আশ’আরীয়্যাহ-দের নামকরণ করা হয়েছে আবু আল-হাসান আল-আশ’আরীর (মৃত্যু, ৩২৪ হিজরি) নামে। তিনি এক সময় একজন প্রখ্যাত মুতাযিলী, আবু আলী আল-জুবায়ীর বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। জীবনের চল্লিশ বছর তিনি মুতাযিলী ছিলেন, এরপর একটি নির্দিষ্ট theological (ধর্মতাত্ত্বিক) বিষয় নিয়ে মতবিরোধের কারণে তিনি মুতাযিলী থেকে প্রত্যাহার করেন।

একবার ইমাম আশয়ারি তার উস্তাদ আলী আল-জুবায়ীর সাথে বিতর্ক শুরু করেন; এবং উস্তাদ তার প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় তিনি মুতাজিলা চিন্তাধারা থেকে সরে আসেন। উস্তাদের সাথে এই বিতর্কটি “তিন ভাইয়ের মাসয়ালা” হিসাবে পরিচিত। এখানে ‘তিন ভাইয়ের গল্পটা’ একটু বলিঃ

ইমাম আশয়ারী তার মুতাজিলা উস্তাদ আলী আল জুব্বায়ীকে একটা প্রশ্ন করেন – ধরুন, কোনো দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন ভাই মারা গেলো। বড় ভাইটা খুব নামাজ-রোজা পালন করতো, এবং খুব ভালো ছিলো। মেজো ভাইটা খুব খারাপ ছিলো, এমনকি নামাজ-রোজাও পালন করতো না। আর, ছোট ভাইটার এখনো ইবাদাত করার বয়স হয়নি। আখিরাতে এই তিন ভাই কে কোথায় যাবে? উস্তাদ আলী আল জুব্বায়ী বলেন, – “বড় ভাইটা তার ভালো কর্মের কারণে জান্নাতে যাবে, মেজো ভাইটা তার খারাপ কর্মের কারণে জাহান্নামে যাবে, এবং ছোট ভাইটা যেহেতু কোনো ইবাদাতও করেনি, আবার কোনো খারাপ কাজও করেনি, তাই সে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থানে(নিরাপদ) থাকবে।” ইমাম আশয়ারী বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন যদি ছোট ভাইটা প্রশ্ন করে, “হে আল্লাহ তুমি আমাকে ছোট অবস্থায় মৃত্যু দিলে কেন? আমি যদি বড় হতাম, তাহলে তোমার ইবাদাত করতাম, এবং আমার বড় ভাইয়ার সাথে আমিও জান্নাতে যেতে পারতাম।” ছোট ভাইয়ের উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ তায়ালা কিভাবে দিবেন? উস্তাদ জুব্বায়ী বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ছোট ভাইটাকে বলবেন, শুনো, তুমি বড় হয়ে খারাপ কাজ করতে এবং তোমার মেজো ভাইয়ের মতো জাহান্নামে যেতে। তাই তোমাকে ছোট অবস্থায় মৃত্যু দিয়েছি, যাতে তুমি জাহান্নামে যেতে না হয়।” ইমাম আশয়ারী এবার তাঁর উস্তাদকে বলেন, আচ্ছা, এখন মেজো ভাইটা যদি আল্লাহকে বলে যে, “হে আল্লাহ আমাকে কেন আমার ছোট ভাইয়ের মতো ছোট বেলায় মৃত্যু দাওনি? যদি আমাকে ছোট বেলায় মৃত্যু দিতে, তাহলে তো আমাকে আজ জাহান্নামে যেতে হতো না।” মেজো ভাইয়ের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ কি জবাব দিবেন?”

ইমাম আশয়ারীর এই প্রশ্ন শুনে উস্তাদ জুব্বায়ী কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ফলে ইমাম আশয়ারী বুঝলেন যে, মুতাজিলা মেথডলজি দিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। যার কারণে তিনি মুতাযিলী থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন।

সোর্সঃ

  • Subki — Tabaqat al-Shafi‘iyyah, Vol. II, pp. 250–251
  • Ibn Khallikan — Wafayat al-A‘yan, Vol. I, pp. 608–609

মুতাযিলী ত্যাগ করার পর তিনি ইবন কুল্লাবের আকীদা গ্রহণ করেন, এবং এরপর কুল্লাবী আকীদা আবু আল-হাসান আল-আশ’আরীর নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

🚩 কুল্লাবী আক্বীদাহ সম্পর্কে গত পর্বে-(১১) আলোচনা হয়েছে।

তবে, প্রাথমিক কুল্লাবী আকীদা শুধুমাত্র প্রাথমিক আশ’আরী এবং তাদের সমসাময়িকরা মান্য করত, যেমন আল-আশ’আরি নিজে, আবু আল-আব্বাস আল-ক্বালানীসি, ইবন মাহদী আত-তাবারী (মৃত্যু, ৩৮০ হিজরি), আবু বকর আল-বাকিলানি (মৃত্যু, ৪০৩ হিজরি), আল-বায়হাকী (মৃত্যু, ৪৫৮ হিজরি)।

পরবর্তী আশ’আরীরা, বিশেষ করে আল-জুয়ায়নী (মৃত্যু, ৪৭৮ হিজরি), আল-গজালী (মৃত্যু, ৫০৫ হিজরি), আর-রাজী (মৃত্যু, ৬০৬ হিজরি), প্রাথমিক কুল্লাবী আকীদার সাথে কিছু মুতাযিলী এবং জাহমীয়্যের উসুল মিলিয়ে এক ভিন্ন দিক গ্রহণ করেন। আজকের সব আশ’আরীরা মূলত এই দিকেই আছে।

যেখানে প্রাথমিক কুল্লাবী আশ’আরীরা কেবলমাত্র ইচ্ছামত নির্বাচিত কাজসমূহ (আল-আফ’আল আল-ইখতিয়ারিয়্যাহ) নিয়ে সমস্যা অনুভব করতেন এবং তাদের যুক্তিতাত্ত্বিক প্রমাণ “হুদূথ আল-আজসাম” এর সাথে তা মিলিয়ে নিতে পারতেন না, সেখানে পরবর্তী আশ’আরীরা কুল্লাবী আকীদার সেই অংশগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। যেমনঃ আল্লাহর সত্তার কিছু গুণাবলী (মুখ, হাত, চোখ) নিশ্চিত করা এবং আল্লাহ নিজেই তাঁর সত্তা সহ সিংহাসনের উপর, আসমানের উপরে অবস্থান করছেন তা নিশ্চিত করা।

এখানে “আল-আফ’আল আল-ইখতিয়ারিয়্যাহ” – মানে হচ্ছে, আল্লাহর সেই কাজগুলো, যেগুলো তিনি নিজ ইচ্ছায় করেন, যখন চান তখন করেন। তবে এটা বিগত পর্ব – ৫ (তকদীর)-এর “ইরাদায়ে ক্বাওনিয়াহ” না। এ দুইট এক জিনিস না। তবে রিলেটেড।

💌 প্রিয় পাঠক, এই পর্যায়ে এসে, কুল্লাবিয়্যাহ থেকে আশআরিদের বিভিন্ন স্তর এবং তাদের মাঝে বিভিন্ন আক্বীদাহ নিয়ে তুলনাগুলো বিস্তারিত লিখতে গেলে এই একটি পর্বে তো সম্ভব না-ই, বরং এই আক্বীদাহ সিরিজের মত আরেকটি আস্ত সিরিজও যথেষ্ট নয়। তাছাড়াও বিষয়গুলা বেশ জটিল এবং আরবী জ্ঞান, কালাম – ঐতিহ্যিক তত্ত্ববিদদের যুক্তি, ইত্যাদি সম্পর্কে ধারনা না থাকলে বুঝা খুব কঠিন, তবে অসম্ভব আমি বলবোনা। তাই আমি চেষ্টা করছি ভুল আক্বীদাহগুলোর চেইন এবং কিছু সহজ উদাহরণের মাধ্যমে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা। তবে পাঠকের উচিৎ হবে বিস্তারিত জানা, এর কারন নিশ্চই পাঠক বুঝতে পেরেছেন। বিশ্বাস যখন ভাংতে শুরু করে তখন বিস্তারতি না জানলে সন্দেহের পূর্ন অবকাশ হয় না।

🚩 সিরিজের শেষের দিকে আক্বীদাহ এর প্রধান গ্রন্থগুলোর লিস্ট দিয়ে দিবো ইনশাল্লাহ।

চলুন জাহমিয়্যাহ থেকে আশআরী পর্যন্ত একটা চেইন খুব সংক্ষিপ্ত আকারে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করিঃ

১/ মূল শেকড়ঃ জাহম ইবন সফওয়ান (মৃত্যু: ১২৮ হিজরি)

“হুদূথুল-অজসাম” নামক যুক্তির ভিত্তিতে তিনি সম্পূর্ণ তাতীল-এ চলে যান: অর্থাৎ আল্লাহর সব নাম, গুণাবলী এবং ক্রিয়া অস্বীকার করেন — যাতে তাদের ব্যবহৃত যুক্তি মিথ্যা প্রমাণ না হয়। কারণ যদি গুণাবলী স্বীকার করা হয়, তাহলে তাদের মতে আল্লাহকে “জিসম” (দেহ) বলা বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে — আর সে কারণে তাঁকে সৃষ্ট বলে ধরে নিতে হবে।

২/ মু’তাযিলা (গাছের তলা/মুখ্য কান্ড)

তারা আল্লাহর সব গুণ এবং ক্রিয়া অস্বীকার করে — যাতে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ (হুদূথুল-অজসাম) বাতিল না হয়ে যায়।

৩/ ইবন কুল্লাব (মৃত্যু: ২৪০ হিজরি) – (বড় ডাল/শাখা)

তিনি মু’তাযিলার আক্বীদাকে সুন্নাহর আক্বিদার সাথে মিলানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আল্লাহর নাম ও সিফাত ধাতীয়াহ (আত্মগত গুণাবলী) গ্রহণ করেন। কিন্তু সিফাত ফিলিয়্যাহ (কর্মগত গুণাবলী) অস্বীকার করেন, কারণ সেগুলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণকে নষ্ট করে দেয়।

৪/ আশআরী আক্বীদা (ডালপালা/প্রশাখা ও পাতা)

তারা তাদের বিভিন্ন মতবাদকে এমনভাবে যুক্তি দিয়ে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে যা “হুদূথুল-অজসাম” (দেহের حدوث-এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ)-কে বাতিল না করে। একই সময়ে তারা তা’তীল (নাকচ বা অস্বীকার)-এর দিকে ইশারা না করতে পাতার আড়ালে অনেক বিষয় গোপন রাখে। যা প্রকৃতপক্ষে জাহমীয়্যাহ এবং মুতাযিলীর শাখা থেকে উদ্ভূত শাখার পাতা ছড়ানোর মতো।

মাতুরিদিয়্যাহ—

মাতুরিদিয়্যাহ হলো কালামশাস্ত্রের (ইলমুল কালাম) বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি দল। এরা জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলাহ, কুল্লাবিয়্যাহ এবং আশআরিয়্যাহ-র সঙ্গে তাদের পদ্ধতির মৌলিক ভিত্তিগুলোতে (অর্থাৎ ইলমুল কালাম) অংশীদার হলেও, সেই ভিত্তি থেকে উদ্ভূত শাখাগত অনেক বিষয়ে তাদের থেকে ভিন্নমত পোষণ করে। আবু মানসুর আল-মাতুরিদি (মৃত্যু: ৩৩৩ হি.)-এর মৃত্যুর পর সঙ্গে সঙ্গে ‘মাতুরিদিয়্যাহ’ নামে কোনো সংগঠিত দল ছিল না; বরং কয়েক শতাব্দী পরে এই দল ও তাদের আকীদাহ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত ও লিপিবদ্ধ হয়। তাদের আকীদাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আশআরীদের আকীদার সাথে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।

কুল্লাবিয়্যাহ, আশআরিয়্যাহ এবং মাতুরিদিয়্যাহ—এই তিন দলের আকীদা একে অপরের খুব কাছাকাছি; কারণ তারা সবাই আল্লাহর থেকে “হাওয়াদিথ” (ঘটনা, সংঘটন)–এর নাকচ করার ওপর ভিত্তি করে তাদের মতবাদ গড়ে। “হাওয়াদিথ” শব্দটি দ্বারা তারা বোঝায় আল্লাহর সেই কর্মসমূহ যা তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তারা যেহেতু মহাবিশ্বকে একের পর এক ঘটনার সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে, তাই প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পর্কিত যে কোনো বিষয়ে ‘ঘটনা’–র ধারণা পাওয়া গেলে তারা তা ব্যাখ্যা-বিকৃতি (তাওয়ীল) করে। তাই ইস্তিওয়া (আরোহণ), নুযুল (নামা), গদব (ক্রোধ), মহাব্বা (ভালবাসা), রিদ্বা (সন্তুষ্টি) ইত্যাদির তাওয়ীল তারা করে থাকে।

মু’তাযিলাদের সঙ্গে তাদের বিতর্কে (অর্থাৎ কুল্লাবিয়্যাহ, আশআরিয়্যাহ, মাতুরিদিয়্যাহ) তারা মু’তাযিলাদের সন্দেহ ও যুক্তিগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি, যদিও কিছু বিষয়ে আল্লাহর গুণাবলী প্রমাণ করতে তারা যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করতে পেরেছিল। ফলে তাদের আকীদা নির্ধারিত হয়ে দাঁড়ায়—আল্লাহর নামসমূহ এবং কিছু গুণকে স্বীকার করা, কিন্তু স্বেচ্ছাকৃত/ইচ্ছাকৃত কর্মসমূহ (সিফাত ফি’লিয়্যাহ) অস্বীকার করা।

কুল্লাবিয়্যাহর নীতিমালার দ্বারা প্রভাবিত পরবর্তী যুগের হাম্বলীরা

এটি জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, ইমাম আহমদের মাযহাব (হাম্বলী মাযহাব) অনুসারীদের মধ্যে পরবর্তী যুগে এমন কিছু লোক ছিল যারা আল্লাহর ইচ্ছাকৃত কর্ম (সিফাত ফি’লিয়্যাহ) সম্পর্কে মু’তাযিলাহ ও কুল্লাবিয়্যাহর কিছু সংশয়ে পড়ে যায়। তারা এই গুণগুলোকে “হাওয়াদিথ” (created events – নবসৃষ্ট ঘটনা) বলে মনে করত এবং তাই সেগুলো অস্বীকার বা তাওয়ীল করত। এর ফলে তাদের বক্তব্যে ও মানসিকতায় কালামবিদদের কিছু ভ্রান্ত ধারণা দেখা দেয়। এদের মধ্যে ছিলেন—

  • আল-কাজী আবু ইয়ালা (মৃত্যু: ৪৫৮ হি.),
  • ইবন ‘অকীল (মৃত্যু: ৪৮৮ হি.),
  • ইবন আজ-জাঘুনী (মৃত্যু: ৫২৭ হি.),
  • এবং পরে ইবনুল জাওযী (মৃত্যু: ৫৯৭ হি.)।

এটি দুইটি কারণে বুঝে রাখা জরুরিঃ

প্রথমতঃ ইমাম আহমদের মাযহাব অনুসারীদের মধ্যে যে বিচ্যুতি দেখা দেয় তা অন্যান্য মাযহাবসমূহ (আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ)–এর অনুসারীদের তুলনায় অনেক কম ছিল। ঐ সব মাযহাব-অনুসারীদের মধ্যে জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলাহ, কুল্লাবিয়্যাহ, আশআরিয়্যাহর বহু মূলনীতি প্রচলিত হয়ে যায় এবং আকীদাহতে বহু বিচ্যুতি ও সুফিদের চরমপন্থী ধারণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়তঃ আজকের যুগের জাহমিয়্যাহ-আশআরিয়্যাহ যখন সালাফদের আকীদাকে আক্রমণ করতে চায়, তখন তারা এই পরবর্তী যুগের কিছু হাম্বলী মাযহাবের আলেমের ভুল মতামতকে হাতিয়ার বানায়—যারা নামমাত্র ইমাম আহমদের অনুসারী হলেও আসলে তার আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। তারা সেই ভুল মতামতগুলোকে ইমাম আহমদের সাথে যুক্ত করে মানুষকে প্রতারিত করার জন্য এবং সালাফের আকীদাকে দুর্বল দেখানোর জন্য।

🚩 মাযহাব সম্পর্কে বিস্তারিত পর্ব সামনে আসছে ইনশাল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *