আধুনিক বিশ্বে’র রাজনৈতিক ও সামাজিক গঠন / শেপ তৈরী’র পেছনে মূল কারিগর সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দী’র এনলাইটেনমেন্ট যুগ বা রেনেসাঁ।
এর আগেও মানুষ নানাসময়েই নানা সভ্যতা’র জন্ম দিয়েছে, এবং আলোকিত হয়েছে। কিন্তু সেসবের ভিত্তি বা উৎস ছিল ধর্ম। ইশ্বরে’র নামে বিশেষ কিছু মানুষে’র নেতৃত্বে পুরোনো কালচার বদলে ফেলে নতুন বিশ্বাস ও কালচার স্থাপনে’র মাধ্যমে সভ্যতা এগিয়েছে। ব্যাক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনের প্রধান চালিকাশক্তিই ছিল ধর্মবিশ্বাস, ধর্মে’র বিধিনিষেধ ও ধর্মীয় আইনকানুন।
সমাজ চলতো ইশ্বরে’র প্রতিনিধি একজন নেতা ও পরবর্তীতে তার পরিবারের নেতৃত্বে এবং ধর্মবিশেষজ্ঞদের সাহায্যে। সাধারন মানুষ ইশ্বরের নামে নেতা ও ধর্মবিশেষজ্ঞদের কথা মানতো।
কিন্তু ৬ষ্ট শতাব্দি’র ইসলাম আগমনের পর আর নতুন কোন ধর্ম আসে নাই। সামাজিক বিবর্তনের ধারায় সমাজ ও মানুষের মানসিকতা’র পরিবর্তন এলে পুরাতন ধর্মগুলো’র অনুশাষনে’র ভেতরও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। এবং মতপার্থক্য তৈরী হয়। যেহেতু সবাই ইশ্বরের নামে কাজ করছে কিন্তু সমাজে ইশ্বর নিজে অনুপস্থিত তাই একে অপরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্ম নেয় এবং সব পক্ষই নিজেকেই সঠিক দাবী করে।
নবীন ও তাজা আদর্শে’র মুসলিমদের কাছে খ্রিষ্টানদের পরাজয় ঘটে। অটোমান সাম্রাজ্যে’র কাছে অর্ধেক ইয়োরোপ হারানো ইয়োরোপে খ্রিস্টানরা নিজেরা নিজেরা দলে ভাগ হয়ে যায়। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্টদের মাঝে ঝগড়া এতটাই চুড়ান্ত হয় যে ৩০ বছর ধারাবাহিক যুদ্ধ পর্যন্ত হয়।
এমন অবস্থায় ইয়োরোপীয়ান সমাজে’র সামনে এগিয়ে যাবা’র জন্য একটাই পথ ছিল তা হলো নতুন কিছু গ্রহন / ধারন করা। কম্পিউটারের যেমন রিফ্রেশ লাগে তেমনই ইয়োরোপে’র দরকার ছিল রিফ্রেশ বাটন পুশ করা।
আর ঐটাই করা হয় ১৭ ও ১৮ শতকে, ঐ সময়টাতে কিছু দর্শন প্রতিষ্ঠা পায়। ওগুলো একত্রিত করলে সংক্ষেপে আমরা যা দেখি তাই হচ্ছে এনলাইটেনমেন্ট!
ভলতেয়ার, ইমানুয়্যাল কান্ট, রুশো, কার্ল মার্ক্স, প্রুদোঁ, এ্যাডাম স্মিথ, জন স্টুয়ার্ট মিল, বেন্থেম, হবস, লকে’র সেই সময়টাতে ইয়োরোপ জুড়ে গড়ে উঠে কাগজে-কলমে এক বিপ্লব যা মূলত ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ ও জার্মান প্রভাবিত! মানুষের চিন্তা চেতনায় পার্থক্য তৈরী করা বিপ্লব। খ্রিস্টধর্ম গ্রহনে’র পর দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত ইয়োরোপে খ্রিস্টান ধর্মে’র বিভাজন তৈরী হয় এবং দুইপক্ষে’র মাঝে চলে ৩০ বছরের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ঐ যুদ্ধে’র পর ইয়োরোপ জুড়ে বুদ্ধিজীবিদের মাঝে সমাজ পরিবর্তনে’র তীব্র আকাঙ্খা জেগে উঠে, ঐ আকাঙ্খা’র ফলেই মানুষে’র চিন্তা চেতনায় আসে পরিবর্তন, আসে রেনেসাঁ বা এনলাইটেনমেন্টে’র যুগ। আলোকিত হবার সময়!
এনলাইটেনমেন্টে’র মূল আদর্শগুলোই সহজ ভাষায় সবার সাথে শেয়ার করবো এই পোস্টে, যেন আমরা সবাই বর্তমান বিশ্বে’র প্রতিষ্ঠাতা এই গুরুত্বপূর্ণ সময় / অধ্যায়টা’র সম্পর্কে বেসিক কিছু জানি।
এনলাইটেনমেন্টে’র মূল আদর্শগুলো হচ্ছে,
– মানবতাবাদ— সবকিছু’র চুড়ান্ত লক্ষ্য মানুষে’র ভাল। মানুষের কল্যাণই সর্বোচ্চ কাঙ্খিত। যে কোন কিছু এমনকি ধর্মে’র চেয়েও মানুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনটা ছিল সবচাইতে রেভ্যুলুশনারী। আগে রাষ্ট্র ও সমাজজীবন পরিচালিড় হতো ইশ্বরে’র সন্তুষ্টি’র জন্য, কিন্তু এই মানবতা’র আইডিয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র ও সমাজজীবন পরিচালনা’র মূল লক্ষ্য ইশ্বরের সন্তুষ্টি অর্জন থেকে বদলে যেয়ে হয়, মানবকল্যাণ।
– র্যাশনালিজম / যুক্তিবাদ— এর আইডিয়া হলো, মানুষ প্রাকৃতিক / চরিত্রগতভাবেই যুক্তিবাদী প্রাণী। ব্যাক্তিগত জীবনে মানুষ যুক্তি এবং কার্যকারন দ্বারা পরিচালিত হয়। এবং যুক্তি ও বিজ্ঞান এর ব্যাবহারে’র মাধ্যমেই মানুষের পক্ষে সব অজানা’কে জানা এবং সবার জন্য কল্যাণমূলক কিছু করা সম্ভব। বিশ্বাসে’র প্রতিস্থাপন হয় যুক্তি’র দ্বারা।
– সেক্যুলারিজম — ধর্ম মানুষের প্রাইভেট লাইফে’র শান্তি এবং দর্শনের উৎস হতে পারে কিন্তু পাবলিক লাইফ’কে গাইড করার জন্য সর্বোত্তম নয়। ৩০ বছরের যুদ্ধে’র ভয়াবহতা সবার মনে থাকায় সমাজ জীবন নিয়ন্ত্রনে একটি নির্দৃষ্ট ধর্ম সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না এটা ঐ সময়ে’র বুদ্ধিজীবি মানুষেরা বুঝতে পেরেছিল। তাই ধর্মীয় আইনে’র রিপ্লেসমেন্ট করা হয় ধর্মনিরপেক্ষ আইনের দ্বারা (নিরপেক্ষ মানে ধর্মবিরোধী নয় কিন্তু)। লক্ষ্য, সব মানুষ পাবলিক লাইফে একটা নিরপেক্ষ আদর্শ মেনে চলে, যেন বিশ্বাসে’র কারনে তৈরী হওয়া অসমাধানযোগ্য আবেগী সংঘর্ষ এড়িয়ে যেয়ে সমস্যা হলে তা যুক্তি’র মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হয়।
– প্রগ্রেসিভিজম / প্রগতিবাদ — মানুষের ইতিহাস প্রগতিশীলতার ইতিহাস। জঙ্গলে থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহর এভাবেই সব সেক্টরেই দেখা যায় মানুষ দিন দিন প্রগতি’র পথেই চলেছে। যেকোন সেক্টরেই দেখা যায় মানুষ আগে’র তুলনায় বর্তমানে ভাল অবস্থানে আছে। এই আইডিয়াটার প্রতিষ্ঠাও রেনেসাঁ’র যুগে। এটা সার্বিক সমাজ সম্পর্কে একধরনের ইতিবাচক ধারনা ছড়িয়ে দেয়। মানুষের কল্যাণে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে ইতিবাচক উন্নতি করা’র ধারনা প্রতিষ্ঠায় প্রগতিবাদের অবদান।
– ইউনিভার্সালিজম / বিশ্বজনীনতা — এর ধরনা হলো যে সংস্কৃতি- বর্ণ বা ধর্মে’র পার্থক্য স্বত্ত্বেও বিশ্বজুড়েই মানুষের একক স্বত্ত্বা রয়েছে। একই পরিচয় বহন করছে সবাই, মানুষ। এবং দুনিয়া’র সব মানুষই একই রকম এবং সমান। যেহেতু মানুষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যৌক্তিক, নিরপেক্ষ এবং ইতিবাচক সেহেতু দুনিয়ার ভেতর বসবাসকারী সব মানুষ’কে নিয়েই সামগ্রিক উন্নয়ন কাম্য। সার্বজনীনতা বা বিশ্বজনীনতাই (ইউনিভার্সালিজম) গ্লোবালিজমে’র উৎস।
এই আইডিয়াগুলোই এনলাইটেনমেন্টে’র প্রধান ফসল। যা ধর্ম, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যাবস্থা এবং রাজনীতি’কে চুড়ান্তভাবে প্রভাবিত করেছে। এবং সমগ্র বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছে। মানবতা, যৌক্তিকতা, নিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা বর্তমান বিশ্বে’র আইন, সংস্কৃতি, ধর্ম সবকিছুরই মূলে। যেসব দেশে এনলাটেনমেন্ট হয়েছিল তারাই সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বশাষন করছে। অবশ্যই তার জন্য সামরিক শক্তিও সাহায্য করেছে কিন্তু মূলে ছিল এনলাইটেনমেন্টে’র আদর্শগুলোই। বর্তমান বিশ্বে দেখা, লিবেরালিজম ও সোশ্যালিজম এনলাইটেনমেন্ট যুগের ডাইরেক্ট রেজাল্ট।
আদিম যুগে’র পর মানুষ ধীরে ধীরে সামন্তবাদী সমাজ তৈরী করে, ধর্ম এবং ইশ্বরে’র প্রতিনিধিরা শাষনভার গ্রহন করে। ক্ষমতা থাকে মূলত কয়েকটি পরিবারে’র ভেতরই সীমাবদ্ধ।
এনলাইটেনমেন্ট প্রভাবিত ফরাসী বিপ্লবে’র সাথে সাথে পৃথিবী’র ইতিহাসে প্রথমবারে’র মত প্রতিষ্ঠিত হয় সাধারন মানুষে’র শাষন। দুনিয়া’র বুকে গণমানুষের শাষন প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, মানুষ এনলাইটেন্ড বা আলোকিত হবা’র পরেও দুনিয়ার বুকে অন্যায় অপশাষন টিকে আছে। অত্যাচার ও অবিচার আছে। কিভাবে?
কারন সবকিছুরই ২টা দিক থাকে, ভাল-মন্দ, আলো-অন্ধকার, তেমনি এনলাইটেনমেন্টে’র যুগেও শুধু এনলাইটেনমেন্টে’র তত্ত্বই প্রতিষ্ঠিত হয় নাই এর পাশাপাশি ছিল অস্ট্রিয়ান-জার্মান প্রভাবিত হের্ডের, মাইস্ত্রে, গ্যাব্রিয়েল ডি বোনাল্ড, স্যাড ও গোবিন্যু’র আদর্শে’র কাউন্টার এনলাইটেনমেন্ট। ন্যাশনালিজম, ফ্যাশিজম, এলিটিজমের মত আদর্শের জন্মদাতা আইডিয়ালিস্টেরা। যারা এনলাইটেনমেন্টে’র আদর্শগুলো’র সাথে তীব্র বিরোধীতা করে গেছে, কখনো জয়ী হয়েছে, হেরেছে কিন্তু আজো সমাজে ও বিশ্বে টিকে আছে!
Leave a Reply