মু‘তাযিলাহ শব্দটি এসেছে আরবিতে “ই‘তিজাল” যার অর্থ “আলাদা হয়ে যাওয়া” বা “বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া” (Isolationists)। এবং এর একটা মজার ঘটনা আছে। তবে তার আগে বলে নেই, এই দলের প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলো ওয়াসিল ইবন আতা (মৃত্যু ১৩১ হিজরি) এবং আমর ইবন উবাইদ (মৃত্যু ১৪৪ হিজরি)। এদের “মু‘তাযিলা” বলা হয় কারণ ওয়াসিল ইবন আতা, আল-হাসান আল-বাসরীর (মৃত্যু ১১০ হিজরি) হালকা ও পাঠচক্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, যদিও তিনি আগে তাঁর নিয়মিত ছাত্র ছিলেন।
ঘটনাঃ একদিন আল-হাসান আল-বাসরীর-এর মজলিসে একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি কোন মুসলমান কবিরা গুনাহ করে সে কি মুসলিম থাকবে না অমুসলিম হয়ে যাবে? আল-হাসান আল-বাসরী উত্তর দেন তিনি মুনাফেক। কিন্তু তার শিষ্য ওয়াসিল বিন আতা বলেন যে তিনি মুসলিমও নয় অমুসলিমও নয়, তার স্থান এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে। আল-হাসান আল-বাসরী এ মত প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে ওয়াসিল বিন আতা ইমামের দল পরিত্যাগ করে মসজিদের এক পাশে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। কিছু লোক ওয়াসিল বিন আতার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। আল-হাসান আল-বাসরী বলেন ‘ইতাজিলা আন্না’ (সে আমাদের ত্যাগ করেছে)। এখান থেকেই ওয়াসিল বিন আতার সম্প্রদায় মুতাজিলা নামে পরিচিতি পায়। শীঘ্রই ওয়াসিলের দলে কিছু নতুন লোক জুটে যায়, যারা মূলত গ্রিক সহ অন্যান্য দর্শনের আলোকে ইসলাম ধর্মকে মূল্যায়ন করতো। পরবর্তী ওয়াসিল না থাকলেও এই দার্শনিকরাই মুতাজিলাকে সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে একটি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মু‘তাযিলাদের হাতে যে বিদআতগুলো একত্রিত হয়েছিলঃ
১/ খারিজিদের বিদআত (বড় গুনাহকারদের তাকফির করা এবং শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা),
২/ কাদারিয়্যাহদের বিদআত,
৩/ জাহমিয়্যাহদের বিদআত (আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কিত ভুল আকীদা)।
জাহমিয়্যাহরা আল্লাহর নাম, গুণাবলি এবং কর্ম — সবকিছুই অস্বীকার করেছিল। কিন্তু মু‘তাযিলারা বাহ্যিকভাবে আল্লাহর কিছু নাম স্বীকার করলেও তারা আল্লাহর কোনো সিফাত (গুণ) বা ইচ্ছার সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনো কর্ম (আফ‘আল) স্বীকার করত না। তাদের পরবর্তী নেতারা, যেমন আবুল হুযায়ল আল-আল্লাফ (মৃত্যু ২৩৫ হিজরি), জাহম ইবন সাফওয়ানের তৈরি করা তথাকথিত যুক্তিগুলো আরও বিকশিত করেন এবং এতে গ্রিক ও ভারতীয়দের দর্শনের বিভিন্ন উপাদান সংযুক্ত করেন — যেমন পরমাণুবাদ (al-jawhar al-fard)।
এই যুক্তি কালামবিদদের এমন সুযোগ দেয় যে, তারা কোনো নাযিলকৃত (ওহি) প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট প্রমাণ করতে চায়, এবং সেখান থেকে একজন স্রষ্টা আছে, এরপর নবুওয়াত এবং পুনরুত্থানের সম্ভাবনা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে। কারণ সেই সময়ের নাস্তিক দার্শনিকরা ওহি বা নবুওয়াতকে মানত না, তাই কালামবিদরা তাদের নিজেদের ভাষা, পরিভাষা ও শ্রেণিবিন্যাস ব্যবহার করে যুক্তি দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের পদ্ধতির প্রভাবে।
কিন্তু তাদের এই যুক্তি ছিল একেবারেই ভ্রান্ত। যা বাস্তবে তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত ফল তৈরী করেছিল। এবং এই ভুল যুক্তিগুলো বাঁচিয়ে রাখতে এবং দার্শনিকদের সামনে টিকিয়ে রাখতে তারা যে সকল কাজ করতে বাধ্য হয়ঃ
১. কুরআনের আয়াত এবং মুতাওয়াতির হাদীস, যেগুলো সরাসরি অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না, সেগুলো রূপক অর্থ (তাওয়ীল) করত। এ তাওয়ীলের উদ্ভাবক ছিল জাহমিয়্যাহ ও মু‘তাযিলা।
🚩 বিগত পর্বে জাহমিয়ারা কিভাবে তাওয়ীল করে সেটার কিছু উদাহরণ আপনারা দেখেছেন। আজ ২০২৫ সালেও অনেক দল তাওয়ীল করে বেড়ায়। যা সামনের পর্বে আরো বিস্তারিত আসছে ইনশাল্লাহ।
২. অন্যান্য সমস্ত দলিল, বিশেষ করে আহাদ হাদীস(যা সুন্নাহর অধিকাংশ)—এসবকে সরাসরি অস্বীকার করত, এবং দাবি করত যে এগুলো “অনুমাননির্ভর জ্ঞান” এবং আকীদার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়।
মু‘তাযিলারা “বুদ্ধিকে” ওয়াহির উপরে স্থান দেয়ার ধারণা প্রবর্তন করে এবং এটিকে তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারা “হাশাওয়িয়্যাহ” (নির্বুদ্ধি, মূল্যহীন) নামে একটি নিন্দাসূচক পরিভাষা উদ্ভাবন করে—যার মাধ্যমে তারা আহলুস সুন্নাহকে হেয় করতে চাইত—যারা সুন্নাহর উপর দৃঢ়ভাবে অটল ছিল এবং নববী হেদায়াতকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল।
মু‘তাযিলাদের পরবর্তী নেতারা—
তাদের শেষদিকের নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিশর আল-মারিসী (মৃত্যু ২১৮ হিজরি) এবং ইবন আবী দু‘আদ (মৃত্যু ২৪০ হিজরি)। তারা শাসকদেরকে উত্তেজিত করে মিহনা (Inquisition / পরীক্ষা ও নির্যাতন অভিযান) শুরু করে, যা ছিলো এমন একটি ভয়ংকর ঘটনা যেখানে জাহমিয়া + মু‘তাযিলা + রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মিলিত হয়ে আহলুস সুন্নাহর আলেমদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালায়। বিশেষ করে “কুরআন সৃষ্টি” মতবাদে ইমাম আহমাদ ইবন হানবল (মৃত্যু ২৪১ হিজরি) কঠোর নির্যাতনের স্বীকার হয়।
পরমাণুবাদ (al-jawhar al-fard)
“জাওহর / Atom” — এটি প্রাচীন দার্শনিক শব্দ। এর মূল ধারণা হচ্ছে, এটি এমন এক বিন্দু/কণা যা আর ভাগ করা যায়না। এই অভাগযোগ্য একটি বিন্দুর কোন রং নেই, আকার নেই, ওজন নেই, শুধু “অস্তিত্বের স্থান” নেয়। পরে এর গুণ (রঙ, স্বাদ, তাপ, নড়াচড়া, ইত্যাদি) আল্লাহ সৃষ্টি করেন। তবে প্রতি মুহূর্তে এই গুণ নষ্ট হয় এবং নতুন গুণ সৃষ্টি হয় (occasionalism-এর একটি ধরণ)।
“দুনিয়া হচ্ছে এরূপ ছোট ছোট কণায় তৈরি” — এই ধারণাটি হাজার বছর আগের। কিন্তু তখন এটম বলতে যা বুঝত, সেটা ছিল সম্পূর্ণ দার্শনিক ধারণা। পরীক্ষাগার / বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি নয়। মু‘তাযিলারা ঠিক এটাই বলত — “এই দুনিয়ার সবকিছু অতি ছোট ছোট কণা দিয়ে তৈরি। এত ছোট যে আর ভাগ করা যায় না।” এই ছোট কণাকে তারা বলত জাওহার (একটি atom)। তাদের মতে এই কণা নিজে রংহীন, স্বাদহীন, আকারহীন। কণা শুধু ফাঁকা জায়গা নেয় — এর কোনো গুণ নেই। গুণ (আরাদ) পরে আল্লাহ প্রদান করেন।
এরপর এদের মূল যুক্তি যদি আমি সংক্ষেপে ১ লাইনে বলি, তাহলে বিষয়টা হচ্ছে এমন — কণা (jawhar)-এর মধ্যে যেমন “গুণ” (রঙ/স্বাদ/আকার) আলাদা কিছু হিসেবে থাকতে পারে না, ঠিক তেমনি আল্লাহর সত্তার ভিতরে “গুণ” আলাদা বাস্তব কোন জিনিস হতে পারে না। এটা হচ্ছে আল্লাহর গুণ অস্বীকারের জন্য প্রথম যুক্তি। এরকম প্রাসঙ্গিক আরো অনেক যুক্তি আছে। যেমনঃ
আল্লাহর সকল সৃষ্টি = “কণা (jawhar) + গুণ (‘arad)” মিলে তৈরি। আর গুণ হলো আলাদা, সাময়িক, অস্থায়ী কিছু। যা বারবার সৃষ্টি ও নষ্ট হয়। যদি আল্লাহর মধ্যেও গুণ বা আলাদা কোন জিনিস থাকে তাহলে ত আল্লাহর মধ্যে অনেকগুলো অংশ বা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস থাকা (Composition) বুঝাবে। এটা তো তাওহীদ (একত্ব) বিরুধী হয়ে যায়।
তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল, আল্লাহর গুণ বাস্তব অস্তিত্ব নয়। জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছা ইত্যাদি আলাদা গুণ নয়। বরং ঋণাত্মক বর্ণনা। যেমনঃ আল্লাহ “অজ্ঞ নন” = অর্থ হচ্ছে জ্ঞান আছে আল্লাহ “শক্তিহীন নন” = মানে শক্তিশালী ইত্যাদি। কিন্তু “জ্ঞান”, “শক্তি” ইত্যাদি নামে কোন বাস্তব গুণ নেই। অর্থাৎ “আল্লাহর আলাদা গুণ আছে” — এটা তারা মানত না।
🚩 আশা করি বিগত ৬ষ্ঠ(জাহমিয়া মতবাদ) পর্বের “নেগেটিভ অ্যাট্রিবিউটস (সালবিয়্যাহ সিফাত)” এবং “হুদূথ আল-আজসাম”-এর বিষয়টা আরো ভালো ভাবে সংযোগ করতে পেরেছেন। যদিও ধারণা গুলো ভিন্ন, তবে এখানে পরমাণুবাদ → হুদূথ আল-আজসাম প্রমাণ করতে সাহায্য করে।
এই এক পরমাণুবাদ থেকে এরা আরো অনেক কিছুর ওপর যুক্তি আরোপ করেছিলো। যেমনঃ
মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা প্রমাণ করতে, এরা যুক্তি দেখালো, কণা বদলায়, গুণ বদলায়, কাজ বদলায়.. তাহলে, “মানুষ নিজের কাজ নিজেই করে। আল্লাহ কাজ সৃষ্টি করেন না।” অর্থাৎ এখানে কদর (তাকদীর)-এর বড় অংশ অস্বীকার করা হচ্ছে। ঠিক যেমন কাদরিয়্যাহ-রা করেছিলো। 🚩 বিস্তারিত পর্ব ৪) উমাইয়া যুগের ফিরকাসমূহ
মু‘তাযিলাদের এই “পরমাণুবাদ” ছিল দার্শনিক যুক্তি দিয়ে আল্লাহর গুণ অস্বীকার করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল। আহলুস সুন্নাহ এটাকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলেছে কারণঃ
- তাদের যুক্তি কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে
- আল্লাহর গুণ অস্বীকার
- তাকদীর অস্বীকার
- দর্শনকে ওহির উপরে দাঁড় করানো
Leave a Reply