উমাইয়া যুগের শেষভাগে মুসলমানরা যখন ব্যাপকভাবে বিজয়যাত্রা শুরু করলো, তখন তারা শুধু ভূমি বা সম্পদই অর্জন করেনি, বরং নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির জ্ঞানভাণ্ডারের সাথেও পরিচিত হলো। যেমন, মুসলমানরা যখন সিরিয়া, ইরাক, মিশর, পারস্য দখল করল, তখন সেখানে গ্রিক দর্শনের বই ও অনুবাদ পাওয়া গেল। এরপর গ্রিক দর্শন — যেমন, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল; এদের মত দার্শনিকদের চিন্তাধারা ধীরে ধীরে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মাঝে প্রবেশ করতে থাকে।

সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল এরা ছিলো মূলত যুক্তিবাদী। এরা মানুষকে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। যুক্তি দিয়ে এরা সত্যকে বের করার চেষ্টা করে। যেমন, কোন যুক্তিবাদী কোন মুসলিমকে চ্যালেঞ্জ দিতে পারে এইভাবে — “তোমাদের কিতাব কেন সত্য? যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করো”। আর ঐ মুসলিম তর্ক-বিতর্কের একটা পর্যায়ে এটা উপলব্ধি করবে যে, দার্শনিকদের দর্শনের ভাষায় উত্তর না দিলে ওরা মানবেনা। এভাবে তৎকালীন মুসলমানরা সরাসরি গ্রিক দর্শন গ্রহণ না করলেও তাদের কৌশল অবলম্বন করা শুরু করেছে।

গ্রিকদের যুক্তি-তর্ক (logic) নিয়ে ইসলামি বিশ্বাসকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে কেও ইসলামের কোন অংশকে বাড়াবাড়ি করলো, কেও আবার ইসলামের মূল ভিত্তিগুলো ছেড়ে দিলো, কেওবা বিদআত দিয়ে বিদআত খণ্ডন করতে গেল এবং বুদ্ধিকে কোরআন-সুন্নাহের ওপরে প্রাধান্য দিলো। এইভাবেই একটার পর একটা বিদআত উদ্ভব হতে লাগলো। বিদআত উদ্ভবের এই প্রক্রিয়া গুলো কিন্তু আজও চলমান যা ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজের শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকলে পাঠক খুব সহজে বুঝতে পারবেন ইনশাল্লাহ।

জা‘দ বিন দিরহাম (মৃত্যু: ১২৪ হিজরি, ৭৪২ খ্রি.)

জা‘দ বিন দিরহাম (মৃত্যু ১২৪ হিজরি) ছিলেন প্রথম ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে একজন যিনি ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে বিতর্ক চালাতে শুরু করে। সে ছিলো মূলত ইহুদি, সাবিয়ান (Sabian) এবং গ্রীক দর্শনের (যেমন নেগেটিভ অ্যাট্রিবিউটস বা সালবিয়্যাহ সিফাত) দ্বারা প্রভাবিত। একবার ভারতীয় বস্তুবাদী দার্শনিকদের (সুমানিয়্যাহ) সাথে তর্কের সময় সে প্রথমে “হুদূথ আল-আজসাম” নামক যুক্তিবাদী প্রমাণ তৈরি করে, যা পরবর্তী মুতাকাল্লিমূনেরা তাদের ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।

হুদূথ আল-আজসাম (প্রায় ১০০-১২৮ হিজরি, ৭১৮-৭৪৫ খ্রি.) –

“হুদূথ” মানে সৃষ্টি বা উৎপত্তি, অর্থাৎ কিছু যা অস্তিত্বে আসে এবং তার আগে অস্তিত্বহীন ছিল। আর “আজসাম” মানে শরীর বা বস্তু, যা মহাবিশ্বের দৃশ্যমান উপাদান (যেমন গ্রহ, তারা, পৃথিবী) বোঝায়। এই তত্ত্বে মহাবিশ্বকে “বস্তু” (অর্থাৎ সৃষ্ট জিনিস) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোটকথা হুদূথ আল-আজসাম মানে “মহাবিশ্বের বস্তুগুলোর সৃষ্টি” বা “মহাবিশ্বের সৃষ্টির প্রমাণ”। এটি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে মহাবিশ্ব সৃষ্ট এবং তাই একজন স্রষ্টা আছেন।

কিন্তু আহলে সুন্নাহর স্কলাররা (যেমন ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল) এই তত্ত্বকে বিদ‘আতী বলে সমালোচনা করেন। কারন, এটি কুরআন-হাদিসের পরিবর্তে গ্রীক-ভারতীয় দর্শনের উপর নির্ভর করে, যা বিদ‘আত। কুরআনে স্রষ্টার অস্তিত্ব স্পষ্ট (সূরা আত-তুর: ৩৫-৩৬), তাই যুক্তির প্রয়োজন নেই। এছাড়াও তারা হাদিসকে (যা সুন্নাহর প্রধান অংশ) “সম্ভাব্য জ্ঞান” বলে অস্বীকার করতেন, যা আকীদার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য। বরং এই তত্ত্ব মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রমাণের বদলে নাস্তিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, কারণ এটি যুক্তিতে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। নাস্তিকরা এর দুর্বলতা ব্যবহার করে তাওহীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করত।

এই তত্ত্বটি গ্রীক (বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের লজিক) এবং ভারতীয় দর্শনের (যেমন অ্যাটমিজম বা আল-জাওহার আল-ফার্দ) প্রভাবে গড়ে ওঠে এবং জাহম বিন সাফওয়ান (মৃত্যু: ১২৮ হিজরি) এবং পরবর্তীতে মু‘তাযিলাহর নেতা আবু আল-হুদায়ল আল-আল্লাফ (মৃত্যু: ২৩৫ হিজরি) এটিকে পরিমার্জিত করেন।

কুরআন সৃষ্ট বলার দাবি –

জাদ বিন দিরহাম প্রথম মুসলিম যে আল্লাহর কালাম (speech) অস্বীকার করে। এর স্বপক্ষে কিছু দলিল নিচে দেওয়া হলোঃ

  • শরহ উসূল ই’তেকাদ আহলিস সুন্নাহ ২/৩৮২
  • আল–বিদায়াহ ওয়ান–নিহায়াহ ৯/৩৫
  • ফাতাওয়া ইবন তাইমিয়্যাহ ১২/২৬
  • আল–ওয়াসায়িল ফি মা’রিফাতিল আওয়াইল ১২১

জাদ বিন দিরহাম বলে, “আল্লাহ কথা বলেন না, তাই কুরআন সৃষ্ট (created)”। তার যুক্তি ছিলো, কথা বলা একটি ঘটনা (event), যা শুধু সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এখানে একটা বিষয় বুঝা খুবই জরুরি সেটা হচ্ছে, কোরআনের কোন আয়াতকে আক্ষরিক অর্থ না নিয়ে সরল, বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে, ঘুরিয়ে ব্যাখ্যা করাকে বলা হয় তা‘উইল (تأويل)। যেমন জাহ বিন দিরহাম এখানে প্রথমে যুক্তি দিলো কথা বলা তো সৃষ্টির কাজ, স্রষ্টার কাজ নয়। তাই কোরআনে যে বলা আছে,

“وَكَلَّمَ اللّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا” (আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছেন) – [সুরা আন-নিসা 4:164]

এখানে “কল্লাম” (كَلَّمَ) শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে “কথা বলা” কিন্তু জা‘দ বলল এর মানে “ইঙ্গিত দেওয়া” বা “বার্তা পাঠানো”। এই যে এখানে শব্দের অর্থ ঘুরিয়ে দেওয়া বা তা‘উইল করা, এর ফলে কোরআনের আরো যত আয়াতে “কল্লাম” (كَلَّمَ) শব্দটি আছে সেগুলোর অর্থও কিন্তু পরিবর্তন এবং অস্পষ্ট হয়ে যায়। কোন আয়াতেরই সঠিক অর্থ বের হয়না। এবং তা‘উইল করার পরে সবচেয়ে ভয়ংকর যে কাজটা হয়ে সেটা হচ্ছে কোরআনের সু-স্পষ্ট আয়াত কিংবা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করা। ঠিক যেমন জা‘দ শেষ পর্যন্ত বলল, “আল্লাহ কথা বলেন না”। আর এই অস্বীকার করা, এটাকে বলা হয় তা‘তীল (تعطيل)। “তা‘তীল” মানে, আল্লাহর কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে একেবারেই অস্বীকার করে দেওয়া।

🚩 পরবর্তীতে বাংলাদেশের কিছু তা‘উইল এবং তা‘তীল করা গোষ্টি নিয়ে আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ। এই পর্বে এই ব্যাপারে আপাতত এতটূকু রাখলাম।

সহীহ ‘আকীদার বইগুলোতে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় যে, কুরআন সৃষ্টি, এই বিশ্বাসের কথা সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) যুগে কেউ বলেনি, এমনকি এ ধরনের কোনও বিভ্রান্তির অস্তিত্বও ছিল না। সাহাবারা আল্লাহর সব সিফাত (বৈশিষ্ট্য), যেমনঃ তাঁর কথা বলা, শোনা, দেখা ইত্যাদি যেমনভাবে কুরআন ও সুন্নাহে এসেছে তেমনভাবে ঈমান রাখতেন। তারা এ ব্যাপারে কখনও ভিন্নমত হননি।

ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেনঃ “সাহাবারা ইসলামের কোনও মূল নীতিতে দ্বীমত করেননি। না আল্লাহর সিফাতে, না তাকদীরে, না তাকফীরে, না শাসনব্যবস্থায়। তাঁরা আল্লাহর সিফাতকে তাঁর জন্য প্রমাণ করতেন এবং সৃষ্টি থেকে আল্লাহর তুলনা-সাদৃশ্য অস্বীকার করতেন।” (মিনহাজুস সুন্নাহ ৬/৩৩৬)

মূলধারার ইসলামি স্কলার(আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত) বলেন, আল্লাহ কথা বলেন এটা কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রমানিত। কিন্তু আল্লাহর কথা বলা, আর কোন সৃষ্টির কথা বলা এক নয়। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন,

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ “তাঁর মত কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা 42:11)

আল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। আল্লাহ কিভাবে কথা বলেন? এর ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন না। কারন এটা বুঝা কোন সৃষ্টির পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু কোরআনে যা বলা আছে তা বিশ্বাস করতে হবে। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে,

“তারা বলল: আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম।” সুরা আল-বাকারা (2:285)

জাদ এরপরে আরও বললো, – “আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে খলিল (বন্ধু) গ্রহণ করেননি এবং মূসা (আ.)-এর সাথে সরাসরি কথা বলেননি”। এই দাবি উমাইয়া যুগের শেষে (১২০-১২৪ হিজরি) সিরিয়ায় প্রচারিত হয়।

খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিক (শাসনকাল: ১০৫-১২৫ হিজরি) এর আমল খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাসরী তাকে কাফির ঘোষণা করে ১২৪ হিজরিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।

জাহম বিন সাফওয়ান (মৃত্যু ১২৮ হিজরি)

এই সিরিজের মূল আলোচনায় আসলাম মাত্র। অর্থাৎ জাহমিয়া মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা জাহম বিন সাফওয়ানকে নিয়ে আলোচনা করবো এখন। জাদ বিন দিরহাম জাহমিয়া মতবাদের ভিত্তি তৈরি করে যায়। আর এই জাহম বিন সাফওয়ান ছিলো জা‘দ বিন দিরহামের ছাত্র এবং পরবর্তীতে জা’দ এর ভিত্তি অনুসারে নতুন মতবাদ তৈরি করে। আর এই মতবাদ তার নাম অনুসারে জাহমিয়া মতবাদ হিসেবে প্রচার পায়।

বসরা (বর্তমান ইরাকের একটি শহর) ইতিহাসে “ফারযুল হিন্দ” নামে পরিচিত ছিল। এটিকে ভারতবর্ষ ও পারস্যের দিকে যাওয়ার অন্যতম প্রবেশপথ হিসেবে দেখা হত। বসরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী ছিল যেখানে ভারত ও পারস্য থেকে আগত ব্যবসায়ী, ভিক্ষু, এবং প্রচারকরা আসত। এই ভিক্ষুরা তাদের নিজস্ব দর্শন ও ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করত। সাধারণ মানুষ তাদের চমকপ্রদ কর্মকাণ্ড দেখে মুগ্ধ হত এবং অনেক সময় তাদের চিন্তাধারা গ্রহণ করত। ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু ইয়া’মার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাসরাহ্‌তে সর্বপ্রথম তাক্বদীর সম্বন্ধে বিতর্ক সৃষ্টি করে মা’বাদ আল্‌-জুহানী… এই হাদিসটি এখানে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করলাম। পাঠককে অনুরোধ করবো পুরো হাদিসটি পড়ে নেওয়ার..

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬৯৫ হাদিসের মান: সহিহ হাদিস।

এই বসরা অঞ্চলের কথা মনে রাখার চেষ্টা করবেন।

🚩 কারন এই বসরা থেকে সুফিবাদের জঘন্যতম সব আক্বীদাহের উৎপত্তি যা আলাদা একটা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।

এই ব্যাপারে আলেমগন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি বিখ্যাত হাদিস কোট করেন যেখানে তিনি পূর্ব দিক থেকে ফিতনার উত্থানের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেনঃ

“ফিতনা পূর্ব দিক থেকে আসবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৫৩) মক্কা এবং মদিনা থেকে পূর্ব দিক বলতে ইরাক (কুফা, বাসরা) এবং খুরাসান (তুরকিস্তান, সামারকান্দ) কে বোঝানো হয়। যেখানে রাজনৈতিক বিদ্রোহ (যেমন আল-হারিস ইবন সুরাইজের বিদ্রোহ), ধর্মীয় ফিতনা (খারিজী, শিয়া, মু‘তাযিলাহ) এবং বিদ‘আতী মতবাদ (জাহমিয়্যাহ) উদ্ভূত হয়েছে।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এর গ্রন্থ ‘আর-রাদ্দু আলা জাহমিয়্য্যাহ’ এবং ইমাম বুখারি এর গ্রন্থ “খালক আফ’আল ইল-ইবাদ” -এর বর্ণনা অনুযায়ী, জাহম ইবনে সাফওয়ান পূর্বে “সুমানিয়্যাহ” (প্রাচীন আরবিতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী) গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। ঐ বিতর্কে তারা জাহমকে প্রশ্ন করে – “আপনি আপনার ইলাহকে দেখেছেন কি?” – জাহম বলেন না। শুনেছেন? গন্ধ পেয়েছেন? স্পর্শ করেছেন? – প্রত্যেক উত্তরে জাহম ‘না’ বলে। তখন তাঁরা বলেন, “যদি আপনি ঈশ্বরকে কোনো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে না চেনে থাকেন, তাহলে আপনার বিশ্বাসের ভিত্তি কী?”। এই লজিকাল আক্রমণে জাহম তৎক্ষণাৎ বিভ্রান্ত হয় এবং পরবর্তীতে ৪০ দিন ধরে জানতো না যে সে কাকে উপাসনা করছে। কিছু রেফারেন্সে এসেছে সে ৪০ দিন নামাজই ত্যাগ করে দিয়েছিলো।

ইমাম বুখারি “খালক আফ’আল ইল-ইবাদ” (পৃষ্ঠা ৯) এ বলেছেনঃ

দামুরাহ বলেন, ইবনে শওদাব থেকে বর্ণিত, জাহম চার দশক (৪০ দিন) নামাজ ত্যাগ করেছিলেন সন্দেহের কারণে। তিনি কিছু সুমানিয়্যাহর সঙ্গে বিতর্ক করেছিলেন, সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ৪০ দিন নামাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এরপর জাহম এই পরাজয় কাটিয়ে উঠার জন্য একটি নতুন যুক্তি প্রবর্তন করে, যা খ্রিস্টানদের ভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের (heretics of the Christians) মতোই ছিল। তারা বলতো যে, ঈসা নবীর মধ্যে যে আত্মা রয়েছে, তা আল্লাহর আত্মা, আল্লাহর সত্তা থেকে। যখন আল্লাহ কোনো কাজ করাতে চান, তিনি সেই সৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করেন এবং সেই সৃষ্টির জিহ্বার মাধ্যমে কথা বলেন। এভাবেই তিনি যা ইচ্ছা আদেশ দেন এবং যা ইচ্ছা নিষেধ করেন। কিন্তু সেই আত্মা সাধারণ মানুষের চোখের দৃশ্য থেকে অদৃশ্য থাকে। এক কথায়, তাদের বিশ্বাস হলো God inside creation বা hulool (حلول) – অর্থাৎ আল্লাহ সৃষ্টির ভেতরে প্রবেশ করেন। এই ‘হুলুল’ পরিভাষাটি মনে রাখবেন। এটা হচ্ছে সুফিবাদের একটা চূড়ান্ত পর্যায়। 🚩 সুফিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলাদা পর্ব আসছে ইনশাল্লাহ।

এই ২টা বিষয় একটু ক্লিয়ার করে নেই,

১/ রূহ হলো আল্লাহর একটি সৃষ্টি। আল্লাহ কুরআনে বলেন: “তারপর তিনি (আদমকে) সম্পূর্ণ করলেন এবং তাতে তাঁর রূহ থেকে ফুঁকলেন।” (সূরা আস-সাজদাহ 32:9)

এখানে “من روحه” মানে “তাঁর সৃষ্টি করা রূহ”, আল্লাহর সত্তা নয়। যেমন আমরা বলি “এটা আল্লাহর ঘর (বায়তুল্লাহ)” -এর মানে ঘরটা আল্লাহর সত্তার অংশ নয়, বরং তাঁর সম্মানিত ঘর।

২/ আল্লাহ সৃষ্টির ভেতরে প্রবেশ করেন না। আল্লাহ আকাশের ওপর আরশে প্রতিষ্ঠিত (সূরা ত্ব-হা 20:5), তিনি সৃষ্টির থেকে আলাদা। “তাঁর মতো কিছুই নেই।” (সূরা আশ-শূরা 42:11)

যদি বলা হয় আল্লাহ কোনো মানুষের ভেতরে ঢুকলেন, তাহলে সেটা হবে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির মিশ্রণ (pantheism), যা সরাসরি শিরক।

আর-রাদ্দু আলা জাহমিয়্য্যাহ গ্রন্থে ইমাম আহমদ আরো বলেন,

❝জাহম ইবনে সাফওয়ান ছিলো অত্যন্ত বিতর্কপ্রিয় এবং ক্যালাম/ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিতর্কে পারদর্শী, এবং তার যুক্তির অধিকাংশই আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কিত ছিল। এবং এভাবেই জাহম তার জাহমিয়্যাহ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে। এবং যখন মানুষ তাদেরকে জিজ্ঞেস করত সূরা আশ-শূরা ৪২:১১-এর আয়াত “তাঁর সদৃশ কিছু নেই” এর ব্যাখ্যা (তাফসীর) সম্পর্কে, তারা বলত,

“‘তাঁর সদৃশ কিছু নেই’ মানে—কোনো বস্তু বা সৃষ্টির সঙ্গে তিনি সদৃশ নয়। তিনি সাতটি পৃথিবীর নিচে যেমন আছেন, তেমনি আসমানী সিংহাসনের উপরে। কোনো স্থানও তাঁকে বাদ দেয় না, এবং তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন। তিনি কখনো কথা বলেননি এবং কথা বলবেন না। তিনি পৃথিবীতে কাউকে দেখেননি, এবং পরকালে দেখবেন না। তিনি কোনো বর্ণনা দ্বারা বর্ণিত নন। কোনো গুণ বা কাজ দ্বারা জানা যায় না। তাঁর কোনো সীমা বা শেষ নেই। বুদ্ধি দিয়ে তাঁকে ধারণ করা যায় না। তিনি সমস্ত অস্তিত্বের মুখ। তিনি সমস্ত জ্ঞানের জ্ঞান। তিনি সমস্ত শ্রবণের শ্রবণ। তিনি সমস্ত দর্শনের দর্শন। তিনি সমস্ত জগতের আলো। তিনি সমস্ত শক্তি। তিনি দুটি বস্তু নন। তিনি দুটি ভিন্ন বর্ণনা দ্বারা বর্ণিত নন। তাঁর “উচ্চতম” বা “নিম্নতম” নেই, কোনো দিক বা পার্শ্ব নেই, না বাম বা ডান, তিনি হালকা বা ভারী নন। কোনো রঙ নেই, কোনো শরীর নেই, এবং তিনি মাহলূম(মানে, আল্লাহকে এমনভাবে জানা যায় না যেভাবে আমরা দুনিয়ার কোনো বস্তু বা মানুষকে জানি) নন, তিনি মাকুল(মানে, মানুষের বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে পুরোপুরি ধরা যায় না) নন। এবং আপনার হৃদয়ে যা কিছু ‘বস্তু’ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তার সঙ্গে তিনি ভিন্ন।”

ইমাম আহমদ বলেন,

এগুলো সবই নিষ্কারকরণ (salb) এবং সিফাত সাল্বিয়্যাহ (নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য)। জাহম আল্লাহকে শুধুমাত্র নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য দিয়ে বর্ণনা করেছে। এবং এই সব কিছু ঘটেছে তার সুমানিয়্যাহদের সঙ্গে বিতর্কের কারণে এবং সাবেইয়ান দার্শনিকদের থেকে ধারনা নেওয়ার কারনে।

আগেই বলেছিলাম জাহম ছিলো জা’দ-এর ছাত্র। আর জা’দ ছিলো এই সাবিয়ান দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। এছাড়াও জাহম তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ (intellectual proof) অটুট রাখতে চেয়েছিলো যা তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

এখানে সবিয়্যাহ (Sābi’ūn) সম্প্রদায় নিয়ে একটু পরিষ্কার করে নেই। এরা ছিলো চ্যালডিয়ানদের অবশিষ্টাংশ, যারা আল্লাহকে কেবল সিফাত সাল্বিয়্যাহ (নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য) দিয়ে বর্ণনা করতো। “সাল্বিয়্যাহ” মানে নেতিবাচক, অর্থাৎ যা নেই তা বলেই আল্লাহকে বর্ণনা করা। যেমন: আল্লাহর শরীর নেই, রং নেই, আল্লাহ কোনো জায়গায় সীমাবদ্ধ নন, আল্লাহর ডান-বাম নেই, ইত্যাদি। অর্থাৎ, তাঁরা আল্লাহকে বোঝাতে কেবল অস্বীকৃতির ভাষা ব্যবহার করত। কি নেই শুধু তা বলত; কিন্তু কি আছে, সেটা বলত না।

জাহমের কু-কির্তি এই পর্বেই শেষ নয়। জাহমের অনেক মতবাদ এখনো অনেক মুসলিমদের মাঝে বিদ্যমান। কেও দ্বিতীয় পর্যায়ের জাহমী কেওবা তৃতীয় পর্যায়ের। অর্থাৎ তার পরবর্তীতে অনেক মুসলিম ১ম পর্যায়ের জাহমীদের(মূল জাহমী) থেকে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করে মূল জাহমীদের থেকে একটু ভিন্ন রুপে অবস্থান করেছে বা এখনো করছে।

জাহমের এই সমস্ত মতবাদের কারণে, জাহমের মৃত্যুর পর মুসলিম স্কলার ও ইমামরা তাকে কাফির ঘোষণা করেন। তাকে ১২৮ হিজরিতে খুরাসানের আমীর সালাম আল-আহওয়াজ মৃত্যুদণ্ড দেন। ইসলামের ইতিহাসে সহীহ আকীদার ওপর জাহমিয়াদের মত এত বড় আঘাত আর কেউ করেনি।

জাহমের মৃত্যুর পরে, জাহমের অনুসারীরা তার মতবাদ বিশর আল–মারীসীর(মৃত্যু: ২১৮ হিজরি) কাছে পৌঁছে দেয়। সে জাহমিয়াহর নেতা ছিলো এবং কালাম (ইলমুল কালাম) চর্চা করত। তারও এই ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল— “কুরআন সৃষ্টি।” উলামারা তাকে এ ধরনের কথার কারণে কঠোরভাবে ভ্রষ্ট ঘোষণা করেন।

বিশর আল–মারীসীর জীবনী দেখুনঃ

  • তারীখ বাগদাদ — আল–খতীব আল–বাগদাদী ৭/৫৬
  • ওফায়াতুল আ’ইয়ান — ইবন খাল্লিকান ১/২৭৭
  • আল–বিদায়াহ ওয়ান–নিহায়াহ — ইবন কাথীর ১০/২৮১
  • মীযানুল ই’তিদাল — যাহাবী ১/৩২২
  • সিয়ার আ’লামুন্নুবালা — যাহাবী ১০/২০০

এরপর আহমাদ ইবনু আবী দুওয়াদ (মৃত্যু: ২৪০ হিজরি), – এরপর বিশর আল–মারীসীর কাছ থেকে সে এই আকীদা গ্রহণ করে খলিফা আল–মামুনকে প্ররোচিত করে। ফলাফল, শুরু হয় মিহনা (ইনকুইজিশন)—এক ভয়ংকর নির্যাতন অভিযান। যেখানে উলামাদের বাধ্য করা হতোঃ “বল—কুরআন সৃষ্টি।” না বললে নির্যাতন, শিকল, কারাবাস, এমনকি হত্যা। এ অবস্থায় ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (রহ.) সত্যের ওপর দৃঢ় থাকেন, কঠোর নির্যাতন সয়ে যান, কিন্তু কখনও বলেননি যে কুরআন সৃষ্টি।

⭐ ইবনু আসাকিরসহ আরও অনেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শিকড় উল্লেখ করেছেনঃ

জা‘দ ইবনু দিরহাম তার আকীদা নিয়েছিল— বায়ান ইবনু সাম’আন থেকে। আর বায়ান তারটা নিয়েছিল— তালূত থেকে (যে ছিলো লাবীদ ইবনু আল–আ‘সামের বোনের ছেলে)। আর তালূত নিয়েছিল তার মামা— লাবীদ ইবনু আল–আ‘সাম থেকে। লাবীদ ইবনু আল–আ‘সাম সেই ইহুদী — যে রাসূল ﷺ–এর ওপর জাদু করেছিল। এবং সেও বলতঃ “তাওরাত সৃষ্ট।”

অর্থাৎ এই ভ্রান্ত বিশ্বাস মূলত ইহুদি উৎস থেকে ইসলামি সমাজে ঢুকেছে।

এখানে বায়ান ইবনু সাম’আন আন–নাহদী সম্পর্কে আরেকটু বলা যেতে পারে, সে ছিলো বনি তামীম গোত্রের একজন। সে ১০০ হিজরির পর ইরাকে প্রকাশ্যে আসে। তার কিছু অন্যতম ভ্রান্ত দাবি ছিলঃ

আলী (রদিয়াল্লাহু ‘আনহু) হলেন “ঈশ্বরত্ব”–এর অধিকারী—অর্থাৎ তার মধ্যে নাকি মানবীয় সত্তার পাশাপাশি “ঈশ্বরীয় অংশ” যুক্ত ছিল। এরপর এই “ঈশ্বরত্ব” নাকি চলে যায় তার সন্তান মুহাম্মদ ইবনু হানাফিয়্যাহর কাছে। তারপর আবু হাশিম (ইবনু হানাফিয়্যাহর ছেলে), এরপর বায়ান ইবনু সাম’আন—এর কাছে।

ইবনু নুমায়র বলেনঃ ❝খালিদ ইবনু আবদুল মালিক আল–কুসরী তাকে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে দেয়।❞

সোর্সঃ

  • মীযানুল ই’তিদাল (১/৩৫৭)
  • আল–বিদায়াহ ওয়ান–নিহায়াহ (৯/৩৫০)
  • আল–ওয়াসায়িল ফি মা’রিফাতিল আওয়াইল — আস–সুয়ূতী (১৩১–১৩২)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *