কুল্লাবিয়্যাহ নামকরণ করা হয়েছে আবদুল্লাহ বিন সাঈদ বিন কুল্লাব — আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন সাঈদ বিন মুহাম্মদ বিন কুল্লাব আল-কাত্তান আল-বাসরী (মৃত্যু ২৪০ হিজরী) এর নামে। তিনি ছিলেন বসরার সুপ্রসিদ্ধ ‘ইলম কালাম’ বিশেষজ্ঞ ইমাম। মুতাযিলীদের প্রতাপের যুগে মামুনের দরবারে তিনি আহলুস সুন্নাতের পক্ষে বিতর্কে মুতাযিলীদেরকে পরাস্ত করেন। তিনি মহান আল্লাহর ‘যাতী’ বা ‘সত্তীয়’ বিশেষণগুলো স্বীকার করতেন। তবে তিনি মহান আল্লাহর ‘ফিলী’ বা কর্ম বিষয়ক বিশেষণগুলো ব্যাখ্যা করতেন। ইবন কুল্লাবের ছাত্র ইমাম আবুল হাসান আলী ইবন ইসমাঈল আল-আশআরী (৩২৪ হি) তার মত সমর্থন করেন এবং পরবর্তীতে ‘‘আশআরী’’ মতবাদের জন্ম হয়।

🚩 এখনে তার নামের শেষে “আল-বসরী” যোগ থাকার অর্থই হলো — তিনি বসরা শহরেই জন্মগ্রহণ বা বসবাস করেছেন। আর এই বসরা অঞ্চলের কথাই বিগত পর্ব – ৬ (জাহমিয়া মতবাদ)-এ উল্লেখ করেছিলাম।

তার কিছু পরিচিত গ্রন্থ রয়েছে, যেমনঃ কিতাব আস-সিফাত, খালক আফ’আল, আর-রদ্দ ‘আলা আল-মুতাজিলা। এই বইগুলো আজ আর অস্তিত্ব নেই, তবে এগুলোর কিছু অংশ অন্যান্য গ্রন্থে সংরক্ষিতভাবে পাওয়া যায়। যেমনঃ

  • আবুল হাসান আল-আশআরীর আল-মাকালাত
  • ইবন তাইমিয়াহ ও ইবন আল-কাইয়্যিমের বিভিন্ন রচনা
  • এবং প্রাথমিক যুগের আশআরী আলেমদের লেখায়—যেমন ইবন ফাওরাক (মৃত্যু ৪০৬ হি.)—তিনি ইবন কুল্লাবকে উদ্ধৃত করেছেন।

আরো জানা যায়, তার কিছু গ্রন্থ—যেমন কিতাবুস-সিফাত—উল্লেখ করেছেন ইবন আন্-নাদিম (মৃত্যু ৩৮৫ হি.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ফিহরিস্ত-এ, যেখানে তিনি ইবন কুল্লাবকে “হাশাবিয়্যাহ দলের একজন” হিসেবে উল্লেখ করেন।

“হাশাবিয়্যাহ (الحشوية)” — এই শব্দটি ইসলামী আকীদার ইতিহাসে একটি তিক্ত, অবমাননাকর উপাধি, যা মূলত মুতাকাল্লিমূন (কালামবিদ), মুতাজিলা এবং পরবর্তীতে আশআরি কিছু আলেম ব্যবহার করতেন তাদের বিরোধীদের হেয় করার জন্য। এটি কোন বাস্তব দল নয়—বরং একটি অপবাদমূলক লেবেল। “হাশাবিয়্যাহ” বলতে তারা বোঝাত — “সাধারণ বেদুইন-সুলভ, অশিক্ষিত লোক, যারা শরীয়তের নস (টেক্সট) যেমন আছে তেমনই মানে—যুক্তি বোঝে না।”

ইবন হাজর আল-আসকালানী তার “লিসানুল মীযান” গ্রন্থে এই বক্তব্য ব্যাখ্যা করে বলেন যে, – “ইবন কুল্লাব সালাফদের পদ্ধতির উপর ছিলেন, অর্থাৎ আল্লাহর গুণাবলীর ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের আয়াত-হাদিসে বর্ণিত অর্থগুলোতে অযথা রূপক ব্যাখ্যা (তা’উইলাত) না করা”। কিন্তু এখানে ইবন হাজর আল-আসকালানী সালাফদের পদ্ধতি বলতে যেটা বুঝিয়েছেনঃ ”আল্লাহর গুণাবলীর ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের আয়াত-হাদিসে বর্ণিত অর্থগুলোতে অযথা রূপক ব্যাখ্যা (তা’উইলাত) না করা” – এই ব্যাখ্যায় একটি ভুল আছে।

তিনি এটিকে তাফউইদ (সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানের ওপর ছেড়ে দেওয়া) বুঝিয়েছেন। এখানেই ভুল। চলুন বিস্তারিত বুঝার চেষ্টা করিঃ

আরবি ভাষায় “তাফউইদ” মানে “অর্পণ করা” বা “সমর্পণ করা”। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে এটি ব্যবহৃত হয় আল্লাহর সিফাতের অর্থ বা প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের সীমিত জ্ঞানকে স্বীকার করে, সেই জ্ঞানকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করার জন্য।

তাফউইদ দুই রকমঃ

১/ তাফউইদ আল-মা’না = অর্থ আল্লাহর কাছে সোপর্দ

২/ তাফউইদ আল-কাইফ = কিভাবে (বাস্তবতা) আল্লাহর কাছে সোপর্দ

সালাফরা ২ নম্বরটি করতেন। অর্থাৎ —

👉 অর্থ জানি 👉 কিভাবে — তা জানি না

যেমন সূরা আল-ফাতহ (৪৮:১০) – “ইয়াদুল্লাহ ফাওকা আইদীহিম” (আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর)। এখানে “যাদ” শব্দটি আল্লাহর সিফাত (গুণ) হিসেবে এসেছে। এই হাত বলতে আমরা মানুষের মত হাত বা সৃষ্টির কোন কিছুর মত তো নেওয়া যাবেইনা। এই ব্যাপারে দুই পক্ষই একমত। কিন্তু,

১/ তাফউইদ আল-মা’না (অর্থ আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা) অর্থে এখানে “যাদ” শব্দটির অর্থ (মা’না) নিজেই আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা হয়। অর্থাৎ, আমরা শব্দটি পাঠ করি, বিশ্বাস করি যে এটি আল্লাহর সিফাত, কিন্তু এর অর্থ কী – হাত? ক্ষমতা? নিয়ন্ত্রণ? বা অন্য কিছু? – এটি আমরা নির্ধারণ করি না বা চিন্তা করি না। কারণ মানুষের ভাষা ও বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর গুণের অর্থ পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব, এবং চেষ্টা করলে ভুল হতে পারে (যেমন তাশবীহ বা সাদৃশ্যের ভুল)। শুধু বলি: “আল্লাহর যাদ আছে, যেভাবে কুরআনে বলা হয়েছে, কিন্তু তার অর্থ শুধু আল্লাহই জানেন।”

২. তাফউইদ আল-কাইফ (কীভাবে বা বাস্তবতা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা) অর্থে এখানে “যাদ” এর আপাত অর্থ (যাহিরী মা’না) স্বীকার করা হয় – অর্থাৎ, এটিকে “হাত” হিসেবেই গ্রহণ করা হয়, কিন্তু এর প্রকৃতি বা “কীভাবে” (কাইফ) এটি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য তা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা হয়। অর্থাৎ, আমরা বলি: “আল্লাহর হাত আছে, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে, কিন্তু এটি মানুষের হাতের মতো নয় – না শারীরিক, না সীমিত। কীভাবে এটি আছে বা তার বাস্তবতা কী, তা আমরা জানি না এবং চিন্তা করি না।” এটি তাশবীহ (সাদৃশ্য) এড়ানোর জন্য, কারণ আল্লাহর কোনো সাদৃশ্য নেই (লাইসা কামিছলিহি শাইউন)।

সালাফরা ২ নম্বরটি করতেন। যেমন, ইমাম মালিকের উক্তি অনুসারে – “সিফাত জানা, কিন্তু কাইফ অজানা”।

👉 সালাফরা অর্থ (মা’না) অস্বীকার করেননি। 👉 সালাফরা বলেননি যে “আমরা জানিই না এর মানে কী।”

কিন্তু ইবন হাজর ভাবলেন সালাফরা ১ নম্বরটি করতেন, অর্থাৎ:

“আল্লাহর হাত — এর কোন অর্থই আমরা জানি না”। এটা ভুল ব্যাখ্যা। এটাকে বলে তাফউইদ আল-মা’না, যা সালাফরা করতেন না।

┇→———

ইবন কুল্লাব মুতাজিলাহর বিরুদ্ধে আল্লাহর ইচ্ছার ভিত্তিতে নির্বাচিত কাজ (আল-আফ’আল আল-ইখতিয়ারিয়্যাহ) ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না, তাই তিনি এই ধরনের বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করেছিলেন। এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে আল্লাহ ইচ্ছা করলে কথা বলা, রাগ হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া, এবং তাঁর সিংহাসনের উপর উঠা ইত্যাদি। এভাবে আল্লাহর কাজ অস্বীকার করা, যুক্তি হিসেবে যে এগুলো আল্লাহকে পরিবর্তনের অধীনে নিয়ে আসবে (যার মাধ্যমে তিনি সৃষ্টির মতো হবেন), কুল্লাবি আকীদার বিশেষ চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল – অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব ঘটনা ঘটে তা (যা তাঁরা হাওয়াদিথ বলে উল্লেখ করে) অস্বীকার করা।

হাওয়াদিথ (الحوادث) অর্থ এমন সব ঘটনা বা কাজ, যা সময়ের মধ্যে নতুনভাবে সংঘটিত হয় (Created, Occurring-in-time events). অর্থাৎ এমন জিনিস যা “আগে ছিল না, পরে হলো।” যেমন,

  • তুমি কথা বলছিলে → এখন কথা বলা শুরু করলে (নতুন কাজ ঘটলো)
  • তুমি বসা অবস্থায় ছিলে → এখন দাঁড়ালে (নতুন অবস্থা ঘটলো)

কুল্লাবিদের যুক্তি ছিলঃ

“যদি আল্লাহ চান তখন কথা বলেন, চান তখন রাগ হন, চান তখন খুশি হন—

তাহলে আল্লাহর মধ্যে ‘নতুন ঘটনার’ সূচনা হবে।

নতুন ঘটনা মানে সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।

আর সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হলে, তিনি হবে সৃষ্টির মতো।”

এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে তারা বলত — ”আল্লাহর মধ্যে কোনো নতুন কাজ, নতুন ঘটনা ঘটে না।”

এই নীতিকেই ধরে রেখে তিনি কুরআন সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন। তিনি বলেছিলেন, “কালাম (বক্তব্য) কেবলমাত্র সেই অর্থ, যা আল্লাহর সঙ্গে অবিন্যস্তভাবে এবং চিরন্তনভাবে বিদ্যমান। আর আমাদের কাছে যে কুরআন আছে, তা কেবল সেই অর্থের হিকায়াহ (উদ্ধৃতি), যা চিরন্তনভাবে আল্লাহর সঙ্গে বিদ্যমান”। তিনি এই মতবাদ উদ্ভাবন করেছিলেন, যাতে মুতাকাল্লিমুনদের মধ্যে প্রচলিত “হুদূথ আল-আজসাম” (দেহের সৃষ্টি) যুক্তির সঙ্গে সংঘাত বা বিরোধ না ঘটে।

┇→———

ইবন কুল্লাব-এর এই আক্বীদাহ পরবর্তীতে “প্রারম্ভিক আশআরিদের আকীদা” নামে পরিচিত হয়। আবুল হাসান আল-আশআরী ইবন কুল্লাবের আকীদা গ্রহণ করেন, কারণ ইবন কুল্লাবের মুতাযিলাদের বিরুদ্ধে অনেক শক্তিশালী খণ্ডন ছিল। যাদের থেকে আল-আশআরী নিজে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। ইবন কুল্লাব হাদিস ও সুন্নার দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং তাঁর অনেক ভালো অবস্থানও ছিল। কিন্তু তিনি মুতাযিলা ও আহলুস সুন্নাহর মাঝামাঝি একটি পথ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে তাঁর আকীদার কিছু দিক ব্যাখ্যা করা যায় যেমনঃ

  • তিনি আল্লাহর সিফাত যায়নিয়া/সিফাত ধাতিয়্যাহ (আল্লাহর সত্তার গুণাবলী) প্রমাণ করতেন
  • কিন্তু তিনি সিফাত ফি়লিয়্যাহ (আল্লাহর কর্মগত বা ইচ্ছাধীন গুণাবলী) অস্বীকার করতেন

এবং তিনি “কালাম নাফসি”—অর্থাৎ আল্লাহর সত্তার মধ্যে থাকা চিরন্তন কথন—এই ধারণাটি উদ্ভাবন করেন, যাতে তিনি “আল্লাহর কালাম সৃষ্টি” —এই মুতাযিলাদের দাবী থেকে বাঁচতে পারেন। এ ছাড়াও তাঁর আরও বহু মত ছিল—যা নিজেই একটি বিস্তৃত আলাদা আলোচনার বিষয়; ইনশাআল্লাহ, তা অন্য প্রবন্ধে আলোচিত হবে।

জাহমিয়াহদের বিরুদ্ধে ইবন কুল্লাবের যুক্তিঃ

ইবন কুল্লাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার এই কাজটা উল্লেখ না করলেই নয়। তৎকালীন জাহমিয়াহরা আল্লাহকে এমনভাবে বর্ণনা করছে, যা বাস্তবে ‘অস্তিত্বহীনতার’ সমান। এবং এটি দাহরীয় (Dahriyyah – ম্যাটেরিয়ালিস্ট নাস্তিক) কুফরি ধারনার সঙ্গে একই রকম।

দাহরিয়াহরা বলতঃ কেবল “সময়” (ad-dahr) আছে, সময় মহাবিশ্ব থেকে আলাদা নয়, মহাবিশ্ব সময় থেকে আলাদা নয়, সময় কোনো স্থানে নেই, মহাবিশ্ব সময়ের ভেতরে নয়, সময় মহাবিশ্বকে স্পর্শ করে না, মহাবিশ্বও সময়কে স্পর্শ করে না। এ দুনিয়া শুধু সময়ের (ad-dahr) কারণে চলছে। মৃত্যু, জীবন, সব সময়ের (Dahr) কাজ। কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। সময়ই ঘটনাগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী। ইত্যাদি ইত্যাদি।

অর্থাৎ এরা এমন একটি অস্তিত্বের কথা বলে যা নয় ভিতরে, নয় বাইরে, নয় উপরে, নয় আলাদা, নয় সংযুক্ত। যা বাস্তবে অস্তিত্বহীনতার সমান।

📝 দাহরিয়্যাহ সম্প্রদায় সম্পর্কে খুব সুন্দরভাবে বলা আছে, সূরা আল-জাসিয়া(৪৫)-এর ২৪ নং আয়াতের তাফসীর ইবনে কাসীরে। এছাড়াও ইবন তাইমিয়্যা তাদের সম্পর্কে বলেন, – “দাহরিয়াহরা নাস্তিকতার সবচেয়ে নিম্ন স্তর”। — (Dar’ Ta’āruḍ al-ʿAql wa al-Naql)

ইবন কুল্লাব, জাহমিয়াহদের জিজ্ঞেস করলেনঃ

“তোমরা কি দাহরিয়াহদের কাফির মনে করো?”

জাহমিয়াহরা বললোঃ

“হ্যাঁ, অবশ্যই। কারণ তারা আল্লাহকে অস্বীকার করে এবং সময়কে ঈশ্বর বানায়।”

ইবন কুল্লাব তখন বললোঃ

তাহলে, তোমরাও তো আল্লাহ সম্পর্কে ঠিক দাহরিয়াহদের মতই কথা বলছ!

আল্লাহ আসমানের উপরে নয়, নিচে নয়, ভেতরে নয়, বাইরে নয়, কোনো দিকে নয়, কোনো স্থানে নয়, সৃষ্টি থেকে আলাদা নয়, সৃষ্টির সাথে যুক্তও নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, এটা “অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব”— যার মানে বাস্তবে আল্লাহ নেই। তাহলে, তোমরা দাহরিয়াহদের কাফির বলো। কিন্তু তোমাদের কথাও দাহরিয়াহদের মতই— শুধু শব্দটা বদলে ফেলেছো। বাস্তবে বিশ্বাস তো একই!

এছাড়াও জাহমিয়াহদের মধ্যে যারা বলে,

“আল্লাহ কোথায় — জিজ্ঞেস করা যাবে না।”

তাদের বিরুদ্ধে ইবন কুল্লাব বলেনঃ যারা “আল্লাহ কোথায়?” জিজ্ঞেস করে তারা আল্লাহর অস্তিত্ব নিশ্চিত করছে। কিন্তু তোমরা (জাহমিয়াহরা) আল্লাহকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছো যা কেবল মনের ভেতরে আছে — বাস্তবে নেই। তাই ঈমানের দিক থেকে তোমরাই বেশি সমস্যাযুক্ত।

কাররামিয়া/কাররামিইয়্যাহ (The Karraamiyyah)

কার্রামিয়্যাহ-রা ছিলো মুতকাল্লিমুনদের মধ্যে এক সম্প্রদায়, যারা যুক্তির ওপর বিশ্বাস করত এবং মুহাম্মদ ইবনে কার্রামের (মৃত্যু ২৫৫ হিজরী) অনুসারী ছিল। তারা জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলা এবং কুল্লাবিয়্যাহর মতাদর্শের বিপরীতে অবস্থান নিত। তবে তারা অতিরিক্তভাবে তাজসীম ও তাশবিহের (দেহাত্মকরণ বা আল্লাহকে মানবসমজাত্মক ভাবার) দিকে ঝুঁকেছিল। তারা দাবি করেছিল যে আল্লাহ একটি দেহ (জিসম) এবং আল্লাহ সিংহাসনের (আরশের) সংস্পর্শে আছেন। এ কারণে কুল্লাবিয়্যাহ ও প্রাথমিক আশ‘রিয়্যাহরা তাদের খণ্ডন করেছিল।

কার্রামিয়্যাহ মুরজি‘য়াহর মতবাদেরও অনুসরণ করত। মুরজি‘য়াহর মতে, ঈমানের সঙ্গে কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা দাবি করত যে ঈমান কেবল জিহ্বার প্রকাশ (tongue expression), যার অর্থ মুনাফিকরাও বিশ্বাসী হিসেবে গণ্য হতো।

“মুজাস্সিমাহ” শব্দটি কুল্লাবিয়্যাহ এবং প্রাথমিক আশ‘রিয়্যাহর ব্যবহারে কার্রামিয়্যাহর সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। তবে মিথ্যাভাবে এই উপাধি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ‘হ, হাদীসের ইমামগণ এবং সত্য ভক্তদের উপরও প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ তারা আল্লাহর গুণ গুলো স্বীকার করত এবং আল্লাহকে সিংহাসনের উপরে অবস্থানকারী হিসেবে জানত, তবে কার্রামিয়্যাহর মতো অতিরঞ্জন ও অতিরিক্ততা ছিল না।

এটি ঠিক সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, যা এক শতাব্দী আগে ঘটে। তখন মু’তাযিলা আহলুস সুন্নাহকে মুকাতিল ইবনে সুলেমানের তাজসীম ও তাশবিহের সঙ্গে অভিযুক্ত করেছিল, যে কিনা জাহমিয়্যাহ এবং মু’তাযিলার অস্বীকারের বিপরীত চরমে পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

ইমাম উসমান ইবন সাঈদ আদ-দারেমি বলেনঃ আমি ইব্রাহিম ইবনুল হুসাইনের সাথে ছিলাম, তখন প্যাচ পরা একজন লম্বা লোক আমাদের কাছে প্রবেশ করল এবং বলা হলঃ এ হচ্ছে ইবন কাররাম। ইবরাহীম তাকে বললেনঃ তুমি কি কোন আলেমদের কাছে আসা যাওয়া করেছ? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তুমি কি উসমান ইবন আফফান আস-সিজিস্তানির সাথে দেখা করেছ? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তুমি যা বলে বেড়াচ্ছ এই জ্ঞান কোথা থেকে পেলে? সে বললঃ এটা একটা নূর যা আল্লাহ আমার পেটে রেখেছেন। তিনি বললেনঃ তুমি কি ভালোভাবে সালাতের তাশাহহুদ পাঠ করতে পার? ইবন কাররাম বললোঃ হ্যাঁ, (তারপর তাশাহহুদ পড়তে গিয়ে সে তাশাহহুদকে অজ্ঞতাবশত এমন বিকৃত করে পড়লো যার অর্থ দাঁড়ায়) কামনা, দোয়া ও তওবা আল্লাহর। আমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং যারা ধার্মিকদেরকে ধ্বংস করেছে।… তিনি বললেনঃ উঠো, আল্লাহ তোমাকে অভিশাপ দিন। অতঃপর ইব্রাহীম ইবনুল হুসাইন তাকে সিজিস্তান থেকে নির্বাসিত করলেন। (যাহাবী, ইসলামের ইতিহাস, পালমিরা, ১৯/৩১৩)

এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ১/ কাররামিয়া সম্প্রদায়ের নেতা মুহাম্মাদ ইবন কাররাম আলেমদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

২/ কাররামিয়া সম্প্রদায় একটি বিদআতী সম্প্রদায় ছিল।

৩/ কাররামিয়া সম্প্রদায় একটি কালাম শাস্ত্রবিদ ফের্কা ছিল।

৪/ কাররামিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সালাফগণ কঠোর ছিলেন।

সুতরাং কেউ যদি সালাফী আলেমগণের কাউকে কাররামিয়াদের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়, তাহলে বুঝতে হবে যে সে হয় জাহেল, অথবা মিথ্যুক, প্রতারক ও ভণ্ড।

🚩 সালাফী আক্বীদাহ নিয়ে আলাদা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *