটা চূড়ান্ত পর্যায়।

🚩 এই পুরো বিষয়টি পরবর্তী পর্ব – ১৫ (সুফিবাদ) -এ বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাল্লাহ।

তিনি তাঁর ‘ইসলামী আকীদা’ বইয়ের ৬.৫.৪.২.২ (আল্লাহর নাম ও বিশেষণ বিষয়ে মূলনীতি) – তে উল্লেখ করেন, এই বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের মূলনীতি এই যে, কুরআন ও সহীহ হাদিসে আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে যা কিছু বলা হয়েছে সরল ও স্বাভাবিক অর্থে বিশ্বাস করা, আল্লাহর কোন নাম, কর্ম বা বিশেষণকে সৃষ্টির নাম, কর্ম বা বিশেষণের সাথে তুলনা করা পরিহার করা এবং সাথেসাথে আল্লাহর নাম, কর্ম বা বিশেষণের স্বাভাবিক অর্থের বাইরে রুপক অর্থে ব্যাখ্যা করা বর্জন করা। যেমন কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ কোন সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নয়। আবার পাশাপাশি মহান আল্লাহর শ্রবণ, দর্শন, কথোপকথন, হস্ত, মুখমণ্ডল, আরশের উপর সমাসীন হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া ইত্যাদি বিশেষণ ও কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *