আমরা এমন এক জগতে বাস করি যা তথ্য দ্বারা পরিপূর্ণ তাইনা? কিন্তু এই তথ্য নিজেই এক বিমূর্ত বিষয়। এর কোন বস্তুগত উপকরণ নেই। যেমন ২+২ = ৪, এই ৪ সংখ্যাটা দিয়ে আমার বস্তুগত কোন কিছু মিলছেনা। আমি যদি এই ৪ দিয়ে ৪টা ডিম নিয়ে আসতে পারতাম তাহলে এগুলো খেয়ে আমার নিউট্রিশনের চাহিদা পূরণ হতো তাইনা? তাহলে বুঝা গেলো, তথ্যের বস্তুগত বাহক রয়েছে কিন্তু এর নিজস্ব বস্তুগত উপাদান নাই।
আবার, আমি এই মূহুর্তে আপনার সাথে তথ্যের মাধ্যমে যোগাযোগ করছি। আবার আপনি এই তথ্য নিয়ে আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোন বস্তুগত(পদার্থ) কোনকিছু যাচ্ছেনা। সুতরাং আমি বা আপনি তথ্য আদান প্রদান করছি এক বস্তুগত বাহক হিসেবে। কিন্তু বস্তুগত কিছু আমি বা আপনি দিচ্ছিনা বা পাচ্ছিনা।
এখন যে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, এই তথ্য আমরা কোথা থেকে পাই? আমার লেখা এই ক্ষুদ্র আর্টিকেলেটি যেভাবে সুবিন্যস্ত ও সুনির্দিষ্ট তথ্য হিসেবে নিজে নিজে টাইপ হয়নি, তেমনি এই তথ্যপূর্ণ জগতটাও না!! আমরা যখন সৃষ্টির দিকে তাকাই তখন দেখি সুশৃঙ্খলা। দেখি কতগুলো স্বতন্ত্র সূত্র কিংবা নিয়মের সমাহার। দেখি গণিত, ভূগোল এবং এরূপ আরো চমকপ্রদ ব্যাপার। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা তাঁর অসীম জ্ঞান ও সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দ্বারা এই সমস্ত কিছু তৈরি করেছেন। যখন আমরা সৃষ্টির মধ্যে সুশৃঙ্খলা এবং নিয়ম দেখি, তখন এই তথ্য আমাদের মনে আল্লাহর জ্ঞান ও সৃষ্টির পরিকল্পনার সাক্ষ্য দেয়।
এই মহাবিশ্ব, এর সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য হল তালার ন্যায়। আর মানব মস্তিষ্ক হচ্ছে চাবির ন্যায়, যাতে আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা উচ্চতর চিন্তা ক্ষমতা দিয়েছেন। তাই তো আল্লাহ বলেছেন,
“আকাশমন্ডলী এবং পৃথিবী সৃষ্টি করার মধ্যে নিশ্চয় বিশ্বাসীদের জন্য বড় একটি নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আল-আল ইমরান, 3:190)
এই মহাবিশ্বের অনুধাবন আর এই জটিল সব গানিতিক সমাধানের মূল ভিত্তি গুলো আসছে প্রকৃতি থেকেই। এর কিছু মাথা নষ্ট উদাহরণ দেখুন ইউটিউব চ্যানেল Rational Believers এর The Divine Functions ভিডিও থেকে।
এতগুলো কথা এই কারনে বললাম, যেন আমাদের বোধগম্য হয় যে, দুনিয়াবি জ্ঞানের উৎস আসলে কি। পক্ষান্তরে ধর্মীয় বা দ্বীনের জ্ঞানের উৎস হচ্ছে কোরআন। আর এই কোরআনের বিধিবিধান মানতে হলে জানতে হবে সেই ব্যাক্তিকে যার উপর এই কোরআন নাজিল হয়েছে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি ইসলামে ধর্মীয় জ্ঞানের উৎস কোরআন এবং সুন্নাহ।
এতটুকু পর্যন্ত বেশিরভাগ মুসলিমদের ধারণা ঠিক থাকলেও এরপরে গলদ লেগে যায়। দুনিয়াবী জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা যেমনভাবে অংক কষে একটা রেজাল্ট বের করি, ধর্মের ক্ষেত্রে এভাবে রেজাল্ট বের করা সম্ভব না। এই যায়গাটাতে অনেকেই ভুল করে বসে। দুই আর দুই এর যোগফল Mathematics এ চার হয়, কিন্তু ইসলামে ৩/৫ বা অন্য কিছুও হতে পারে। যেমন, বনু কুরাইযার আসর এর উদাহরণ (সহিহ বুখারি – হাদিস নম্বর: ৪১১৯)। সাহাবায়ে কেরাম এর এক জামাত আসর কাযা করলেন আক্ষরিক অর্থ নিয়ে, আরেক জামাত আসর পড়ে নিলেন মাকসাদ (দ্রুততার সাথে পৌছার তাগীদ) কে সামনে রেখে। এক্ষেত্রে True/False একই সাথে correct result নিয়ত এর (আল্লাহ ও রাসূল সা এর ইতিয়াদ) উপর ভিত্তি করে।
দুনিয়াবী জ্ঞান যত আপডেট তথ্য হবে তত সঠিক হবে। আর দ্বীনের জ্ঞান যত পেছনের দিকে যাবে, যেতে যেতে ১৪০০ বছর পেছনে গিয়ে রাসুল (সা.) এর কাছ পর্যন্ত যাবে তত সঠিক এবং নির্ভুল হবে। আর রাসুল (সা.) বলেছেন সাহাবাগন সহ ৩ প্রজন্ম অর্থাৎ সালাফদের অনুসরন করতে। তাই আমরা সালাফদের থেকে বুঝ নিবো। ইসলামি জ্ঞানে নিজের আক্বল কিংবা যুক্তিকে প্রাধান্য দিলেই ইতিমধ্যে যত ভ্রান্ত দলের কথা উল্লেখ করলাম যে কোনটার মধ্যে যুক্ত হবার আশংকা থাকবে। তাই ইসলামী জ্ঞানের উৎস কোরআন, হাদিস এবং সালেফে সালেহীনগন।
বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। তাই সোশাল মিডিয়ায় আপনি অনেক আর্টিকেল পাবেন যেখানে ইসলামের অনেক বিষয় বিজ্ঞান দিয়ে প্রমান করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করে। এটা অনেক ওলামায়ে কেরাম অপছন্দ করেন। কারন ইসলাম সত্য প্রমানে বিজ্ঞান মাপকাঠি হতে পারেনা।
বিজ্ঞান হচ্ছে স্রেফ পর্যবেক্ষণ। উদাহরনস্বরুপ, একটা কলমকে যখন আমরা পর্যবেক্ষণ করি, তখন এর আকার-আকৃতি ইত্যাদি দিয়ে এর পরিমাপ করি। কিংবা এর ফাংশনাল দিকগুলো নিয়ে। যেমন, এর ভেতরের কালি যেভাবে একটা বলের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং সেই বল কাগজে ঘষা খেলে বলটি কালি সমেত ঘুরে এবং লেখনি তৈরি হয়.. ইত্যাদি। এগুলো হচ্ছে পর্যবেক্ষন। যা বিজ্ঞানের গন্ডিতে পরে মাত্র।
এরপর যখন কলমটাকে আমরা বাস্তব ব্যাবহারিক রুপে নিয়ে আসি তখন এর মধ্যে যুক্তি কাজ করে। যেমন কলমটাকে আমরা কেন ব্যাবহার করব? এটা কি শুধু লিখার জন্যই ব্যাবহার হবে? অন্য কাজে ব্যাবহার করা কেন যাবে / কেন যাবেনা? ইত্যাদি এগুলো সব প্রশ্নের কারন একেকটা যুক্তি। এগুলো দর্শনের গন্ডিতে পড়ে।
এরপর এভাবে কলম নিয়ে যখন আমারা অনেকগুলো কারন অকারন জেনে একটা নির্দিষ্ট কিছুতে পৌছে যাই সেটাই হচ্ছে বিশ্বাস তথা ধর্ম। আর ধর্মের বিধান শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা নির্ধারন করবেন,
সুরা ইউসুফ (১২:৪০):
“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর।”
সুরা আল-আহযাব (৩৩:৩৬):
“কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য এটি অনুমোদিত নয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তারা তাদের ব্যক্তিগত মতামত দেবে।”
Leave a Reply