মানুষ তাঁর পারিপার্শিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা মানসিকতার উপর প্রভাবিত। অর্থাৎ আমরা প্রত্যেকে যেভাবে চিন্তা করি, সিদ্ধান্ত নিই বা আচরণ করি, তা পুরোপুরি নিজের ইচ্ছেমতো হয় না। তার পেছনে কিছু বাহ্যিক (পারিপার্শিক) ও অভ্যন্তরীণ (ব্যক্তিগত) প্রভাব কাজ করে।
যেমন, আমরা খুব ভালো করেই জানি, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে,
- পীর-মাজার-দরবার কেন্দ্রীক একটা বিশাল প্রভাব আমাদের সমাজে আছে, যা শিরকের সাথে সম্পৃক্ত
- মিলাদ-কিয়াম এর মত অনেক বিদআত আল্লাহর ঘর মসজিদে আজ প্রতিষ্ঠিত
- এছাড়াও কাদ্বিয়ানি, হিজবুত তাওহীদ, দেওয়ান বাগ, সেকুলার, নাস্তিকদের প্রভাব তো আছেই
এই সকল কিছুকে সামনে রেখে আমরা কি সত্যিকার অর্থে সঠিক ইসলাম চর্চা করছি কিনা এই প্রশ্নের জবাব খুজতে গিয়ে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে যা উপলব্ধি করলাম, —
আমাদেরকে ইসলামি আক্বীদাহ সম্পর্কে জানতে হবে। আর আক্বীদাহ বোঝার জন্য ইসলামের ইতিহাস, বিশেষ করে প্রথম তিন শতাব্দীর ঘটনাপ্রবাহ জানা আবশ্যক।
আমার এই সিরিজটা যেহেতু আক্বীদাহ সিরিজ তাই আমি চেষ্টা করেছি শুধুমাত্র আক্বীদাহগত মতপার্থক্য এবং এই সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরার। তাই এই সিরিজ আক্বীদাহ বুঝার জন্য খুবই বেসিক লেভেলের। কেও যদি আক্বীহাদ সম্পর্কে আরো গভীরভাবে নলেজ রাখতে চায় তাহলে তাঁর উচিত হবে সকল নবীদের জীবনি, রাসুল সাঃ এর জীবনি এবং সাহাবীদের জীবনি যতটা সম্ভব অথেন্টিক সোর্স থেকে জেনে রাখা।
এছাড়াও আক্বীদাহ সংক্রান্ত প্রাচীন গ্রন্থসমূহ এবং ইসলামি স্কলারগণের বিষয়ভিত্তিক বইয়ের রেফারেন্স এই সিরিজের বিভিন্ন পর্বে উল্লেখ করা হবে ইনশাল্লাহ। এই সোর্সগুলো যাচাই করা এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করার জন্য পাঠকের কাছে বিশেষ অনুরোধ রইলো।
এই আক্বীদাহ সিরিজ লেখার উদ্দেশ্য কি?
আমার এই আক্বীদাহ সিরিজের মূল উদ্দেশ্য ৩টি,
১/ পুরো আক্বীদাহ সিরিজটাকে ইতিহাস, যুগ অনুযায়ী টাইমফ্রেম অনুযায়ী সাজানো। অর্থাৎ কোন ভাবধারা কখন উঠল, কোন দল কখন গঠিত হল ইত্যাদি সময়রেখার মধ্যে পরিষ্কারভাবে সাজানো। যাতে পাঠকের মাথায় মানচিত্রের মতো পুরো ছবি উঠে আসে।
২/ হার্ডকোর দলিল উপস্থাপনের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা। প্রত্যেক যুগে কোন দল কী বিশ্বাস প্রচার করেছিল এবং তাদের মূল দাবিগুলো ঐ সময়ের ইসলামি স্কলারগন কিসের ভিত্তিতে বিচার করেছিলেন, এবং একইসাথে বর্তমান মূল ধারার স্কলারগন সেগুলোকে কিভাবে দেখছেন ইত্যাদি।
৩/ আক্বীদাহ এবং এর আনুসাংগীক পরিভাষাসমূহ গুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, যাতে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। এবং সব শেষে আমি একজন সাধারন মানুষ হয়ে যেভাবে পুরো বিষয়টাকে নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষন করতে পারলাম সেটা তুলা ধরা।
সঠিক আক্বীদাহ জানার গুরুত্বঃ
সঠিক আক্বীদাহ জানার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে শেষ হবেনা। কিন্তু আমি মূল কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করছি যতে এখান থেকে পাঠকের মাঝে চিন্তার খোরাক তৈরি হয়।
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল।” — সূরা নিসা ৪:৪৮
অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা শিরক ক্ষমা করবেন না। আর সকল প্রকার শিরক থেকে বাঁচতে হলে প্রয়োজন সঠিক আক্বীদাহ-এর জ্ঞান। আক্বীদাহর জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে আমরা জানতে পারবো আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা সম্পর্কে, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। যিনি আমাদেরকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানিয়েছেন। ভেবে দেখুন এটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে যদিনা আমাদের সারাটা জীবন শেষ হয়ে যায় আর আমরা তাঁর সম্পর্কে জানতে না পারি। সেটা আরো ভয়ংকর হবে যদি তাঁর সম্পর্কে আমরা ভুল ধারনা নিয়ে মৃত্যুবরণ করি।
দুনিয়াবী প্রতিষ্ঠান, যেমন কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাই করতে আমরা সাধারণত যে সকল ক্রাইটেরিয়া যাচাই করি,
- সেখানকার ছাত্ররা কেমন পদের চাকরি পাচ্ছে
- ছাত্ররা পরবর্তীতে কেমন গবেষণা করছে
- গ্রাজুয়েটরা সমাজে কতটা প্রভাব ফেলছে
- আন্তর্জাতিক বা জাতীয় র্যাংকিং
ইত্যাদি। কিন্তু একটা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কি একই ক্রাইটেরিয়া হবে? নিশ্চই না। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠান যাইচাইয়ের প্রথম মানদন্ড হবে আক্বীদাহ। আশা করি বুঝতে পারছেন সঠিক আক্বীদাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য কতটা জরুরি। পাঠকের উপলব্ধি সামনের আলোচনায় আরো বেশি হতে থাকবে যদি সিরিজটা ক্রমান্বয়ে পড়তে থাকেন ইনশাল্লাহ।
আরেকতা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, মানুষ কিন্তু নিজ থেকে নতুন তথ্য তৈরি করতে পারে না। প্রত্যেক ভুল আক্বীদাহ, নতুন মতবাদ, বা ভ্রান্ত ধারার শিকড় আসলে পুরনো কোনো ভুল ধারণা, যেটা নতুন পোশাকে আবার ফিরে আসে। যেহেতু এই সিরিজটা টাইমফ্রেম অনুসারে সাজানো হয়েছে, পাঠক পর্যায়ক্রমে দেখতে পাবেন প্রত্যেক নতুন দল আগের কিছু দল থেকে সংযোজন কিংবা বিয়োজন করে নতুন পরিভাষায় বা নতুন যুক্তিতে সাজিয়ে আবার সামনে এসেছে। তাই আজকের দিনেও যদি কেও এই কাজটা করে, আমরা খুব দ্রুত ধরে ফেলতে পারবো, এই ধারনাটা আসলে কোত্থেকে ধার করা। এবং এটাই সঠিক আক্বীদাহর জ্ঞান রাখার পরে সবচেয়ে মজার দিক।
০১) আক্বীদাহ
০২) খুলাফায়ে রাশেদীন
০৩) সাহাবীদের প্রতি সু-ধারনা
০৪) উমাইয়া যুগের ফিরকাসমূহ
০৫) তকদীর
০৬) জাহমিয়া মতবাদ
০৭) ঈমান
০৮) উমাইয়া যুগের শেষভাগ
০৯) আল্লাহর সিফাত ও মূলনীতি
১০) মুজাসসিমাহ এবং মুশাব্বিহাহ
১১) কুল্লাবিয়্যা এবং কারামিয়্যাহ
১২) আশআরি এবং মাতুরিদি
১৩) গ্রিক দর্শন ও গুপ্তবাদী প্রভাব
১৪) সালাফি আক্বীদাহ
১৫) মাজহাব
১৬) ইজমা ও কিয়াস
১৭) বাংলাদেশে ইসলামের সূচনা ও বর্তমান কালচার
১৮) সুফিবাদ
১৯) মানহাজ
২০) বিদআত
চলবে…(ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ২য় সংস্করণ থেকে…)
Leave a Reply