ঈমান অর্থ ছোটবেলা থেকে আমরা পড়ে এসেছি ‘বিশ্বাস’। কিন্তু ঈমান অর্থ স্বীকৃতি দেয়া। ঠিক যেমন ঈমানের বিপরীত কুফর অর্থ অস্বীকার করা।

ঈমান এর শাব্দিক অর্থ শুধু ‘বিশ্বাস’ বললে এর পরিপূর্ণ অর্থ দাঁড়ায় না। কারন ‘বিশ্বাস’ সব ধর্মের মানুষের মাঝে আছে। এমনকি নাস্তিকদেরও একটা বিশ্বাস আছে, সেটা হচ্ছে – ‘কোন সৃষ্টিকর্তা নেই’। শিশু এবং পাগল ছাড়া সব মানুষের মধ্যে বিশ্বাস আছে। সুতরাং ঈমান অর্থ ‘বিশ্বাস’ বললে সকল বিশ্বাসই দ্বীনের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

ঈমান (الإيمان) তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:

১. অন্তরে বিশ্বাস – আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, কিয়ামত ও তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।

২. মুখে স্বীকৃতি – অন্তরের বিশ্বাসের সাথে সাথে তা মুখে প্রকাশ করা, যেমন কালিমা শাহাদাহ পাঠ করা।

৩. কর্মে প্রতিফলন – ঈমান অনুযায়ী আমল করা, যেমন সালাত আদায় করা, সৎকাজ করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি।

যদি কেউ মুখে ইসলাম স্বীকার করে কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস না থাকে, তাহলে সে মুনাফিক (কপট মুসলিম)। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“লোকদের মধ্যে কিছু আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মু’মিন নয়।” — (সূরা আল-বাকারা: ৮)

আবার যদি কেউ অন্তরে বিশ্বাস করে কিন্তু মুখে স্বীকার না করে, তাহলে সে প্রকাশ্যে মুসলিম গণ্য হবে না। যেমন, আবু তালিব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সত্যতা বিশ্বাস করতেন, কিন্তু কখনো কালিমা শাহাদাহ উচ্চারণ করেননি, তাই মুসলিম হতে পারেননি।

আর কর্মের মধ্যে বাধ্যতামূলক কর্ম (ফরজ আমল), যা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। যেমন—সালাত পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“আমাদের ও কাফেরদের মধ্যে পার্থক্যকারী বিষয় হলো সালাত; যে তা ছেড়ে দিল, সে কুফরি করলো।” (তিরমিজি: ২৬২১)

জাহমিয়া (الجهيمية) ফেরকার অনুসারীরা ঈমানকে শুধু “অন্তরের বিশ্বাস” হিসেবে ব্যাখ্যা করত। তারা বলত যে, কেবল অন্তরে বিশ্বাস থাকলেই ঈমান সম্পূর্ণ হয়, মুখে স্বীকৃতি বা আমল (কর্ম) ঈমানের অংশ নয়।

তাদের এই মতবাদ ইসলামি আকিদার মূলধারার (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ) বিপরীত, কারণ কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ঈমান হল অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং আমল দ্বারা প্রকাশ।

সাহাবা, তাবিয়িন ও চার মাযহাবের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমাদ) সবাই বলেছেন যে, আমল ঈমানের একটি অপরিহার্য অংশ। মুরজিয়া ও জাহমিয়ারা এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করত এবং বলত যে ঈমান শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম।

পরবর্তীতে আশআরি ও মাতুরিদিরা ঈমানকে অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। এবং এই কারনে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মুসলিম আশাআরি এবং মাতুরিদি আক্বীদাহের প্রভাবে সালাত, রোজা, এবং যাকাত ত্যাগ করার পরেও ঈমান আছে বলে দাবি করে।

অথচ হাদিসে বলা আছে,
“তিনটি বিষয় হল মুসলিম এবং কাফিরের মধ্যে পার্থক্য: সালাত, রোজা, এবং যাকাত।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩১৭৬)

আক্বীদাহ ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্যঃ-
শাব্দিক অর্থে আক্বীদাহ অর্থ বিশ্বাস আর ঈমান অর্থ আগেই বললাম – ‘স্বীকৃতি প্রদান করা’।

আক্বীদাহ শব্দটি একটি ইসিম। এটি কোনো ক্রিয়া বা কর্ম বোঝায় না, বরং এটি একটি অবস্থা বা ধারণা নির্দেশ করে—অর্থাৎ একজন ব্যক্তির বিশ্বাস বা ঈমানের মূল ভিত্তি(বিস্তারিত দেখুন ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ২০ –এ।

আক্বীদাহ অনেক বড় ও ব্যাপক পরিসরের একটি ধারণা। এই কারনে আক্বীদাহ বুঝাতে গিয়ে পূর্বের অনেক সিরিজে আমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস তথা আক্বীদাহ ব্যাখ্যা করেছি। যেমন, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান – হিন্দুদের বিশ্বাস তথা আক্বীদাহ। কিন্তু ঈমান শুধুমাত্র মুসলিমদের পরিভাষা। ঈমান শুধুমাত্র একজন মুসলিমের মধ্যেই থাকে।

আমলের উপর ভিত্তি করে ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়। কিন্তু ভুল আক্বীদাহ গ্রহনের ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঈমান আর থাকেনা। এই কারনে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আক্বীদাহ না শিখলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবার চান্সই বেশি। কেননা বাংলাদেশে সুফি এবং আশআরি-মাতুরিদিদের বিশাল প্রভাব রয়েছে, বিস্তারিত দেখুন ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ১২-তে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *