উমাইয়া যুগে, কাদরিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ, মুরজিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলাহ – এসব ফেরকার জন্ম হয়। বা কিছু ফেরকা সীমিত আকারে ছিলো। কিন্তু আব্বাসী যুগে তারা শক্তিশালী ও দৃষ্টিগোচর হয়। অর্থাৎ প্রায় সকল ফেরকার মূল ধারা উমাইয়াতে জন্ম হলেও আব্বাসী যুগে তারা সক্রিয়তা ও প্রসার লাভ করে। এই জন্যে তাদের নির্দিষ্ট টাইমফ্রেম নিয়ে অনেকের মাঝে সন্দেহ হতে পারে।
আগের নিবন্ধে আমরা উল্লেখ করেছি, – বিদআত বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, একটি বিদআত খণ্ডন করতে গিয়ে অনেকে আরেকটি বিদআত তৈরি করে ফেলত। যারা আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার করত যেমন, জাহমিয়্যাহ, – তাদের মোকাবিলায় কিছু লোক অত্যধিক প্রমাণে গিয়ে আল্লাহর গুণাবলীকে সৃষ্টির গুণাবলীর মতো করে তুলতে শুরু করল। তাদের ধারণা ছিল, আল্লাহ নিজে তাঁর জন্য যে গুণাবলী প্রমাণ করেছেন, তা সঠিকভাবে মানতে হলে সেগুলোকে সৃষ্টির মতো মানতেই হবে।
“মুশাব্বিহা” শব্দটি এসেছে “তাশবীহ” থেকে, যার অর্থ হলো তুলনা করা বা সাদৃশ্য করা। মুশাব্বিহারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা বলে আল্লাহর হাত (ইয়াদ), চোখ (আয়ন), এবং মুখ (ওয়াজহ) আছে, এবং সেগুলো সৃষ্টির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো হলেও বিশেষ ধরনের। দ্বিতীয় শতকে, মুখাতিল ইবন সুলায়মান (মৃত্যু: ১৫০ হিজরি)-কে এই ভ্রান্তির সূচনা-কারক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদিও পরের যুগে তার সম্পর্কে যারা লিখেছেন, তারা মূলত মু’তাযিলাদের গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করেই লিখেছেন। তাই মুখাতিল সম্পর্কে যেসব কথা আরোপ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই নির্ভুল নাও হতে পারে। তবে সে জাহম ইবন সাফওয়ানকে চিনত এবং তার সাথে বিতর্ক করত। এই ব্যাপারে আবু হানিফা (রহ.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে —
“দুইটি নিকৃষ্ট মত আমাদের কাছে পূর্ব দিক থেকে এসেছে: জাহম-মুআত্তিল (যে অস্বীকার করে), এবং মুখাতিল-মুশাব্বিহ (যে তুলনা করে)।” তারিখ বাগদাদ (১৩/১৬৪)
অতএব, জাহমিয়্যাহ যখন আল্লাহর শুনা, দেখা, মুখমণ্ডল ইত্যাদি গুণ অস্বীকার করত, তখন মুশাব্বিহাহ দাবি করত আল্লাহর গুণাবলী আমাদের গুণাবলীর মতোই; ফলে তারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য আরোপ করল। যদিও দলটি মূলত কালামবিদ (যারা দর্শন-যুক্তির মাধ্যমে ইসলাম রক্ষা করতে চাইত) ছিলোনা কিন্তু তারা আল্লাহর গুণ প্রমাণে অতিরঞ্জন করে ফেলেছিলো।
অপরদিকে আর “মুজাসসিমা” শব্দটি এসেছে “জিসম” (দেহ) থেকে। মুজাসসিমারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর জিসম বা দেহ রয়েছে। আল্লাহর অস্তিত্বের জন্য জিসম বা দেহ থাকা জরুরি। দেহ ছাড়া কোনো অস্তিত্ব হতে পারে না। ইতিহাসে মুজাস্সিমাহর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বা সূচনাকারীর নাম স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে কাররামিয়্যাহ (Karramiyyah) এর মধ্যে এই জগৎ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
🚩 কাররামিয়্যাহ সম্পর্কে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।
⭐ এখানে একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়,
সেই সময়ে জাহমিয়্যাহ ও মু’তাযিলাহ-রা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ-দের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতো যে, আহলুস সুন্নাহ নাকি মুজাস্সিমাহ ও মুশাব্বিহাহ; অর্থাৎ তারা নাকি আল্লাহকে সৃষ্টির মতো মনে করে। এটি ছিল একটি মিথ্যা অভিযোগ ও কলঙ্ক। এই একই অভিযোগ তাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারীরা আজও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আ’হকে আক্রমণ করতে ব্যবহার করে। এরই একটা উদাহরণ গত পর্বে(৯ – আল্লাহর সিফাত ও মূলনীতি), পায়ের নলা’ (ساق) দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলাম।
🚩 পরবর্তী পর্বে(বিশেষ করে পর্ব – ১৩) আরো কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। কারন ইন্টারনেটের সুবাধে আজ প্রায় ১১০০ বছর পরেও আমি তাদের(উত্তরাধিকারীদের) এহেন কার্যকলাপ দেখতে পেয়েছি।
Leave a Reply