আল্লাহর সিফাত (صفات الله) বলতে আল্লাহর গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যকে বোঝানো হয়। আল্লাহর সিফাত বা গুণ দুটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়: স্বত্বাগত গুণ (ذاتية صفات) এবং কর্মগত গুণ (فعلية صفات)।

স্বত্বাগত গুণ বলতে সেই গুণাবলীকে বোঝানো হয় যা আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পর্কিত এবং তাঁর সত্তার অংশ। যেমন আল্লাহ আরশে আছেন এটা আল্লাহর সত্বাগত গুন।

আর কর্মগত গুণ হলো সেই গুণাবলী যা আল্লাহ তাঁর কর্ম বা ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। যেমন আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া করেন এবং তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন।

বিগত পর্বগুলোতে আমরা দেখেছি কিভাবে জাহমিয়ারা এবং মু’তাযিলারা আল্লাহর সিফতকে অস্বীকার করে।

🚩 জাহমিয়া মতবাদ (পর্ব-৬) এবং মু’তাযিলাহ (পর্ব-৮) – এছাড়াও সামনে আরো অনেক পর্বে বিভিন্ন ফেরকার মাঝে দেখবো ইনশাল্লাহ।

আল্লাহর সীফাতকে কিভাবে অস্বীকার করা হয় তার আরো কিছু নমুনা পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এতে বিষয়টা আরো সহজ হবে এবং পরবর্তী পর্বগুলো বুঝতে সুবিধা হবে —

যেমন,
আল্লাহ বলেছেনঃ “আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।”
[সূরা আল-মায়েদা (৫ঃ৬৪-১৩), সূরা আল ফাতহ (৪৮ঃ১০), সূরা আল-মায়েদা (৫ঃ৬৪), ইত্যাদি]
এবং সহীহ হাদীছে يد الله (আল্লাহর হাত), كف الله (আল্লাহর হাতের তালু), كف الرحمن (রাহমানের হাতের তালু) এবং আল্লাহ তাআলার সিফাত সংক্রান্ত ইত্যাদি আরো অনেক বিষয়ই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু জাহামিরা বলবে, “এখানে হাত বলতে শক্তি বা ক্ষমতা বোঝানো হয়েছে, এবং এটি আল্লাহর প্রকৃত হাত নয়। কারন এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হলে সৃষ্টির সাথে তাশবীহ (তুলনা) হয়ে যায়।” কিন্তু আহলুস সুন্নাহ, এ গুণটিকে প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করে, যেমনটা আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তবে কোনো কিছুর সাথে তুলনা বা تشبيه (তাশবীহ) ছাড়া।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত বলে, ”যদি কেও বলে আল্লাহর হাত নাই, তাহলে কুফর হবে, কারন এর দ্বারা কোরআনের আয়াত অস্বীকার করা হয়। আর যদি আল্লাহর হাতের সাথে কোন কিছু সাদৃশ্য করে, যেমন ‘আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মত’ বলে, তাহলে হবে শিরক”। তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত শিরক করবেনা কুফরিও করবেনা। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন ঠিক সেইভাবে মেনে নিবে। কোন যুক্তি-দর্শন কিংবা ব্যখ্যা-বিশ্লেষন করতে যাবেনা।

আবার আল্লাহ সম্পর্কে আগ বাড়িয়ে বেশি বলা যাবেনা। যেমন, আল্লাহ বলেছেন আল্লাহ শোনেন। কিন্তু আল্লাহ বলেন নাই যে আল্লাহর কান আছে। এবং আল্লাহর শোনা আমাদের শোনার মত নয়।

আবু হানিফা র. বলেনঃ ”আমরা আল্লাহকে এমনভাবেই বর্ণনা করি, যেভাবে তিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন। আমরা তাঁর সম্পর্কে শরীর বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা বলি না এবং তাঁর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের সঙ্গে তুলনা করি না”।

এখানে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেনঃ আল্লাহর সিফাতকে কুরআন ও সুন্নাহতে যেমন বলা হয়েছে, ঠিক তেমনভাবেই মেনে নিতে হবে। এই সিফাতের প্রকৃতি বা ধরন নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। আমরা আল্লাহর সিফাত বিশ্বাস করি, তবে কীভাবে তা কার্যকর হয় বা তার প্রকৃতি কেমন—তা আমাদের বোধগম্যের বাইরে। আল্লাহর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের মতো নয়। ইমাম আবু হানিফা এখানে “তাশবিহ” বা তুলনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর গুণাবলিকে আমরা মানুষের বা সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা করতে পারি না।

আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী) বিষয়ে আহলুস-সুন্নাহর বিশ্বাস সংক্রান্ত ২১টি মূলনীতি আছেঃ

আমি এখানে মাত্র ৩টা রেফারেন্স সহকারে আলোচনা করবো। কারন প্রথম ৩টা মূলনীতির মাধ্যমেই বেশিরভাগ বিভ্রান্তি সনাক্ত করা সম্ভব। পাঠক যদি আরো বিস্তারিত গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চান আমি অনুরোধ করবো এই সংক্রান্ত সালাফদের বইগুলো পড়ে নেওয়ার জন্য।

মূলনীতি – ১ঃ যে সমস্ত বিষয় আল্লাহ নিজের জন্য তাঁর কিতাব (কুরআন) এ ঘোষণা করেছেন, অথবা যেগুলো তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর জন্য ঘোষণা করেছেন, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করা। তবে তা করতে হবে কোন ধরনের পরিবর্তন (তাহরিফ) না করে, অস্বীকার (তা’তীল) না করে, কিভাবে তা আছে তা বলা (তাকইফ) না করে, এবং সৃষ্টি সঙ্গে কোনো মিল বা সাদৃশ্য (তামথীল) স্থাপন না করে।

কারণ আল্লাহ নিজের সম্পর্কে যা জানেন, তিনি তা সবার চেয়ে ভাল জানেন। এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পালনকর্তা সম্পর্কে সৃষ্টির সকলের চেয়ে ভাল জানেন।

সূত্রঃ ‘Aqeedatus-Salaf Ashaabul-Hadeeth’ by as-Saaboonee, পৃষ্ঠা ৪, Majmoo’ul-Fataawaa, 3/3, 4/182, 5/26, 6/38 ও 515।

মূলনীতি – ২ঃ যে সমস্ত বিষয় আল্লাহ নিজের জন্য তাঁর কিতাবে (কুরআন) অস্বীকার করেছেন, অথবা যেগুলো তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর জন্য অস্বীকার করেছেন, সেগুলো আল্লাহর জন্য অস্বীকার করা, এবং সেই অস্বীকারকৃত বিষয়ের পরিপূর্ণ বিপরীতকে আল্লাহর জন্য নিশ্চিতভাবে স্বীকার করা।

উদাহরণস্বরূপ: আল্লাহর জন্য মৃত্যু অস্বীকার করা মানে তাঁর পরিপূর্ণ জীবনকে স্বীকার করা, আল্লাহর জন্য অন্যায় বা জুলুম অস্বীকার করা মানে তাঁর পরিপূর্ণ ন্যায়কে স্বীকার করা, এবং আল্লাহর জন্য ঘুম অস্বীকার করা মানে সবকিছুর উপর তাঁর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বকে স্বীকার করা।

সূত্রঃ Al-‘Aqeedat ut-Tadmuriyyah, ইবন তাইমিয়াহ, পৃষ্ঠা ৫৫; Al-Jawaab Saheeh Liman Baddala Deenal-Maseeh, তাঁর রচনা, 3/139।

মূলনীতি – ৩ঃ আল্লাহ তাআলার, পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত গুণ সম্পর্কে শুধুমাত্র সেই অনুযায়ী কথা বলা যাবে যা কুরআনের বা হাদিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে (তাওক্বিফীয়)। তাই আল্লাহর জন্য কিছুই নিশ্চিত করা যাবে না, তা ব্যাতিত যা আল্লাহ নিজের জন্য নিশ্চিত করেছেন (অথবা যা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাঁর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে)। একইভাবে আল্লাহর জন্য কিছুই অস্বীকার করা যাবে না, তা ব্যাতিত যা তিনি নিজের জন্য অস্বীকার করেছেন অথবা যা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাঁর জন্য অস্বীকার করা হয়েছে, (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।

📝 এখানে, Tawqeefiyyah (توقيفية) – এটি একটি বিশেষ ইসলামী তত্ত্ব, যার অর্থ নিজস্ব ব্যাখ্যা বা অনুমান ছাড়া, সরাসরি শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী গ্রহণ করা। অন্যভাবে বললে, কিছুই আল্লাহর সম্পর্কে বলার আগে অনুমান বা নিজের কল্পনা থেকে বের করা যাবে না। শুধু যা আল্লাহ নিজেই বলেছেন বা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন।

সূত্র: মাজমু‘উল-ফাতাওয়া, ৫/২৬

আল্লাহর সিফাত নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্তিঃ

আল্লাহর সিফাত সমূহ হচ্ছে গায়েবী জিনিস। যা আমারা দেখিনা এবং দেখতেও পারবোনা। সুতরাং এই গায়েবী জিনিস সম্পর্কে জানার একমাত্র পথ হচ্ছে ওহী। আর মানতেক বা যুক্তি-দর্শন হচ্ছে যুক্তি দিয়ে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা, পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা বা বোধগম্য করা। তাই যুক্তি/মানতেক, বোঝার চেষ্টা করতে পারে, ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে দৃশ্যমান বা অভিজ্ঞতামূলকভাবে বোঝানো সম্ভব নয়।

কিছু গোষ্ঠী বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে বিশেষ কিছু লোক, যাদের গাউস, কুতুব, আবদাল ইত্যাদি বলা হয়, তারা আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছে এবং দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা করে। যেমন, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী। এই ধরনের শিরকি আক্বীদাহ এসেছে সুফিবাদ থেকে।

🚩 সুফিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাবেন – ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ১৩ তে।

অথচ আল্লাহ বলেন, “জেনে রাখ, সৃষ্টি এবং পরিচালনা একমাত্র তাঁরই।” – সূরা আল-আ‘রাফ: ৫৪

আশআরি অনুসারিরা সালাফদের থেকে আল্লাহর সিফাত তাওয়িল করা হয়েছে বলে কিছু দলিল পেশ করে। নিচে এগুলা উল্লেখ করা হলো,

১. আয়াত: “وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ” (সূরা যারিয়াত: ৪৭)

আক্ষরিক অর্থ: “আমরা আকাশকে শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “أيدٍ” (আইদিন) দ্বারা বোঝানো হয়েছে “শক্তি এবং ক্ষমতা।” (তাফসিরে কুরতুবি ১৭/৫২)

এটি তাওয়িল নয়। কারণ এখানে “أيدٍ” শব্দটি আরবি ভাষায় মাসদার (مصدر – ক্রিয়ার মূল অর্থবোধক শব্দ) হিসাবে “শক্তি” অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি “يد” (হাত)-এর বহুবচন নয়। কোরআনের ভাষাগত দিক থেকে এটি স্বাভাবিক একটি ব্যাখ্যা। উদাহরণস্বরূপ, কোরআনের অন্য জায়গায় “ذو الأيد” (শক্তির অধিকারী) ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. এখানে শব্দের ভাষাগত ও প্রসঙ্গগত অর্থ দিয়েছেন, যা তাওয়িলের পরিবর্তে একটি ব্যাখ্যা।

২. আয়াত: “نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ” (সূরা আরাফ: ৫১)

আক্ষরিক অর্থ: “তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “নাসু” দ্বারা বোঝানো হয়েছে “ভুলে যাওয়া,” যা তাদের রহমত থেকে বঞ্চিত করার ইঙ্গিত দেয়। (জামিউল বায়ান ১১/১৯৪)

আরবি ভাষায় “نسيان” শব্দের অর্থ “ভুলে যাওয়া” ছাড়াও “বর্জন করা” বা “উপেক্ষা করা” হতে পারে। আল্লাহর ক্ষেত্রে “ভুলে যাওয়া” (যা মানুষের সীমাবদ্ধতা) প্রযোজ্য নয়। তাই এখানে “نسيان” অর্থ “বর্জন করা” বা “তাদের ত্যাগ করা।”

এটি আল্লাহর সিফাতের প্রকৃত সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার জন্য প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা।

৩. আয়াত: “يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ” (সূরা ক্বালাম: ৪২)

আক্ষরিক অর্থ: “যে দিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “সাক” দ্বারা বোঝানো হয়েছে “ভয়াবহতা এবং কঠিনতা।” (তাফসিরে তাবারি)

আরবি ভাষায় “ساق” শব্দটি কেবল শারীরিক অংশ নয়, বরং “অত্যন্ত কঠিন অবস্থা” অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাফসিরকারকরা এখানে ভাষাগত অর্থ দিয়েছেন, যাতে আল্লাহর কোনো সিফাত বা গুণ মানবীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত না হয়। তবে এটি বিতর্কিত হতে পারে, কারণ সাহিহ হাদিসে “ساق” আল্লাহর গুণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

“আমাদের প্রভু তার ‘পায়ের নলা’ (ساق) উন্মোচন করবেন, তখন প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী তাঁর সামনে সিজদা করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সিজদা করত, তারা সিজদা করতে পারবে না। বরং তাদের পিঠ শক্ত ও সমতল হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারি, কিতাবুত তাওহীদ, হাদিস নম্বর: ৪৯১৯)

আবু সাঈদ খুদরি, ইবনু মাসউদ, ইমাম বুখারি, আবু ইয়ালা, ইবনুল কাইয়্যিম, বিন বায রাহ. প্রমুখের নিকট তা সিফাতের আয়াত হিসেবে গণ্য।

আর যারা সিফাত হিসেবে গণ্য করেন না, তারা হলেন- ইবনে আব্বাস, হাসান বসরি, মুজাহিদ, সাঈদ বিন যুবায়ের, কাতাদাহ, ইকরিমা রা. প্রমুখ।

মতভেদের কারণ হচ্ছে, কোরআনে সাক (নলা) শব্দ আল্লাহ’র দিকে এজাফত (إضافة – একটি বিশেষ্যকে আরেকটি বিশেষ্যের সাথে যুক্ত করে সম্পর্ক বা মালিকানা বোঝানো) হয়ে আসে নি, যার ফলে নলা শব্দ দ্বারা আল্লাহ’র নিজের পায়ের নলা বুঝালেন, নাকি কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহতা বুঝালেন এ নিয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করেছেন। এতে নলা সিফাত হওয়ার অস্বীকৃতি নয়; বরং আয়াতটি নলা সিফাত হওয়ার নির্দেশ করে কি না এ নিয়ে বিরোধ।

কিন্তু উক্ত আয়াতের তাফসিরে রাসূল সা-এর হাদিসটি সিফাত হওয়াই সুবিদিত হয়ে পড়ে এবং প্রথম পক্ষের মত শক্তিশালী প্রতীয়মান হয়। সুতরাং যারা হাদিসকে সামনে রেখে তাফসির করেছেন, তারা আয়াতের সাক-কে সিফাত মেনেছেন। আর যারা স্রেফ শাব্দিক দিক ও বর্ণনাপ্রসঙ্গ বিবেচনা করেছেন, তারা ভয়াবহতা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ, আরবি ভাষায় ভয়াবহ অবস্থা বুঝাতে সাক শব্দের ব্যবহার বেশ প্রসিদ্ধ।

যেমন বলা হয়- قامت الحرب على ساق.

এটি আরবদের একটি বাক্যপ্রবাদ (idiom)।

এর আক্ষরিক অর্থ = “যুদ্ধ একটি নলার উপর দাঁড়িয়ে গেছে।”

কিন্তু এর রূপক অর্থ হচ্ছে = “যুদ্ধ চরম ভয়াবহ, তীব্র ও উত্তাল অবস্থায় পৌঁছেছে।”

★ দ্বিতীয়ত – ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এ তাফসিরের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। আর যদি তা বিশুদ্ধ মেনেও নেয়া হয়, তবুও তাঁর তাফসিরকে কোনোভাবেই সিফাতের তাওয়িল বলা যায় না। কেননা তারা তো আয়াতকে সিফাতের অন্তর্ভুক্তই মনে করেন নি।

আরেকটি বিষয় সর্বশেষ লক্ষ্যনীয়, উক্ত আয়াত নিয়ে সালাফের মতবিরোধ হলেও ইবনে আব্বাস বা অন্য কোনো সালাফ সাক (নলা) আল্লাহ’র সিফাত হওয়াকে কিন্তু অস্বীকার করেন নি। এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। কারণ, তা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তাদের রীতিই ছিল কোরআন ও হাদিসে আল্লাহ’র সিফাত যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই মেনে নেয়া- কোনো তাওয়িল, অপব্যাখ্যা বা উপমা নির্ধারণ না করে। কিন্তু আশ’আরি বা মাতুরিদিরা আল্লাহ’র প্রতিটি গুণের যেসব মনগড়া উসুল-মূলনীতি ও তাওয়িল-ব্যাখ্যা দাঁড় করান, তা আল্লাহ’র গুণাবলি অস্বীকারের নামান্তর।

আরবীতে মোশতারাক (مشترك) শব্দটি এমন শব্দকে বোঝায় যার একাধিক অর্থ থাকে। ساق একটি মোশতারাক শব্দ।

🚩 আশআরি এবং মাতুরিদি সম্পর্কে বিস্তারিত আসছে সামনে। যেহেতু সিফাত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাই তাদের কিছু ভ্রান্তি এখানে উল্লেখ করে ফেললাম।

💌 প্রিয় পাঠক, আপনি যে ধৈর্যসহকারে এক এক করে ৯ম পর্বে এসে পড়েছেন। এবং উলিহিয়াত, রুবুবিয়্যাত, আসমাউল সীফাত সম্পর্কে আপনার জানা হয়ে গেছে(যদি না আগে জেনে থাকতেন) মাশাআল্লাহ। এগুলাই আক্বীদাহ এর মূল ভিত্তি এবং আক্বীদাহ-এর প্রায় অর্ধেক আপনার পরিষ্কার হয়ে গেছে। আশা করি কঠিন কিছু মনে হয়নি। যদিও আমি আমার সিরিজগুলো আরো সহজ, বাস্তবমূখী এবং দলিল ভিত্তিক করার জন্য সামনে আরো কাজ করে যাবো ইনশাল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *