উমাইয়া বংশ (বনু উমাইয়া) হলো কুরাইশ গোত্রের একটি শাখা। মুআবিয়া ইবন আবি সুফিয়ান (রাঃ) ছিলেন উমাইয়া পরিবারের সদস্য, এবং তিনি খিলাফতের কেন্দ্র দামেস্কে স্থাপন করেন। তাঁর পর থেকে বংশানুক্রমিকভাবে শাসন চলে—তাই এ সময়কে বলা হয় উমাইয়া খিলাফত/যুগ।

উমাইয়া যুগে (৪১-১৩২ হিজরি, ৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) অর্থাৎ ৯১ বছরে নতুন ৫টি বিদ‘আতী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। কাদরিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ, মুরজিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ এবং মু‘তাযিলাহ। এই পর্বে শুধু কাদরিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ এবং মুরজিয়্যাহ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। কারন জাহমিয়্যাহ এবং মু‘তাযিলাহ সম্পর্কে আলাদা পর্বে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন।

বিদআত অর্থ কি?

ইসলামে “বিদআত” (bid’ah) শব্দটি আরবি থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ “নতুন উদ্ভাবন” বা “উদ্ভাবিত কিছু”। ধর্মীয় অনুশীলন বা বিশ্বাসে এমন কোনো নতুন জিনিস যোগ করা যা কুরআন, হাদিস বা মুহাম্মাদ (সা.)-এর সুন্নাহতে কোনো ভিত্তি নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে কেউ আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু প্রবর্তন করবে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” __সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭১৮

🚩 বিদআত শব্দটা সামনে বার বার আসবে তাই এ ব্যাপারে ক্লিয়ার করে নিলাম। বিদআত নিয়ে আলাদা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।

১. কাদরিয়্যাহ (~৬০-৮০ হিজরি, ৬৮০-৭০০ খ্রি.):

সিফফিন যুদ্ধ (৩৭ হিজরি) থেকেই মুসলমানদের মধ্যে একটা বড় বিতর্ক শুরু হয়েছিল: মানুষের কাজ কি আল্লাহর কদর(তাকদির বা আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত জ্ঞান)-এর কারণে ঘটে, নাকি মানুষ নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে করে? এরপর কারবালার ঘটনার (৬১ হিজরি) পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের ঘটনা মুসলিম সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিশেষ করে কুফা ও বাসরার অনেক মানুষ নিজেদেরকে দোষী ভাবতে থাকে। তারা অনুতপ্ত হয় যে, হুসাইন (রা.)-কে তারা কেন সাহায্য করেনি এবং ইয়াজিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব থেকেছে। প্রশ্ন উঠল—তাদের এই নীরবতা কি তাদের নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত, নাকি আল্লাহর কদরের কারণে?

উমাইয়া শাসকরা, বিশেষ করে আবদুল মালিক, এই ধরনের প্রশ্নকে রাজনৈতিক হুমকি মনে করতেন। কারণ, যদি বলা হয় সবকিছু আল্লাহর কদরের কারণে, তবে শাসকদের অন্যায় ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। আর যদি বলা হয় মানুষ স্বাধীন, তবে জনগণ তাদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণকারী হিসেবে উমাইয়া যুগে প্রথম নতুন বিদআত কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তাদেরকে কাদারিয়া বলা হয় কারণ তারা এই মত পোষণ করে, মানুষের কাজ করার ‘কাদর’ বা শক্তি আছে। অর্থাৎ মানুষই তার কাজের মূল কর্তা এবং মানুষ নিজেই নিজের কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী।

এই মতবাদের মাধ্যমে কাদারিয়ারা তাকদীরের সেই অংশ অস্বীকার করে, যেখানে বলা হয়— “সব কিছু আল্লাহ আগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।” অর্থাৎ, তারা বিশ্বাস করে না যে মানুষের ভাগ্য (তাকদীর) আগে থেকেই নির্ধারিত।

🚩 তাক্বদীর নিয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত আলোচনা আসছে ইনশাআল্লাহ।

কাদারিয়া এর প্রতিষ্ঠাতা মা‘বাদ আল-জুহানী কুফায় বসবাস করতো। সে ছিলো সিনবুয়া নামের একজন পারস্য বা ভারতীয় দার্শনিক থেকে প্রভাবিত। আর এই সিনবুয়া ফ্রি উইল (স্বাধীন ইচ্ছা) নিয়ে ধারণা প্রচার করতো।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “দুটি দল আমার উম্মতের মধ্যে কাফির বলে গণ্য হবে: যারা কাদর অস্বীকার করে, এবং যারা মৃতদের জন্য ক্রন্দন করে।”

সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং ১/১৫০ (ইংরেজি সংস্করণে: হাদিস নং ৮)

সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কাদারিয়াগণ হচ্ছে এ উম্মাতের অগ্নিপূজক। সুতরাং তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যাবে না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় উপস্থিত হবে না।

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬৯১ হাদিসের মান: হাসান হাদিস

এই হাদিসে “কাদরিয়্যাহ” শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি, তবে হাদিস স্কলাররা (যেমন, ইমাম নববী তাঁর শরহে মুসলিমে) এটিকে কাদরিয়্যাহ গোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন, যারা মানুষের সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে কথা বলে আল্লাহর কাদরকে অস্বীকার করে।

উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান মা‘বাদ আল-জুহানীর এই আক্বীদাহকে বিদ‘আতী বলে ঘোষণা করে এবং দামেস্কে (বর্তমান সিরিয়া) ক্রুসিফাই করে হত্যা করে। কারন কাদর নিয়ে তার এই চিন্তাধারার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল, এবং এটি উমাইয়া শাসকদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করত। ফলে, শাসকদের সমর্থকরা এবং কিছু ধর্মীয় চিন্তাবিদরা কাদরিয়্যাহর খণ্ডন করতে গিয়ে জাবরিয়্যাহর মতবাদ উদ্ভাবন করে।

📝 নোটঃ কাদারিয়া এবং কাদেরিয়া কিন্তু এক নয়। কাদারিয়া হচ্ছে একটা সম্প্রদায় যারা আক্বীদাহগত বিভ্রান্তিতে আছে আর কাদেরিয়া হচ্ছে একটা সুফি তরিকার নাম। এরকম আরো ১২৬ তরিকা আছে।

🚩 এসমস্ত তরিকা এবং সুফিবাদ সম্পর্কে আলাদা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

২. জাবরিয়্যাহ (~৮০-১০০ হিজরি, ৭০০-৭২০ খ্রি.):

জাবরিয়্যাহ গোষ্ঠী হচ্ছে কাদরিয়্যাহর চরম বিপরীত মতবাদ। এরা বলে, সবকিছু আল্লাহর জাবর (জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ), মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই।

জাবরিয়া সম্প্রদায় উমাইয়া বংশের শাসনামলে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত মনে করে, মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে জন্মগতভাবেই বিবেক, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা সেটআপ করা আছে। যা দিয়ে মানুষ ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করে ভালকে ভাল হিসেবে গ্রহণ এবং মন্দকে মন্দ হিসেবে বর্জন করার ক্ষমতা রাখে। তার মাঝে এই স্বাধীনতা আছে বলেই চলার পথে ইসলামী জীবনবিধান দেওয়া হয়েছে এবং তার ভাল-মন্দ আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষকে জড়পদার্থের মতো পুতুল ও অসহায় করে সৃষ্টি করা হয়নি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার প্রতি সামান্যতম অবিচারও করবেন না।

৩. মুরজিয়্যাহ (~৮০-১০০ হিজরি, ৭০০-৭২০ খ্রি.):

ইয়াযীদের কার্যকলাপ নিয়ে যখন মুসলিম সমাজে তীব্র বিভাজন সৃষ্টি হয়, তখন কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে খারেজি ও বিরোধী শিবির ইয়াযীদকে কাফির ঘোষণা করে। আর আরেকদল বলে, “খলিফাকে বিদ্রোহ করা যাবে না।” এবং এই দলই মূলত কোরআন এবং হাদিস অনুসারে সঠিক দল, যারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) এড়ানোর জন্য শাসকের প্রতি আনুগত্যকে অপরিহার্য মনে করতেন।

🚩 “শাসকের আনুগত্য” – এই মর্মে আলাদা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাল্লাহ।

ঐ সময়ে নতুন এক বিদআতের সৃষ্টি হয়, নাম হচ্ছে মুরজিয়া।

শাব্দিকভাবে মুরজিয়া শব্দটি আরবি শব্দ ইরজা’ থেকে এসেছে যার অর্থ – বিলম্বিত করা। মুরজিয়াগোষ্ঠী ঈমান থেকে আ’মলকে বিলম্বিত করে এবং তাকফীরকে বিলম্বিত করে। তারা ঈমানকে শুধুমাত্র হৃদয়ের বিশ্বাস এবং জিহ্বার স্বীকৃতি মনে করে। আমল তথা কর্ম, যেমন, নামায, যাকাত, রোজা ইত্যাদি ঈমানের অংশ নয়, বরং ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য সহায়ক। ফলে, কেউ যদি ইসলামের ফরয আমল না করে তবুও সে পূর্ণ মুমিন হতে পারে।

অথচ আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম, আবু বকর রা. এর শাসনকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছিলেন কারন ইসলামের কোন একটা ফরয বিধান জানার পরেও কেও অস্বীকার করলে সে ঐ অবস্থায় ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় অর্থাৎ কুফর বা মুরতাদ হয়ে যায়।

এই ইরজা – এর প্রবর্তক কে ছিলেন তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। এর মধ্যে ধার বিন আবদুল্লাহ আল-হামদানী, কায়স আল-মাসির এবং হাম্মাদ বিন আবি সুলায়মানের নাম উল্লেখ করা হয়। তারা সকলেই একই যুগে এবং একই স্থানে, ইরাকের কুফায় বাস করতেন, তাই এই ধারণাটি নির্দিষ্ট একটি স্থান(কুফা) থেকে উৎপন্ন হয়েছিল বলে এতটুকু নিশ্চিত।

খারেজিদের সাথে মুরজিয়াদের বৈশিষ্ট তুলনা করলে তাদের ব্যাপারে আরো স্পষ্ট ও সহজ হয়।

খারেজিদের দুইটি বৈশিষ্ট – পাপের কারণে মুসলিমকে কাফির বলা এবং কাফির হত্যার ঢালাও বৈধতা দাবি করা। এজন্যে এদেরকে উগ্রপন্থী বলা হতো।

আর এই মুরজিয়ারা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। এরা মনে করে ঈমানের সাথে আমলের কোনো সম্পর্ক নেই। ঈমান থেকে আমল বা কর্ম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ঈমানের জন্য শুধু অন্তরের বিশ্বাসই যথেষ্ট।

উমাইয়া শাসকদের জন্য মুরজিয়া মতবাদ ছিল সুবিধাজনক। কারণ: ইয়াযীদের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করেছে, তাদের সহজে কাফির ঘোষণা করা যেত না। উমাইয়া শাসকদের অন্যায়, বিলাসিতা বা পাপাচারের সাফাই গাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।

মুরজিয়াদের এই স্তরটা আস্তে আস্তে চরম আকারে ধারন করে। কিছু গোষ্টি আবার মুরজিয়াদের আদর্শ গ্রহন করে। এদের মধ্যে জাহমিয়্যাহ অন্যতম।

🚩 জাহমিয়াদের ব্যাপারে আলাদা পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

আনুসাঙ্গীক কিছু দলিলঃ

সালাফদের বাণীতে ইরজা বিদ‘আতের বিরুদ্ধে কঠোর কথাবার্তা রয়েছে। ইবন বাত্তাহ তাঁর “আল-ইবানাহ” গ্রন্থে আয-যুহরী (মৃত্যু: ১২৪ হিজরি) থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বলেছেনঃ ”ইসলামে এমন কোনো বিদ‘আত উদ্ভাবিত হয়নি যা এর অনুসারীদের জন্য এর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর—অর্থাৎ ‘ইরজা’।” তিনি আরও উদ্ধৃত করেছেন, আল-আওযা‘ঈ (মৃত্যু: ১৫৭ হিজরি) থেকে, আল-আওযা‘ঈ বলেন: “ইয়াহইয়া এবং কাতাদাহ বলতেন, বিপথগামীদের (অর্থাৎ বিদ‘আতীদের) কোনো কথা উম্মাহর জন্য তাদের দৃষ্টিতে ইরজা’র চেয়ে বেশি ভয়ংকর নয় (যা আমলকে ঈমান থেকে বাদ দেয়)।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *