“তোমরা সবাই আল্লাহর রশিতে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হোও না। আর আল্লাহ তোমাদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ করো, যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তর একত্রিত করেছেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গিয়েছিলে। তোমরা এক সময় আগুনের গহ্বরের ধারে ছিলে, কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তা থেকে উদ্ধার করেছেন।”
(আল-ইমরান, ৩:১০৩)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের একতা বজায় রাখার আহ্বান করেছেন এবং তাঁদের একতাবদ্ধ হওয়া, দয়া ও সহযোগিতার মাধ্যমে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এখানে “আল্লাহর রশি”(حَبْلُ اللَّهِ) বলতে এখানে আল্লাহর নির্দেশাবলী ও ইসলামিক শরিয়াত বা আল কুরআন ও সুন্নাহ বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য যেসব পথ ও আইন নির্ধারণ করেছেন, তা হলো আল্লাহর রশি।
তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই রশি ছেড়ে দিয়েছে কারা? কারা ইসলামে বিভক্তি তৈরি করলো? এসকল প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে গেছি যা গত ১৯টা পর্বে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। আশা করি এখন বুঝতে পারছেন যে ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ লিখতে গিয়ে কেন আমি ইতিহাস টেনে আনলাম। যে কথাটি ১ম পর্বের শেষে উল্লেখ করেছি।
ঐক্যের আরো অনেক বিস্তর ব্যখ্যা রয়েছে। কিন্তু আমি এখানে স্পষ্টত এটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে, ইসলামী ঐক্য হবে আক্বীদাহের ভিত্তিতে। আক্বীহাদের বিচ্যুতি-ই মূলত মতভেদ তৈরি হয় এবং বিভিন্ন দলে বিভক্তি করে যা ইতিমধ্যে ইতিহাসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন,
“এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজেদের দীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উতফুল্ল।” সুরা রূম (৩০:৩২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তাঁর উম্মাহ অর্থাৎ বর্তমান এই মুসলিম ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। এবং জাহমিয়াদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ কি হবে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ৬-তে। এরপর আমরা এটাও জেনেছি যে, আক্বীদাহত মতভেদের চেয়ে ফিকহী মতভেদ সহনীয়। কিন্তু আমদের দেশে বর্তমান সমাজে আক্বীহাগত মতভেদ সহনীয় করে ঐক্য গঠন করার চেষ্টা করে। আর ফিকহী মতভেদে কোন ছাড় দিতে চায় না। এভাবে আমরা অসম্ভব কর্মে(আক্বীদাহে ছাড় দিয়ে ঐক্য গঠন) লিপ্ত হয়ে একটি সম্ভব কর্মেকে(সঠিক আক্বীহাদের মাধ্যমে ঐক্য) অসম্ভব করে তুলি।
তাও আবার আমাদের দেশে যে সকল ফিকহি মাসালা নিয়ে মতভেদ, এর বেশিরভাগই ইজতিহাদি মাসাআলা। যেমন, নামাযের হাত বাঁধা, তাহারাতের ইফতার ইত্যাদি। অথচ মুজতাহিদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। এবং এই ভুলের জন্য তিনি গুনাহগার হবেন না বরং একটি নেকী পাবেন।
আমর ইব্নু ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – কে এ কথা বলতে শুনেছেন,
কোন বিচারক ইজ্তিহাদে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য আছে দু’টি পুরস্কার। আর বিচারক ইজ্তিহাদে ভুল করলে তার জন্যও রয়েছে একটি পুরস্কার। (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৭৩৫২ এবং সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৪৬)
সাহাবায়ে কিরামের মাঝে আমলী মাসআলাগুলােতে প্রচুর মতভেদ ছিল, যারা সালাফে সালেহীনের ফিকহ অধ্যয়ন করবে তাঁরা বলতে পারবেন। ইমামগণের মধ্যেও প্রচুর আমলী মাসআলায় মতান্তর ছিল কিন্তু তাদের মনে পরস্পরের প্রতি কোনাে বিদ্বেষ ছিলো না। তাঁরা ইলমী মতভেদ করেছেন কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই একে অপরকে খারাপ বলেনি।
আক্বীদাহ হচ্ছে অপরিবর্তনীয় ও স্থীর। আক্বীদাহে বিচ্যুতি ঘটলে ব্যাক্তি কাফের হয়ে যায়। সে আর মুসলিম থাকেনা(ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ১৪ -তে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে), ঐক্য তো অনেক পরের বিষয়। এজন্যেই আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেছেন,
“মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারী একে অপরের সাহায্যকারী।” (আল-তাওবা, ৯:৭১)
এখানে মুসলিম না বলে মুমিন বলা হয়েছে। মুসলিম হল ইসলাম ধর্মকে নিজ ধর্ম বলে বিশ্বাস ও স্বীকার করে এমন ব্যক্তি। অপরদিকে, মুমিন হল ইসলাম ধর্মকে নিজ ধর্ম বলে বিশ্বাস ও স্বীকার করার পাশাপাশি তা নিজের ভেতরে ও বাহিরে ধারণ করে এবং সাথে-সাথে কঠোরভাবে এর নির্দেশাবলী মেনে চলে এমন ব্যক্তি। অর্থাৎ, বলা যায়, সকল মুমিন মুসলিম, কিন্তু সকল মুসলিম মুমিন নয়।
এ থেকে বুঝা যায় যে, যতক্ষণ কোন ব্যাক্তি ঈমানের সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং সন্দেহাতীত কুফর-শিরকে লিপ্ত না হচ্ছেন ততক্ষন তিনি অন্য মুমিনের দ্বীনি ভাই বলে গন্য হবে।
“আরবীয়রা বললো, ‘আমরা ঈমান এনেছি।’ তুমি বলো, ‘তোমরা ঈমান আননি, তবে বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’” (সুরা হুজুরাত, 49:14)
সর্বপরি আক্বীদাহে ছাড় দিয়ে হয়ত দুনিয়াবি দল বা ঐক্য গঠন সম্ভব, কিন্তু ইসলামী ঐক্য গঠন সম্ভব নয়। এজন্যে আক্বীদাহ এবং দাওয়াহ এর মাধ্যমে আমরা ইসলামের মূল বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে পারি। ঐক্য তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা সকলেই আল্লাহর রুজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবো এবং তাঁর রাসূলের পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। শিরক এবং বিদআত থেকে বেঁচে থাকবো।
আমাদের এই আক্বীদাহ সিরিজ আপনার চিন্তার খোরাক জন্ম দিক। আমরা আপনাকে আক্বীদাহ শিখাচ্ছিনা। আমরা আরো পড়াশুনা করবো, আরো জানবো ইনশাল্লাহ। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে ইসলাম কে প্রয়োগ করার চেষ্টা করবো।
Leave a Reply