রাসুল ﷺ জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি সত্য ও ইসলামের বিধানের প্রামাণ্য মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছেন। সাহাবীরা তাঁর কাছ থেকে সরাসরি সবকিছু শিখে নিতো এবং কেউ ভুল করলে তা মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যেত। রাসুল ﷺ এর একক নেতৃত্বে ইসলামের সকল বিধান ও নিয়ম স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কারণে, রাসুল ﷺ জীবিত থাকা কালীন সময়ে ইসলামে কোনো বিভাজন বা দল তৈরি হতে পারেনি। তাইল রাসুল ﷺ এর মৃত্যুর ঠিক পরের সময় থেকে এই সিরিজের টাইমফ্রেম শুরু করছি।

আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যখন মৃত্যু হয়, তখন আবূ বকর (রাঃ) সুনহ (মাদীনাহর উঁচু এলাকার একটি স্থানের নাম)-এ ছিলেন। ‘উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহ্‌র কসম, আল্লাহ্‌র রসূল ﷺ-এর মৃত্যু হয়নি। তিনি আরো বলেন, আল্লাহ্‌র কসম, তখন আমার অন্তরে এ বিশ্বাসই ছিল আল্লাহ্‌ অবশ্যই তাঁকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তিনি কিছু সংখ্যক লোকের হাত-পা কেটে ফেলবেন। অতঃপর আবূ বকর (রাঃ) এলেন এবং আল্লাহ্‌র রসূল ﷺ-এর চেহারা হতে আবরণ সরিয়ে তাঁর কপালে চুম্বন করলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান। আপনি জীবনে মরণে পবিত্র। ঐ সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ্‌ আপনাকে কখনও দু’বার মৃত্যু আস্বাদন করাবেন না। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, হে হলফকারী! ধৈর্য অবলম্বন কর। আবূ বকর (রাঃ) যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন ‘উমার (রাঃ) বসে পড়লেন।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৬৬৭ হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

📝 মৃত্যুর স্বাদ দু’বার আস্বাদন না করার অর্থ হচ্ছে মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর জীবিত হবে না।

আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে ‘উমার (রাঃ) বসে পড়। ‘উমার (রাঃ) বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ ‘উমার (রাঃ)-কে ছেড়ে আবূ বকর (রাঃ)-এর দিকে গেলেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন- “অতঃপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ‘ইবাদাত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ্‌ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না। আল্লাহ বলেন,.. -মুহাম্মাদ ﷺ একজন রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রসূল গত হয়েছেন (সূরা আলে-ইমরান ৩/১৪৪)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌র কসম! আবূ বকর (রাঃ)- এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানত না যে, আল্লাহ তা’আলা এরূপ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। এরপর সমস্ত সহাবী তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সবাইকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমাকে সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ) জানিয়েছেন, ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহ্‌র কসম! আমি যখন আবূ বকর (রাঃ)- কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন ভীত হয়ে পড়লাম এবং আমার পা দু’টি যেন আমার ভার নিতে পারছিল না, এমনকি আমি মাটিতে পড়ে গেলাম যখন শুনতে পেলাম যে, তিনি তিলাওয়াত করছেন যে নবী ﷺ ইন্তিকাল করেছেন।
(সহিহ বুখারী : ৪৪৫৪)

উপরের ২টি হাদিস থেকে আমাদের চরম একটা শিক্ষা রয়েছে,
যে কোন পরিস্থিতি আমাদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-বিবেক সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দিতে হবে কোরআন এবং হাদিসকে। অথচ আমাদের দেশে এখনো অনেক মানুষ বিশ্বাস করে রাসুল (সা.) আমাদের মতই জীবিত।

🚩 বিস্তারিত হায়াতি এবং মামাতি পর্বে লিখা হবে ইনশাল্লাহ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাফনের আগেই আনসারদের একটি দল ‘সাকিফা বনী সাঈদাহ’ নামক স্থানে একত্রিত হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা করা এবং তাদের মধ্য থেকে একজন নেতা নির্বাচন করা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রস্তাব করেন যে, মুহাজিরদের একজন খলিফা এবং আনসারদের একজন খলিফা থাকবে। এই খবর মুহাজিরদের কাছে পৌঁছালে আবু বকর (রা.), উমর (রা.) এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) দ্রুত সেই মজলিসে উপস্থিত হন।

আবু বকর (রা.) উপস্থিত সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, নেতৃত্ব কুরাইশদের অধিকার। তিনি যুক্তি দেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ গোত্রভুক্ত ছিলেন এবং আরবরা কুরাইশদের নেতৃত্ব মানে। এছাড়া, মুহাজিরগণ ইসলামে প্রথম, ত্যাগী এবং প্রভাবশালী। তিনি উম্মাহর ঐক্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে উমর (রা.) অথবা আবু উবাইদা (রা.)-কে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে প্রস্তাব করেন।

আবু বকর (রা.)-এর কথা শোনার পর উমর (রা.) তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর হাত ধরে আনুগত্যের শপথ (বাইয়াত) গ্রহণ করেন এবং ঘোষণা করেন, “আপনি আমাদের নেতা হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনাকে তাঁর জীবদ্দশায় ইমাম (নামাজের নেতা) নিযুক্ত করেছেন, সুতরাং আপনি সবচেয়ে উপযুক্ত।”। উমর (রা.)-এর এই পদক্ষেপের পর সাকিফায় উপস্থিত অন্যান্য সাহাবীগণও একে একে আবু বকর (রা.)-এর প্রতি বাইয়াত প্রদান করেন। পরের দিন মসজিদে নববীতে সমস্ত মুসলিম জনসাধারণ আনুষ্ঠানিকভাবে আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে বাইয়াত করেন।

আবু বকর (রা.)-এর এই নির্বাচন ছিল একটি “ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত”। সাহাবীগণ আলোচনার মাধ্যমে উম্মাহর জন্য সর্বোত্তম বিকল্প বেছে নিয়েছিলেন। এটি উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, কারণ প্রাথমিক কিছু মতপার্থক্য সত্ত্বেও সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে আবু বকর (রা.)-কে মেনে নেন। এই সিদ্ধান্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল, বিশেষ করে তাঁর অসুস্থতার সময় আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করাকে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।

এই সমস্ত ঘটনা প্রবাহ সহিহ বুখারির অসংখ্য হাদিস ‘সাহু’, ‘মাগাযী’ এবং ‘সাহাবীগণের মর্যাদা’ অধ্যায়ে পেয়ে যাবেন। এছাড়াও ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, তারীখ আত-তাবারী এবং ইমাম যাহাবী রহ. এর রচিত তারীখুল ইসলাম গ্রন্থে ইসলামের ঘটনা, খলিফাদের ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিদআত, ফিতনা ইত্যাদি একদম শুরু থেকে ইমাম যাহাবীর যুগ পর্যন্ত(প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাস) বিশদভাবে লিপিবদ্ধ আছে।

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে, আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইচ্ছার লঙ্ঘন ছিল এবং এটি একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র ছিল (নাউযুবিল্লাহ)। শিয়া সূত্রমতে, উমর (রা.) আলী (রা.)-এর বাড়িতে বাইয়াত চাওয়ার জন্য গিয়েছিলেন এবং আলী (রা.) ও তাঁর অনুসারীরা বাইয়াত না দিলে বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। এছাড়াও শিয়াদের আরো কিছু জঘন্য বানোয়াট কথা সামনে আলোচনায় আসবে।

আমাদের সমাজে আরেকটি ভ্রান্ত চিন্তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পর খিলাফত নির্বাচন এবং আমাদের দেশের গণতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি একই জিনিস। চলুন সংক্ষেপে এই ব্যাপারে কিছু মূল পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করিঃ

  • গনতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট যার পক্ষে যাবে সে জয়ী হয় এবং সে নেতৃত্বের আসন গ্রহন করে। কিন্তু আমারা এই সিরিজে দেখবো সাহাবাদের আলোচনার মাধ্যমে কিংবা অল্প সংখ্যক সদস্যের শুরা কমিটির মাধ্যমে ইসলামী খেলাফত নির্বাচন হয়েছে। এখানে গনহারে সকল ভোটকে প্রাধান্য দেয়ার চেয়ে অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার শ্রেণির পরামর্শে সিদ্ধান্তকে চুরান্ত বলে ধরা হয়েছে। বরং বাস্তবতা আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমানে টাকার বিনিময়ে বিপুল পরিমান ভোট ক্রয়-বিক্রয় হয় এবং ভোট কেন্দ্রে জোর-দখল চলে।
  • ইসলামী খিলাফতে নেতৃত্বের যোগ্যতা হচ্ছে তাকওয়া, ইলম, ইনসাফ। আর গণতন্ত্রে নেতৃত্বের যোগ্যতা হচ্ছে জনপ্রিয়তা বা ভোট।
  • ইসলামী খিলাফতে আইন প্রয়োগ হবে কোরআন এবং সুন্নাহ থেকে। কর্তৃত্বের উৎস হবেন আল্লাহ। আর গনতন্ত্রে আইন প্রয়োগ হবে মানুষের তৈরি সংবিধান থেকে এবং কর্তৃত্বের উৎস হবে জনগণ।
  • ইসলামী খিলাফতের একমাত্র উদ্দ্যেশ্য দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও হক বিচার। গনতন্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে জনগণের ইচ্ছা এবং সুবিধা।

🚩 বিস্তারিত আরো কিছু রিলেটেড বিষয় নিয়ে আক্বীদাহ সিরিজ – “কালচারাল মুসলিম”-এ আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।

🟩 আবু বকর রা. এর শাসনকাল, হিজরি ১১ – ১৩ (খ্রিস্টাব্দ: ৬৩২ – ৬৩৪ সাল)

আবু বকর (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা। রাসূল ﷺ এর ইন্তেকালের পরপরই প্রায় ২ বছর ৩ মাসের, এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু ফিতনা শুরু হয়ে যায়। এর মধ্যে আরবের কিছু লোক মুরতাদ হয়ে যায় এবং কিছু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে। তারা বলে, “মুহাম্মদ মারা গেছেন, এখন যাকাত দিতে হবে না!”

যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আবু বকর (রাঃ) যুদ্ধ ঘোষনা করলে উমর (রাঃ) বলেন, “আপনি সে সব লোকদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবেন যারা সম্পূর্ণ ধর্ম পরিত্যাগ করেনি, বরং যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে মাত্র?”

আবূ বক্‌র (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমি যুদ্ধ করবো যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, কেননা যাকাত হল সম্পদের উপর আরোপিত হক্ব। আল্লাহর কসম। যদি তারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায় যা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে তারা দিত, তাহলে যাকাত না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই যুদ্ধ করবো।
__সহিহ বুখারী: ১৩৯৯, ১৪০০, ১৪০১

এখানে একটা মূলনীতি স্পষ্ট হয় যে, কেউ যদি ইসলামের কোন একটা ফরয বিধান জানার পরেও অস্বীকার করে তাহলে ঐ অবস্থায় সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় অর্থাৎ কুফর বা মুরতাদ হয়ে যায়। আবু বকর (রাঃ) এর সিদ্ধান্তে উমর (রাঃ) প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও পরে বুঝতে পারেন যে আবূ বকর (রাঃ)-এর অবস্থানই সঠিক।

রাসূল ﷺ জীবিত থাকাকালীন, মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে সূরা আত-তওবার ১১ নং আয়াত এই মূলনীতিকে আরো স্পষ্ট করে তুলে,
❝যদি তারা তওবা করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত প্রদান করে তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই।🙷

এরপর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নেতৃত্বে রিদ্দা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে তিনি একে একে প্রায় ১২টি মুরতাদ উপজাতিকে পরাজিত করে ইসলামের শৃঙ্খলা ও ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. এর নেতৃত্বে আরেকটি যুদ্ধ, – “ইয়ামামার যুদ্ধ” সংঘটিত হয়। যুদ্ধের মূল কারন ছিলো মিথ্যা নবী মুসায়লিমা আল-কাযযাব নিজেকে নবী ঘোষণা করে এবং তার অনুসারীদের নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে তোলে। মুসাইলিমা আরবের ইয়ামামা নামক অঞ্চলের ধর্মগুরু ছিল, যেখানে সে মুহাম্মাদের হিজরতের পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময় সে পূর্ব আরবের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। নবী মুহাম্মাদের থেকেও অধিক বৃহৎ অঞ্চল তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। মুসায়লিমার বাহিনী সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। প্রথমে মুসলমানরা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে কিন্তু সাহাবীগণ পুনরায় সংগঠিত হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বহু সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন, বিশেষ করে হাফেজ সাহাবীগণ।

মুসায়লিমা একটি বাগানে লুকিয়ে থাকার সময় হত্যা করা হয়। যুদ্ধ শেষ হয় এবং মুসলিমদের জয় হয়। যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবী শহীদ হওয়ায় উমর রা. আশঙ্কা করেন, “যদি হাফেজরা শহীদ হতে থাকে, তাহলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যেতে পারে”। এরপর কোরআন সংকলনের দায়িত্ব পান যায়েদ ইবনে সাবিত রা., যিনি রাসূল ﷺ-এর যুগে ওহি লেখক ছিলেন। প্রতিটি আয়াতের জন্য দুইজন সাক্ষী নেওয়া হয় এবং একটি কপি আবু বকর রা. এর কাছে রাখা হয়।

আবু বকর রা. একদিন ঠান্ডা পানিতে গোসল করার কারণে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁর জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তিনি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগে তিনি সাহাবীদের পরামর্শ নিয়ে এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেন যে, উমর রা. সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, ন্যায়পরায়ণ, শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিতে পারেন। এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দেন।

🟩 আবু উমর রা. এর শাসনকাল, হিজরি ১৩ – ২৩ (খ্রিস্টাব্দ: ৬৩৪ – ৬৪৪ সাল)

উমর (রাঃ)-এর সময়ে পারস্যের অনেক অঞ্চল বিজয় করেন এবং বহু বন্দী আনা হয়। এই বন্দীদের মধ্যে অনেকেই ছিল মজুসি (আগুনপূজারী) যারা ইসলামের প্রতি শত্রুতাবোধ পোষণ করত। এদেরই একজন আবু লু’লু ফাইরুজ (المجوسي) – একজন পারস্য বংশোদ্ভূত দাস। তার মালিক ছিল মুগীরা ইবনে শু’বা। সে একবার উমর (রাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করে যে, তার উপর কর আরোপ বেশি হচ্ছে। উমর (রাঃ) বলেন, “তোমার আয় অনুযায়ী কর নির্ধারিত”—অভিযোগ অগ্রাহ্য করা হয়। এই কারণে সে উমর (রাঃ)-এর প্রতি ক্ষুব্ধ হয় এবং একটি দুই-মুখো বিষমাখানো ছুরি তৈরি করে প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নেয়।

২৩ হিজরি, ১ মহররম, মদিনার মসজিদে নববীতে, ফজরের নামাজের সময় উমর (রাঃ) ইমামতি করছিলেন। তিনি তাকবির বলার পরেই আবু লু’লু ছুরি নিয়ে সামনে এসে তাকে আঘাত করে। মোট ৬টি আঘাত করে, যার মধ্যে একটি ছিল নাভির নিচে, যা মারাত্মক ছিল। হামলার সময় সে আরও ১৩ জন সাহাবীকে আঘাত করে, যাদের মধ্যে ৬ জন শহীদ হন। তারপর সে নিজেই আত্মহত্যা করে ফেলে।

উমর (রাঃ)-কে চিকিৎসা দেওয়া হয়, কিন্তু রক্তক্ষরণ থামানো যায়নি। তিনি মৃত্যুর আগে পরামর্শ দেন—খিলাফতের দায়িত্ব একটি শুরা কমিটির মাধ্যমে ঠিক করতে (তালহা, উসমান, আলী, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, ইত্যাদি)। হযরত উসমান (রাঃ) পরবর্তীতে খলিফা নির্বাচিত হন।

আবু লু’লুর সাথে ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল—তাদের মধ্যে হিরমান ও জাফিন নামের দু’জনকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করা হয় (তাবারী)। অনেকে ধারণা করেন—এই পরিকল্পনার পেছনে ছিল মজুসি বা পারস্যের প্রতিশোধস্পৃহা।

উমর (রাঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার রাস্তায় শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য দিন এবং রাসূলের শহরে আমার মৃত্যু দিন”। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা তাঁর এই দু’আ কবুল করেন। তিনি শহীদ হন এবং মদীনাতেই দাফন হন, রাসূল (সা.) ও আবু বকর (রাঃ)-এর পাশে।

রেফারেন্সঃ সহীহ বুখারী, হাদীস: 3700 – এখানে উমর (রাঃ)-এর শাহাদাত ও মৃত্যুর পূর্ববর্তী অবস্থার বর্ণনা রয়েছে। এছাড়াও, তারীখ তাবারী – ইমাম তাবারী। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইবনে কাসির। সীরাতে ইবনে হিশাম।

🟩 আবু উসমান (রাঃ) এর শাসনকাল, হিজরি ২৩ – ৩৫ (খ্রিস্টাব্দ: ৬৪৪ – ৬৫৬ সাল)

উসমান (রাঃ) ছিলেন খিলাফতের তৃতীয় খলিফা। তার সময় ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে—আফ্রিকা, পারস্য, এবং রোমান সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল মুসলিম শাসনে আসে। উসমান (রাঃ) নিজের আত্মীয়দের বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন (যেমন: মারওয়ান ইবনে হাকাম, ওয়ালীদ ইবনে উকবা)। অনেকেই মনে করত এসব গভর্নর অন্যায় করছেন, কিন্তু উসমান (রাঃ) ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এখান থেকেই প্রথমবার প্রকৃত রাজনৈতিক ফিতনা শুরু হয়।

হযরত উমর (রাঃ)-এর শাসন ছিল কঠোর ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণভিত্তিক। কিন্তু উসমান (রাঃ) তুলনামূলক নরম ব্যবহার করতেন, যার সুযোগ বিদ্রোহীরা নিয়ে নেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামের এক ইহুদি মুনাফিক ইসলাম গ্রহণ করে ভেতর থেকে ফিতনা সৃষ্টি করে। সে বিভিন্ন শহরে গিয়ে সাহাবীদের বিরুদ্ধে ভুল ব্যাখ্যা ও মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। অনেক সাহাবী অভিযোগ করতেন যে, রাজস্ব বিতরণে কিছু বৈষম্য হচ্ছে। বিদ্রোহীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে উস্কে দেয়।

ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা মিসর, কুফা, ও বসরা থেকে দল গঠন করে মদিনায় আসে। তারা দাবি তোলে—গভর্নরদের অপসারণ করতে হবে। উসমান (রাঃ) শান্তিপূর্ণ সমঝোতার চেষ্টা করেন, এমনকি নতুন গভর্নর নিয়োগের চিঠিও দেন।

বিদ্রোহীরা ফিরে যাওয়ার পথে মিসর থেকে আগত দল একটি চিঠি পায়, যাতে লেখা—”বিদ্রোহীদের মদিনায় পৌঁছেই হত্যা করো।” তারা ধারণা করে, চিঠিটি উসমান (রাঃ)-এর নির্দেশে পাঠানো হয়েছে, যদিও বাস্তবে এটি ছিল চক্রান্তকারীদের জাল তৈরি করা চিঠি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহীরা আবার ফিরে এসে মদিনা ঘেরাও করে। তারা উসমান (রাঃ)-এর বাড়ি ঘেরাও করে রাখে ৪০ দিন ধরে। সাহাবীগণ তাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রক্তপাত চাননি—তাই সবাইকে বাধা দেন।

আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)-এর পুত্র মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর, সেই সময় বিদ্রোহীদের আবেগের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং একসময় উসমান (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। উসমান (রাঃ) তাকে চিনে ফেলেন এবং বলেন, “হে আমার ভাতিজা! তোমার বাবা (আবু বকর) যদি আজ জীবিত থাকতেন, তিনি কখনোই এই কাজ অনুমোদন করতেন না।” এই কথা শুনে মোহাম্মদ এতটাই প্রভাবিত হন যে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, লজ্জিত হন, এবং সেই জায়গা থেকে ফিরে যান।

মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর চলে গেলেও বিদ্রোহীদের কিছু চরমপন্থী সদস্য থেকে যায়। একদিন সকালে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় বিদ্রোহীরা তার ঘরে ঢুকে তাকে শহীদ করে। শহীদ হওয়ার সময় তাঁর সামনে কুরআনের একটি আয়াত ছিল: — “তবে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য যথেষ্ট।” (আল-বাকারাহ 2:137)

🟩 আলী (রাঃ) এর শাসনকাল, হিজরি ৩৫ – ৪০ (খ্রিস্টাব্দ: ৬৫৬ – ৬৬১ সাল)

উসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর মুসলিমদের একটি বড় অংশ হযরত আলী (রাঃ)-কে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা তখন ছিল অস্থির। উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীরা তখনো খোলা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। মদীনা ছিল বিদ্রোহীদের দখলে, এবং একই সাথে আলী (রাঃ)-এর প্রশাসনিক ক্ষমতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। খুনিরা বিভিন্ন বাহিনীতে মিশে গিয়েছিল। কেউ কুফা, কেউ বসরা, কেউ সিরিয়া চলে গিয়েছিল। হযরত আলী (রাঃ)-এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠনের আগেই জামাল যুদ্ধ ও সিফফিন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ফলে উনি আর বিচার করার সুযোগ পাননি।

জামাল যুদ্ধ (৬৫৬ খ্রিঃ / হিজরি ৩৬) :- হযরত আয়েশা (রাঃ), তলহা (রাঃ), ও যুবায়ের (রাঃ) — এই তিনজন সহ আরো অনেক সাহাবী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন এবং উসমান (রাঃ)-এর খুনীদের শাস্তি দাবি করেন। তারা বসরা গমন করেন। হযরত আলী (রাঃ) তখন কুফায় ছিলেন, তিনিও বাহিনী নিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হন। যদিও তাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধ ছিল না, কিন্তু উসকানিদাতাদের কারণে যুদ্ধ বাধে — এটিকে বলা হয় “হারবুল জামাল” বা উটের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তলহা ও যুবায়ের (রাঃ) শাহাদত বরণ করেন, এবং আয়েশা (রাঃ)-কে সম্মানের সাথে মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সিফফিন যুদ্ধ (৬৫৭ খ্রিঃ / হিজরি ৩৭) :- এরপর হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ), যিনি তখনো উসমান (রাঃ)-এর খুনীদের শাস্তি চান, আলী (রাঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করেননি যতক্ষণ না খুনীদের বিচার করা হচ্ছে। উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ হয় সিফফিন নামক স্থানে, যা ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ, দ্বীনি নয়। যুদ্ধ চলাকালীন আরব কৌশল অনুসারে “হাকামিয়া” বা সালিশি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয় — যাতে দুই পক্ষ থেকে arbitrator বা সালিশ নিযুক্ত হয়।

হাকামিয়ার প্রক্রিয়ায় যেসব লোক আলী (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে ছিল, তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও দুর্বলতা কিছু সাহাবীদের বিরক্ত করে। একদল লোক আলী (রাঃ)-এর দল থেকে বেরিয়ে যায় এবং নিজেদের “শুধু আল্লাহর রায় চাই” এই শ্লোগান দিয়ে পরিচিত করে — এদেরই বলা হয় “খারেজি”। এই খারেজিরাই পরবর্তীতে হযরত আলী (রাঃ)-কে হত্যা করে। এরা হযরত আলী (রাঃ), হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। তিনজনকে একই দিনে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল।

১৭ই রমজান, ৪০ হিজরি (মতান্তরে ১৯ রমজান) ভোরবেলা, হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ পড়াতে আসেন। ইবনে মুলজিম নামে এক খারিজি দলের সদস্য, তলোয়ারে বিষ মেখে নামাজ শুরু হওয়ার সময় হঠাৎ সামনে এসে তাঁর মাথায় আঘাত করে। হযরত আলী (রাঃ) তখন বলেন: “ফুযতু ও রাব্বিল কা’বাহ” – অর্থ: কা’বাহর প্রভুর কসম, আমি সফল হলাম। তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২১ রমজান শহীদ হন।

হযরত আলী (রাঃ) নিজে নির্দেশ দেন: “যদি আমি মারা যাই, তাহলে ওকে আমার রক্তের বদলায় হত্যা করো। কিন্তু শুধু ওকে—কোনো নিরপরাধকে স্পর্শ করো না।” হযরত আলী (রাঃ)-এর মৃত্যুর পরে ইবনে মুলজিমকে হযরত হাসান (রাঃ) তলোয়ার দিয়ে হত্যা করেন।

আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম আল-মুরাদী মনে করত হযরত আলী (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবী ইসলামে বিভাজন সৃষ্টি করছেন (নাউযুবিল্লাহ)। মূলত “খারিজি মনোভাব” থেকে এই কাজ করে—যারা চরমপন্থী ছিল এবং নিজেরাই অন্যকে কাফির বলে রায় দিত। খারিজিদের মতে, হযরত আলী (রাঃ) “সিফফিনের সালিশি” মেনে নিয়ে বড় গুনাহ করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। এজন্য তারা তাঁকে হত্যা করা বৈধ মনে করেছিল।

হযরত আলী (রাঃ) প্রথমেই খুনীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় কিছু সাহাবী মনে করেছিলেন, হয়তো তিনি তাদের বিচার করতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আলী (রাঃ) যখন খিলাফত গ্রহণ করেন, তখন খুনিরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তার বাহিনীতেও ঢুকে পড়ে। খুনীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। কারন এরা কেও সরাসরি হত্যা করেছে আবার কেও উস্কানি দিয়েছে—এই দু’ধরনের লোকই ছিল। যদি আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন, তখন বড় একটি গৃহযুদ্ধ বাধতো। তিনি চাইছিলেন প্রথমে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে, তারপর বিচার করতে। আলী (রাঃ) কুফায় খিলাফতের রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এরই মধ্যে জামাল যুদ্ধ ও সিফফিন যুদ্ধ বাধে, যা তাকে বিচার থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।

__ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: ❝হযরত আলী (রাঃ) বিচার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি।🙷

__ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: ❝হযরত আলী (রাঃ) মুমিনদের মধ্যে রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন, তাই ধৈর্য ধরেছেন।🙷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *