শুরুতেই দ্বীন এবং ধর্মের মাঝে একটা মৌলিক পার্থক্য আমাদের বুঝতে হবে। দ্বীন হলো পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সব দিক নিয়ন্ত্রণ করে। আর ধর্ম বলতে সাধারণত উপাসনা, আচার-অনুষ্ঠান, এবং কিছু নৈতিক বিধান বোঝানো হয়।

ইসলাম একটি দ্বীন, যা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলামকে যারা দ্বীন হিসেবে না দেখে, বরং একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে ধারণ করে, এদেরকে খুব সহজে কালচারাল মুসলিম হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। এখানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট করা দরকার যে, কেও যদি ইসলামের কোনো অংশকে অস্বীকার করে বা পরিবর্তনযোগ্য মনে করে বা অন্য কিছু তার চেয়ে উত্তম মনে করে তাহলে এটা কুফরী হবে।

আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন,
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? যে ব্যক্তি এমনটি করবে, তাদের পরিণাম হবে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠিন শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।” (সূরা আল-বাকারা: 85)

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের অস্বীকার করে এবং যারা চায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে এবং বলে, আমরা কিছুতে বিশ্বাস করি আর কিছুতে অবিশ্বাস করি, এবং তারা চায় এর মধ্যবর্তী কিছু গ্রহণ করতে, তারাই প্রকৃত কাফের।” (সূরা আন-নিসা: 150-151)

কালচারাল মুসলিমদের সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার জন্য এর সংশ্লিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছিঃ

১/ লিবারেল মুসলিম (Liberal Muslim) :-
এরা আধুনিক বা পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে ইসলামের বিধান মেনে চলতে চায়।

২/ সেক্যুলার মুসলিম (Secular Muslim) :-
সেক্যুলার শব্দের অর্থ হলো ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্ম থেকে পৃথক। তাহলে সেক্যুলার আবার মুসলিম হয় কিভাবে তাইনা? আসলে ইসলামকে এরা জাস্ট একটা ট্যাগ হিসেবে ব্যাবহার করে। ধর্মকে একেবারে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে নিয়ে নেয়। এবার ধর্ম পালন করুক আর না করুক নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয়। অনেকটা নামধারী মুসলিমের মতই।

উল্লেখ্য বাংলাদেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী, নারীবাদী এবং মুক্তচিন্তার মানুষরাই লিবারেল এবং সেকুলার।

৩/ জাতিগত মুসলিম (Ethnic Muslim) :-
যারা ইসলামকে মূলত তাদের জাতিগত বা পারিবারিক পরিচয়ের অংশ মনে করেন, কিন্তু ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলেন না। যেমন, কেউ “আমি আরব বা তুর্কি, তাই আমি মুসলিম” বলে পরিচয় দিতে পারে, যদিও সে ইসলামের অনুসারী হিসেবে কার্যকরী নয়।

৪/ মডার্নিস্ট মুসলিম (Modernist Muslim) :-
যারা মনে করে, ইসলামের অনেক বিধান যুগের সঙ্গে পরিবর্তন হওয়া উচিত এবং কুরআনের ব্যাখ্যা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী হওয়া দরকার। উদাহরণস্বরূপ, তারা শরিয়াহ আইনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে পারে বা হিজাবকে ঐচ্ছিক হিসেবে দেখতে পারে। মডার্নিস্ট মুসলিমদের মধ্যে সেক্যুলার মুসলিমরাও পড়ে।

৫/ প্রগতিশীল মুসলিম (Progressive Muslim) :-
যারা ইসলামের বিধানগুলোকে আধুনিক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চায়। যেমন, নারীদের ইমামতি, সমকামিতার স্বীকৃতি, শরিয়াহর নতুন ব্যাখ্যা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে।

৬/ মুক্তমনা মুসলিম (Free Thinker Muslim) :-
যারা ইসলামের কিছু অংশ মেনে নেয়, কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করে। কুরআন ও হাদিসের বর্ণনাগুলোকে নিজেদের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে পর্যালোচনা করে গ্রহণ বা বর্জন করে।

৭/ কনফিউজড মুসলিম (Confused Muslim) :-
যারা ইসলামের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না, কখনও ধর্মের দিকে ঝোঁকে, আবার কখনও অন্যান্য মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। এরা ধর্ম দিয়ে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ না করে আবেগ দিয়ে করে।

এই সমস্ত মতাদর্শের মূল গোড়া হচ্ছে জাতীয়তাবাদ (Nationalism)। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট যুগের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রগঠনের ফলাফল হিসেবে বিকশিত হয়েছে এই জাতীয়তাবাদ। বিস্তারিত দেখুন ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ২-তে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *