এই পর্ব শুরু করার আগে ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (৭) – রিভিশন দিয়ে আসলে ভালো হবে। সেখানে জাবরিয়া এবং কাদারিয়া সম্পর্কে মৌলিক বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম। কাদারিয়্যাহগণ বিশ্বাস করে যে, ভাগ্য বলে কিছুই নেই, কর্মই সব। আর জাবারিয়্যাহগণ বিশ্বাস করে যে, কর্ম বলে কিছু নেই ভাগ্যই সব। এর চেয়ে সহজভাবে বুঝানোর ভাষা আমার জানা নেই এবং এটা বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই দুইটা ভ্রান্ত আক্বীদাহ খন্ডন করাই এই সিরিজের মূল উদ্দেশ্য।
এবার আসুন তাকদীরের উপর কিছু মৌলিক বিষয় নিয়ে জানার চেষ্টা করি,
১/ আল্লাহ তা‘আলা সকল মাখলুকের তাকদীর আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বৎসর পূর্বে লিখেছেন।
__সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৬৪১
সুতরাং একমাত্র আল্লাহ সুবহানাওয়া তালা ভবিষ্যৎ জানেন এবং তিনিই সকল জ্ঞানের অধিকারী।
২/ আল্লাহ সুবহানাওয়া তালার ২ ধরনের ইচ্ছা পোষন করেন –
ক) ইরাদায়ে শার‘ইয়্যাহঃ এটি আল্লাহর শরীয়তের ইচ্ছা, অর্থাৎ আল্লাহ যা পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, এবং বান্দাদের করার আদেশ দেন। যেমন, আল্লাহ সুবহানাওয়া তালা চান আমরা সালাত আদায় করি, সিয়াম পালন করি ইত্যাদি।
শরিয়তের আদেশ সবাইকে করা হয়েছে, কিন্তু সবাই করবে এমন নয়। বরং অনেক সময় বান্দা এর বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে। যেমন অনেক নাস্তিক ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। শরিয়তের দিক থেকে বান্দা স্বাধীন।
যদি বান্দা শরিয়ত পালন করে, তবে আল্লাহ খুশি হন। আর যদি কেও এগুলা করতে না চায় তবে আল্লাহ জোর করেন না কিন্তু ঐ ব্যাক্তির প্রতি অখুশি থাকেন।
খ) ইরাদায়ে কাওনিয়্যাহঃ এটি আল্লাহর সৃষ্টিগত বা বিশ্বব্যবস্থার ইচ্ছা, অর্থাৎ আল্লাহ যা ঘটাতে চান এবং তা অবশ্যই ঘটে, তা ভালো হোক বা মন্দ। যেমন, আগুন কোন বস্তুকে পুড়িয়ে ফেলে আবার পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে। অনেক সময় আল্লাহর এই সিস্টেম বা সুন্নাতুল্লাহ(আল্লাহ দুনিয়ায় এক নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা) -এর বিপরীত হয় সেটাকে বলে মোজেজা। যেমন ইব্রাহীম আ: কে আগুন পুড়াতে পারেনি। কারন আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা আগুনকে নিষেধ করে দিয়েছেন।
তাকদীরের ব্যাপারে মোজেজা প্রমাণ করে যে আল্লাহ চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক। প্রাকৃতিক নিয়মও তাঁর ইচ্ছায় চলে, ব্যতিক্রমও তাঁর ইচ্ছায় হয়। কেও নিজ ইচ্ছায় মোজেজা বা কোন প্রকার কেরামত ঘটাতে পারেনা যদিনা আল্লাহ চান।
৩/ বান্দা ইচ্ছা করলেই কোন কিছু ঘটবেনা যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। উপরন্তু আল্লাহ বলেই দিয়েছেন,
❝তোমরা কিছুই ইচ্ছা করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ, সৃষ্টিকুলের রব, তা ইচ্ছা করেন।❞
__সূরা আত-তাকওির 81:29
৪/ আরো ২টা বিষয় জানা জরুরি,
উলুহিয়্যাত এবং রুবুবিয়্যাত। আর এই ২টা বিষয় আমি একাডেমিক্যালি না বলে ঘটনাপ্রবাহের সাথে বললে পাঠকের বুঝতে সবচেয়ে ইজি হবে। তাই পড়তে থাকুন, সামনে আসছে ইনশাআল্লাহ।
বর্তমানে কাদারিয়া বা জাবরিয়া নামে সরাসরি হয়তবা কোন দল নেই। কিন্তু অনেক বড় বড় দায়ীরাও তাকদীরের ব্যাপারে ভুল করে ফেলেন। যেমন, একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। একজন ইসলামি দায়ীকে প্রশ্ন করা হয়েছে, যদি আল্লাহ বান্দার সকল কর্ম পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখেন বা তাকদিরে লিখে রাখেন তাহলে কেন ঐ কাজের জন্য বান্দার পাপ হবে এবং বিচার হবে?
উত্তরে তিনি এক পর্যায়ে একটা উদাহরণ দেন এমন যে, ❝ধরুন আপনার সামনে ৫টি রাস্তার মোড় রয়েছে। আপনি ২য় রাস্তাটি বেছে নিলেন। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালার রয়েছে ইলমে গায়েব। তাই তিনি আগে থেকেই জানেন আপনি ২য় রাস্তাটি বেছে নিবেন। এমন নয় যে আল্লাহ লিখে রেখেছেন বলেই আপনি ২য় রাস্তাটি বেছে নিচ্ছেন, বরং আপনি ২য় রাস্তাটি বেছে নিবেন এটা আল্লাহ জানেন এবং তিনি সেটাই লিখে রেখেছেন।❞
তাহলে এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, যদি আমি করবো বলেই আল্লাহ সেটা তাকদিরে লিখেন, তাহলে তাকদির বলতে আর কিছু থাকলো? কারন উপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাকদির আমার কর্মের উপর নির্ভরশীল। বিষয়টা এমন হয়ে গেলোনা যে, আমি যা করছি তা আল্লাহ ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করলেন?
এই ব্যাখ্যা আমাদের বাস্তব জীবনে অনেক কর্মের সাথে সাংঘর্ষিক। কারন এমন অনেক কাকতালীয় ঘটনা আছে যা আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী করতে গিয়ে পারিনা আবার করতে চাইনা কিন্তু আমাদের দ্বারা হয়ে যায়।
“আমরা করবো বলে আল্লাহ লিখেন” -এই নীতি কোরআন এবং হাদিসের সাথেও সাংঘর্ষিক যা এখন পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো,
সর্বপ্রথম কোরআনের যে আয়াত সামনে উঠে আসে,
“আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না” (সূরা তাগাবুন: ১১)
তাহলে আমাদের বুঝতে হবে আমাদের প্রতিটা কাজ যদি আল্লাহর ইচ্ছা/অনুমতি অনুযায়ী ঘটে, “আমরা করবো বলে আল্লাহ লিখেন” -এই কথাটা এখানে সাংঘর্ষিক।
এমনকি আমাদের ইচ্ছাও আল্লাহর অধীনে,
“তোমরা ইচ্ছা করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ, সমস্ত সৃষ্টির প্রতিপালক, ইচ্ছা করেন।”
—(সূরা তাকভীর: ২৯)
“কোনো বিপদই আপতিত হয় না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে পথনির্দেশ দান করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।”
—(সূরা তাগাবুন: ১১)
সুতরাং এই একটা নিতি আগে আমাদের দৃঢ় করে নিতে হবে যে,
আল্লাহর তাকদির লিপিবদ্ধ করা আমাদের কর্মের উপর নির্ভরশীল নয়!
আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা যা চেয়েছেন তাই হয়েছে এবং যা চান তাই হবে। কিন্তু কি হবে সেটা আমরা জানিনা এবং আল্লাহ আমাদের জানাতে বাধ্য নন। তাহলে আমাদের করনীয় কি সে ব্যাপারে পরে আলোচনা করছি। কিন্তু তাকদীর নিয়ে কাদারিয়ারা যে ভুল করেছে সে ব্যাপারে আক্বীদাহ শুদ্ধ করাটা আগে জরুরি বলে মনে করছি।
“যে ঈমান আনে তাকদিরের উপর—সে বুঝতে পারে যে তার জীবনে যা কিছু ঘটে তা আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারেই হয়।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৫৬)
নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
ইবনু উমার (রাঃ)-এর নিকট একটি লোক এসে বলল, অমুকে আপনাকে সালাম দিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি জানতে পারলাম, সে নাকি বিদ’আতী। সে যদি প্রকৃতপক্ষেই তা-ই হয় তাহলে আমার পক্ষ হতে তাকে সালাম বলবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছিঃ আমার উম্মতের কাদারিয়া তাক্বদীর অস্বীকারকারী আকীদা পোষনকারীদের মধ্যে ভূমিধস, চেহারা বিকৃতি ঘটবে।
হাসান, ইবনু মা-জাহ (৪০৬১)
কাদারিয়াদের নীতি অনুযায়ী যেগুলা কোরআন-হাদীসের বিপরীতে অবস্থান নেয়,
– আল্লাহ মানুষের কাজে হস্তক্ষেপ করেন না।
– মানুষ নিজেই তার ভাগ্য তৈরি করে।
– আল্লাহর নির্ধারণ (ক্বদর) নেই।
এবং এভাবেই কাদারিয়ারা আল্লাহর রুবুবিয়াতকে অস্বীকার করে।
রুবুবিয়াত মানে হচ্ছে আল্লাহ যা বান্দার প্রতি দান করেন বা যা ঘটান। যেমন, আল্লাহ ক্ষমা করেন, দয়া করেন, রিজিক দেন, জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করেন, ইত্যাদি। এসব আল্লাহর একক ইচ্ছায় হয়, কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় না।
তাকদির (নিয়তি) আল্লাহর রুবুবিয়াতের অংশ, তাই “আমরা করবো বলে আল্লাহ লিখেন” বলা ভুল, বরং আল্লাহ যা লিখেছেন, তাই আমরা করবো।
তাহলে লেখার শুরুতে ইসলামি দায়ীর কাছে যে প্রশ্ন করা হয়েছিলো সেগুলা আবার উঠে আসে,
১/ যদি আল্লাহ লিখেছেন বলেই আমরা করি তাহলে আমাদের কেন খারাপ কাজের জন্য গুনাহ হবে?
২/ আর সেই গুনাহের জন্য আমাদের কেন শাস্তি হবে?
এই প্রশ্নের জবাব জানতে হলে এবার আমাদের উলুহিয়াত সম্পর্কে জানতে হবে। উলুহিয়াত হচ্ছে রুবুবিয়াতের উল্টো। অর্থাৎ বান্দা যা আল্লাহর প্রতি করে। যেমন, বান্দা ইবাদত করে, দোয়া করে, তাওয়াক্কুল করে ইত্যাদি।
এখানেই বান্দার স্বাধীনতা রয়েছে। বান্দা যদি শিরক বা কুফর করে, তবে সে নিজের ইচ্ছাতেই করে, আল্লাহ তাকে জোর করে না। আবার বান্দা যদি শরিয়ত মেনে চলতে চায় তাহলে আল্লাহ সাহায্য করেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহ বলেন:
আমার বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসি।
যদি সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে দুই হাত এগিয়ে আসি।
যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।”
— (সহিহ বুখারি: ৭৫৩৬, সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫)
আগেই বলেছিলাম কাদারিয়ারা আল্লাহর রুবুবিয়াতকে অস্বীকার করে। আর জাবরিয়ারা তাওহিদুল উলুহিয়াহকে অস্বীকার করে। জাবরিয়ারা বলে, আল্লাহ যা চেয়েছেন, সেটাই হবে। তাই কেউ শিরক করলেও তা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে। এর মানে, ইবাদতের ক্ষেত্রে মানুষ দায়ী নয়। যদি শিরক, কুফর আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়, তবে মানুষ কেন শাস্তি পাবে?
“মুশরিকরা বলে, ‘যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষরা শিরক করতাম না, এবং আমরা কোনো কিছু হারাম করতাম না।’”
(সূরা আন’আম: ১৪৮)
অর্থাৎ মানুষ পুতুলের ন্যায়। অথচ আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন,
“আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও স্বাধীনতা দিয়েছেন” (সূরা আল-কাহফ: ২৯)
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সকল শিক্ষা সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। আমরা বলি, ভাগ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কর্ম। আল্লাহ যেহেতু দুটি বিষয়ই উল্লেখ করেছেন সেহেতু দুটি বিষয়ই সত্য। এদুটির সমন্বয়ে আশা ও ভয়ের মধ্যে ঈমান।
“আমি করবো বলে আল্লাহ লিখেছেন” এটা বলে কাদেরিয়াদের মত হওয়া যাবেনা। আবার “আল্লাহ লিখেছেন বলে আমি করেছি” এটা বলে জাবরিয়াদের মতও হওয়া যাবেনা।
আল্লাহ কি লিখেছেন সেটা আমি জানিনা। আর তাকদিরে কি লেখা আছে সেটা অনুসন্ধান করাও আমার কাজ নয়। এই কারনে গনক, রাশিফল ইত্যাদির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ তালাশ করা হারাম। তাকদির ইলমে গায়েব।
এই কারনে আমরা তাকদিরের প্রতি ঈমান আনবো। তাকদিরের উপর আক্বীদাহ সহিহ করে নিবো। তাকদিরের প্রতি সু-ধারনা রাখবো এবং শরিয়ত মেনে চলবো। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করবো।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“দোয়া ছাড়া অন্য কিছু তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না।”
— (তিরমিজি: ২১৩৯, ইবনু মাজাহ: ৯০)”
আবার আমি পুরো বিষয়টা সংক্ষেপে বলছি এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলছিঃ
বান্দার প্রতিটা কাজ আল্লাহ লিখে রেখেছেন।
এই যে আমি আক্বীদাহ সিরিজ লিখছি বা লিখেছি এটাও আল্লাহ আমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। অর্থাৎ বান্দার প্রতিটা কাজ পূর্ব নির্ধারিত।
কিন্তু শরিয়তের দিক থেকে আমরা স্বাধীন। তাই আমরা যেটা করবো,
১/ যদি নেকীর কাজ হয়, শুকরিয়া আদায় করবো। শুকরিয়াতে আল্লাহ আমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দিবেন।
আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের (নেয়ামত) বৃদ্ধি করবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।”
— (সূরা ইবরাহীম: ৭)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“আল্লাহ যে বান্দার প্রতি কোনো নেয়ামত দান করেন এবং সে আলহামদুলিল্লাহ বলে, তবে সে যা পেয়েছে তার চেয়েও উত্তম কিছু পায়।”
— (ইবনু মাজাহ: ৩৮০৫, সহিহ আল-জামি: ২৪২৮)
২/ যদি গুনাহের কাজ হয়, তওবা করে নিবো। আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ বলেন:
“হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছো (গুনাহ করেছো), তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
— (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
৩/ যদি কোন কাজ বিপদের কারণ হয়, আল্লাহর ফয়সালাতে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
— (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।”
— (সূরা আয-যুমার: ১০)
এবার আমি তাকদীরের বিষয়টা একটু ভিন্ন আঙ্গিকে আরেকবার উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো। কারন নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো আমার সামনে এভাবেই এসেছে। তাই আশা করছি এই বাস্তব প্রশ্নগুলো অনেকের মাঝেই বিরাজ আছে এবং এভাবে বুঝলে হয়তোবা তাকদীরের বিষয়টা আরো সহজ ও সুন্দরভাবে বুঝতে সুবিধা হবে। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিক।
মানুষের খারাপ কর্ম কি আল্লাহ তাকদীরে লিখেন? যেমন,
একটা মানুষ যিনা করলো। এই কাজটা কি তাঁর তাক্বদীরে লিখা ছিলো?
উত্তরঃ হ্যাঁ এটা তাক্বদীরে লিখা ছিলো বিধায় সে করেছে।
প্রশ্নঃ তাহলে এই কর্মের জন্য সে কেন শাস্তি পাবে?
উত্তরঃ কারন সে এই খারাপ কর্মেকে আল্লাহর উপর দোষ চাপিয়েছে এবং আল্লহর কাছে ক্ষমা চায়নি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা ভালো কাজের কৃতিত্ব নিজেদের উপর নেয়ার পরিবর্তে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা বিশ্বাস করে যে, কোনো ভালো কাজ করার তৌফিক আল্লাহই দেন। যেমন কুরআনে এসেছে:
“আর তোমাদের কাছে যত নেয়ামত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।” (সূরা নাহল: ৫৩)
অন্যদিকে, তারা যখন কোনো পাপ করে, তখন সেটিকে নিজের দুর্বলতা, প্রবৃত্তির প্ররোচনা বা শয়তানের ধোঁকা হিসেবে দেখে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) পাপের পর বলেছিলেন:
“হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।” (সূরা আরাফ: ২৩)
আর শয়তান আদম (আ.)-কে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল, এবং এটি তার অহংকার ও অবাধ্যতার কারণেই হয়েছিল। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“আমি যখন ফেরেশতাদেরকে আদমকে সেজদা করতে বললাম, তখন তারা সেজদা করল, কিন্তু ইবলিস করল না; সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” (সূরা বাকারা: ৩৪)
এখানে পার্থক্য হলো—শয়তান তার গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়নি, বরং অহংকার করেছে, আর আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) তাদের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। আল্লাহর পরীক্ষা ঠিক এই যায়গাতেই।
এবং এখানেই মানুষের ইচ্ছা শক্তি(Free will) কাজ করে। অর্থাৎ মানুষের কর্ম তাকদীরের মাধ্যমে আগে থেকে নির্ধারিত। কিন্তু শরিয়া বা আল্লাহর বিধানে মানুষের ইচ্ছা শক্তি আছে। আর শরিয়া হচ্ছে,
১/ যদি নেকীর কাজ হয়, শুকরিয়া আদায় করবো।
২/ যদি গুনাহের কাজ হয়, তওবা করে নিবো।
৩/ যদি কোন কাজ বিপদের কারণ হয়, আল্লাহর ফয়সালাতে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
প্রশ্নঃ তাহলে এই ইচ্ছা শক্তির দ্বারা আমরা যে কাজটা করবো, অর্থাৎ শরিয়া মানবো কি মানবোনা, এটাও কি তাকদিরে লিখা আছে? আর তাকদিরে যদি আমাদের শরিয়াত মানা না মানার কথাও লিখা থাকে তাহলে আমারা কেন এর জন্য দায়ী থাকবো?
উত্তরঃ তাকদিরের প্রতি সু-ধারনা রাখবো এবং শরিয়ত মেনে চলবো। আল্লাহ কারও গোমরাহী তাকদীরে লিখে রাখবেন এবং এর এর জন্য তাকেই দায়ী করবেন এমন যুলুম আল্লাহ করেবেন না নিশ্চই। বরং আল্লাহ বলেছেন,
“তোমাদের রব যদি চাইতেন, তাহলে পৃথিবীর সবাই ঈমান আনত।” (সূরা ইউনুস: ৯৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাওয়াতাআলার যদি ইচ্ছা হতো, তাহলে তিনি সব মানুষকে জোরপূর্বক ঈমানদার বানিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ তিনি মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (free will) দিয়েছেন—যেন তারা নিজেরাই ভালো-মন্দ বেছে নিতে পারে।
আল্লাহ আরো বলেনঃ
“আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চান, তার হৃদয় ইসলামের জন্য খুলে দেন। আর যাকে বিভ্রান্ত করতে চান, তার হৃদয় সংকীর্ণ করে দেন।” (সূরা আনআম: ১২৫)
অর্থাৎ আল্লাহ এটা তখনই করেন যখন মানুষ নিজের খারাপ নিয়ত ও গুনাহর প্রতি অনুরাগ দেখায়। আল্লাহ কাউকে জোর করে বিভ্রান্ত করেন না। মানুষ আগে থেকে নিজের গোমরাহির পথ বেছে নেয়, তখন আল্লাহ তাকে সে পথেই ছেড়ে দেন।
রাসুল (ﷺ) বলেছেন:
“তোমরা আমল করো, কারণ প্রত্যেকের জন্য যে পথ নির্ধারিত হয়েছে, তাকদীর তাকে সেই পথেই পরিচালিত করবে।” (সহিহ বুখারি: ৬৬০৫, সহিহ মুসলিম: ২৬৪৭)
অর্থ: তাকদীর জানার দায়িত্ব আমাদের নয়, আমাদের কাজ হলো সঠিক কাজ করা।
নোটঃ তাকদীর তালাশ করা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ ও ঘৃণিত কাজ। রাসুল (ﷺ) বলেন:
“যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে তার কথা সত্য বলে, সে মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর অবতীর্ণ ধর্মকে অস্বীকার করল।” (সহিহ মুসলিম: ২২৩০)
প্রশ্নঃ তাকদীরে লিখা আছে বিধায় আমারা কাজটা করছি। তাহলে ভালো কাজের জন্য আল্লাহ কেন কৃতীত্ব নিবেন এবং খারাপ কাজের জন্য আমরা দায়ী হবো?
উত্তরঃ কারন আল্লাহ তাকদীর লিখেছেন। কিন্তু আমরা কাজটা করার ইচ্ছা পোষন করেছিলাম এবং সেদিকে অগ্রসর হয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে সেই কাজ থেকে আটকাননি এবং তিনি এই কাজটা হওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন। সুতরাং আমরা ঐ খারাপ কাজটা করেছি তাই আমরাই এর জন্য দায়ী হবো। আর খারাপ কাজ থেকে ফিরে আসার সামর্থ আমাদের নাই।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তথ্য সে (যুলায়খা) তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হতো, যদি না সে তার প্রতিপালকের স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পেত। এভাবেই আমি (আল্লাহ) তাকে মন্দ ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখলাম। নিশ্চয়ই, সে ছিল আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ইউসুফ: ২৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ
“আমি কুরাইশ তরুণদের মতো একবার মক্কার একটি অনুষ্ঠানে যেতে চেয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল যে, অন্য তরুণদের মতো আমিও সেই আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহণ করবো। কিন্তু যখন আমি সেখানে যাচ্ছিলাম, তখন আল্লাহ তাআলা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন এবং আমি তখনই জেগে উঠলাম, যখন সূর্য উঠে গিয়েছিল। এরপর আমি আর কখনো সেই ধরনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার চেষ্টা করিনি।”
ইমাম ইবনে হিশাম তাঁর সীরাতুন নবী গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা নবিজিকে ﷺ শৈশব থেকেই বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছেন এবং তাকে অনৈতিক কাজ বা জাহেলি যুগের খারাপ অভ্যাস থেকে রক্ষা করেছেন।
প্রশ্নঃ আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা আমাদের তাকদীরে খারাপ কিছু কেন লিখবেন?
এখানে আমরা সূরা কাহাফ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আসহাবে কাহাফের যুবকদল চেয়েছিলো গোপন থাকতে, কিন্তু আল্লাহ তাদের প্রকাশ করে দিলেন। স্পষ্টতই তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। এতে কি তারা হতাশ হয়ে পড়েছিলো? একদমই না।
তারা জানতো— তাদের পরিকল্পনা নয়, আল্লাহর পরিকল্পনাই পরিপূর্ণ। তাদের কাজ কেবল চেষ্টা করে যাওয়া আর তারা তাই করেছে। বাকিটা তো আল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই হলো আর সেটাই ছিলো তাদের জন্য কল্যাণকর।
আমরাও জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করবো। চেষ্টা করবো। কিন্তু, এটা ভাববো না যে— আমার চাওয়া মতোই সবকিছু হবে বা হতে হবে। আমার সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমি যা চাচ্ছি, সেটা আমার জন্য কল্যাণের না-ও হতে পারে। আমার জন্য কোনটা কল্যাণের, সেই জ্ঞান কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালার কাছেই আছে। তাই, আমি আমার পক্ষ থেকে চেষ্টা করবো এবং আল্লাহর ওপরে তাওয়াক্কুল করবো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা যে ফলাফলই আমার জন্য বাছাই করবেন, আমি মেনে নেবো যে— ওটাই আমার জন্য কল্যাণের যদিও আমার সীমিত জ্ঞান আর চিন্তা তা বুঝতে অপারগ।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলার সময় ‘ইনশাআল্লাহ’ বলবো। নবী (ﷺ)-কে এই ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, “আমি কাল বলে দেব।” কিন্তু তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলেননি, ফলে ওহি আসতে ১৫ দিন বিলম্ব হয়। এরপর আল্লাহ নির্দেশ দেন:
“কোনো কিছু সম্পর্কে বলো না, ‘আমি কাল এটি করব’ – ইনশাআল্লাহ না বলে।” (সূরা কাহাফ: ২৩-২৪)
প্রাসঙ্গিক কিছু দলিলঃ
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, “আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো”। বরং সে যেন বলে, “আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো”।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২১১৭
হাদিসের মান: হাসান সহিহ
“তোমরা যা চাও, তা তখনই সম্ভব যদি আল্লাহ চান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আল-ইনসান (৭৬:৩০)
আবূ আয্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা’আলা কোন জায়গায় কোন বান্দাহর মৃত্যু হওয়া অবধারিত করেন তখন তার জন্য সেই জায়াগায় যাওয়ার প্রয়োজন সৃষ্টি করে দেন।
জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২১৪৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
নবী ﷺ বলেছেন:
“যদি তোমার কোনো বিপদ ঘটে, তবে বলবে না— যদি আমি এটা করতাম, তাহলে এমন হতো বা তেমন হতো; বরং বলো: ‘قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ’ (আল্লাহ্ নির্ধারণ করেছেন, আর তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই করেন)। কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের দ্বার খুলে দেয়।”
সহিহ মুসলিম (হাদিস নম্বর: ২৬৬৪)
২টি রিলেটেড পোস্ট পড়ে নিতে পারেনঃ
Leave a Reply