আমরা জানি, আরবি ভাষায় প্রতিটি শব্দ সাধারণত ৩ অক্ষরের একটি ধাতু (root) থেকে জন্ম নেয়। আক্বদ ❝عقد🙷 হচ্ছে তেমনি একটি Root word, যার মূল অর্থ হচ্ছে – বাঁধা, গিঁট দেওয়া। সুরা বাকারা (২:২৩৭) নং আয়াতে “ওক্বদাতুল নিকাহি” (عُقْدَةُ النِّكَاحِ) শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে, যা আরবি ভাষায় “বিবাহের চুক্তি বা বন্ধন” বোঝায়। এখানে, عُقْدَةُ শব্দটি এসেছে “আক্বদ” (عقد) থেকে।

একইভাবে, সুরা ত্বহা (20:27)-এ বলা হয়েছেঃ

“..আর আমার জিহ্বার গিঁট খুলে দাও”

এই আয়াতের “উকদাতান” (عُقْدَةً) শব্দটিও “আকদ” (عقد) থেকে উদ্ভূত/গঠিত।

আবার, সূরা ফালাক (১১৩:৪) – আয়াতে —

“..আর গিঁটে ফুঁ দেয়া নারীদের অনিষ্ট থেকে”

এভাবে عُقْدة, عَقِيدَة, عَقْد, عَقَدُوا — এ শব্দগুলো একই পরিবারের।

“আক্বীদাহ” (العقيدة) শব্দটি সরাসরি কুরআন বা হাদিসে উল্লেখিত নয় তবে এই শব্দের শিকড় (root word) “আক্বাদ” (عقد) আরবি ভাষায় বিদ্যমান, যার অর্থ বাঁধা বা দৃঢ় করা। আক্বীদাহ (العَقِيدَة) ঈমান ও বিশ্বাসের দৃঢ় বন্ধন বুঝায়, যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। আক্বীদাহ শব্দটি একটি ইসিম (اسم/noun)। এটি কোনো ক্রিয়া বা কর্ম বোঝায় না, বরং এটি একটি অবস্থা বা ধারণা নির্দেশ করে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির বিশ্বাস বা ঈমানের মূল ভিত্তি।

গ্রীক দর্শন এবং বিভিন্ন বাতিল ফিরকা (যেমনঃ মুতাযিলা, জাহমিয়া, ইত্যাদি) থেকে ইসলামী আকীদার ওপর চাপ তৈরি হলে, বিশ্বাসের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলোকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন হয়। সালাফের যুগ পেরিয়ে তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনদের সময়ে এবং বিশেষ করে তৃতীয় শতাব্দীতে আক্বীদাহ শব্দটি বিশেষভাবে/স্পষ্টভাবে ইসলামের বিশ্বাসের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। ইমাম আবু হানিফার (রহ.) তাঁর “আল-ফিকহুল আকবার” এবং ইমাম তাহাভীর (রহ.) এর “আকীদাতুত তাহাভিয়াহ” গ্রন্থসমূহ আক্বীদাহ বিষয়ক প্রাথমিক লেখনী হিসেবে প্রসিদ্ধ।

৮ম শতকের প্রশিদ্ধ অভিধানবেত্তা আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-ফাইঊমী(৭৭০হি) তাঁর আল-মিসবাহুল মিনীর গ্রন্থে লিখেছেন,

❝মানুষ ধর্ম হিসেবে যা গ্রহণ করে তাকে ‘আকীদা’ বলা হয়। বলা হয় ‘তার ভাল আকীদা আছে’, অর্থাৎ তার সন্দেহমুক্ত বিশ্বাস আছে।❞

__বই: ইসলামী আকীদা

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

আক্বীদাহ অনেক বড় ও ব্যাপক পরিসরের একটি ধারণা। প্রতিটি মানুষ, তার বিশ্বাস, চিন্তাধারা, নৈতিকতা, এবং দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই আক্বীদাহে অন্তর্ভুক্ত। যেমন, একজন নাস্তিকের আক্বীদাহ হতে পারেঃ “জগতের সবকিছুর ব্যাখ্যা বিজ্ঞানের মাধ্যমেই সম্ভব, অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তার প্রয়োজন নেই। মানুষের জীবন অর্থবহ তখনই হয়, যখন সে নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে”, ইত্যাদি।

ইসলামে আক্বীদাহ হলো এমন একটি ব্যাপক ধারণা যার মধ্যে ঈমানসহ সমস্ত মৌলিক বিশ্বাস ও নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত। আক্বীদাহ এর মধ্যে শুধুমাত্র আল্লাহ সম্পর্কিত যে সমস্ত বিশ্বাস আমাদের রাখতে হবে সেগুলো হচ্ছে ইলমুত-তাওহীদ (عِلْمُ التَّوْحِيدِ)। ধরুন, একটি গাছের ভিত্তি হলো তার শিকড়। যদি শিকড় মজবুত হয়, তাহলে গাছ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং ফল দিবে।

– আক্বীদাহ হলো সেই শিকড়

– ঈমান হলো গাছের মূল কান্ড

– ইবাদত ও আমল হলো সেই গাছের ডালপালা ও ফল। যদি আক্বীদাহ মজবুত হয়, তবে ঈমান এবং আমল পরিশুদ্ধ হবে, সঠিক পথে থাকবে। তাই এটি মুসলিম জীবনের ভিত্তি, কারণ আক্বীদাহই তার ঈমান, চিন্তা, এবং কর্মের রূপরেখা নির্ধারণ করে।

আক্বীদাহে মৌলিক গ্রহনযোগ্য পরিভাষাগুলো হচ্ছে, — ঈমান, তাওহীদ, সুন্নাহ, ফিকহুল আকবার, উসূলুদ্দীন ইত্যাদি। আক্বীদাহে অগ্রহনযোগ্য পরিভাষা হচ্ছে, ইলমুল কালাম, মেটাফিজিক্স, ফালসাফা ইত্যাদি। কারন এসমস্ত পরিভাষা সালাফগন ব্যাবহার করেননি। বিষয়গুলো সামনে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পরে, খারেজি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যত বাতিল ফেরকা আছে, সবকিছুর উদ্ভবের একমাত্র কারন এই আক্বীদাহ। সুতরাং একমাত্র সঠিক আক্বীদাহের মাধ্যমে ঐক্য ফিরে আসা সম্ভব, যা পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।

একজন মুসলিমের জীবনে শেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে ঈমান। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন আক্বীদাহের মাধ্যমে এই ঈমান পরিশুদ্ধ করার জন্য। এবং কোরআন সংরক্ষনের দায়িত্ব নিয়েছেন(সুরা আল-হিজর ১৫:৯)। সুতরাং এটা নিশ্চিত যে সহিহ আক্বীদাহ এর তথ্য এখনো আমাদের মাঝে অক্ষত আছে। এবং এটা আল্লাহর পক্ষ হতে আমাদের জন্য অনেক বড় দয়া এবং নেয়ামত। আমাদের শুধু পড়াশুনা করে সেগুলা জানতে হবে এবং মানতে হবে। আক্বীদাহ সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। আর সহিহ আক্বীদাহ জানার একটা সহজ মাধ্যম হচ্ছে বাতিল আক্বীদাহগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া। এ ব্যাপারে হুজাইফা (রাঃ) থেকে চমৎকার একটি হাদিস এসেছে,

“মানুষ রাসূল (ﷺ)-এর কাছে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত, আর আমি জিজ্ঞাসা করতাম অকল্যাণ সম্পর্কে, কারণ আমি ভয় করতাম যে, আমি অকল্যাণে পতিত হবো।”
__সহীহ বুখারি (৩৬০৬) এবং সহীহ মুসলিম (২৮৯১)

হুজাইফা (রাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন যে, কল্যাণ জানার পাশাপাশি অকল্যাণ থেকে বাঁচাও জরুরি। তাই তিনি অকল্যাণ, ফিতনা এবং ভবিষ্যতের বিপদের দিকগুলো সম্পর্কে রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বিস্তারিত জানতে চাইতেন। এছাড়াও আমাদের কালেমা হচ্ছে এমন, “লা ইলাহা” তারপর “ইল্লাল্লাহ”, অর্থাৎ আগে বলো “কোন ইলাহ নেই” তারপর “আল্লাহ ছাড়া”। মানে আগে বাতিল সম্পর্কে জানো তারপর হক্বটা জেনে নাও।

আক্বীদাহ হচ্ছে দারসি বা পাঠ্য বিষয়। ১ দিনে বা একটা লেখা পড়ে আক্বীদাহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা নেয়া সম্ভব না। অনেক বিষয় আপনি যদি ঐ প্রেক্ষাপট না বুঝেন বা নিজে ঐ প্রেক্ষাপটের সম্মুখীন না হন তাহলে আক্বীদাহের ঐ নির্দিষ্ট বিষয়টিও বুঝা যাবেনা বা অস্পষ্ট থেকে যাবে।

এজন্যে জীবনের প্রতিটা প্রেক্ষাপটে আমাদের খুজে বেড়াতে হবে কোরআন এবং হাদিসে এই বিষয়ে কি বলা আছে এবং সালাফগন এই বিষয়টাতে কি আমল করেছেন বা কি সংশোধন বা মতামত দিয়ে গেছেন। আরো ভালো হয় সালাফী আলেমগনের সাথে সবসময় যোগাযোগ এবং বিভিন্ন বিষয়ে মাসলা মাসায়েল সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া। এভাবে ইনশাআল্লাহ সহিহ আক্বীদাহের পথে চলা সম্ভব।

সহিহ আক্বীদাহের উপর থাকলে লাভ কি?

সহিহ আক্বীদাহ মানেই হচ্ছে শিরক এবং বিদআত থেকে মুক্তি। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন,

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শিরক করা ক্ষমা করেন না, তবে এর বাইরে যা কিছু আছে, তা তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শিরক করে, সে ভয়ংকর অপরাধ করেছে।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)

সুতরং একজন শিরকে লিপ্ত ব্যাক্তি চির জাহান্নামি এটা নিশ্চিত। আবার বিদআত হচ্ছে আমল ধংসকারী।

🚩 ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ – বিদ’আত, পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সুতরাং, সহিহ আক্বীদাহ একজন মুসলিমকে চির জাহান্নামি হতে মুক্তি দিবে। এবং এটাই একজন মুসলিমের প্রথম চ্যালেঞ্জ। সহিহ আক্বীহাদের উপর থাকলে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় লাভ এটাই।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

“নিশ্চয়ই, যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে, তাদের উপর শয়তানের কোনো ক্ষমতা নেই। শয়তানের ক্ষমতা শুধু তাদের উপর, যারা তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে এবং যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে।”
__ সুরা আন-নাহল (১৬:৯৯-১০০)

অর্থাৎ সহিহ আক্বীদাহ এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ওয়াসওয়াসা থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই সহিহ আক্বীদাহের মাঝে আছে প্রশান্তি। কারন একমাত্র সহিহ আক্বীদাহের মাধ্যমেই আল্লাহকে প্রকৃত অর্থে চিনা সম্ভব এবং আল্লাহর কথা প্রকৃত অর্থে মানা সম্ভব।

One response to “১) আক্বীদাহ”

  1. Nazirul Avatar
    Nazirul

    মা শা আল্লাহ, জাযাকাল্লাহ খায়রান 🔥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *