আল্লাহর সিফাত (صفات الله) বলতে আল্লাহর গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যকে বোঝানো হয়। আল্লাহর সিফাত বা গুণ দুটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়: স্বত্বাগত গুণ (ذاتية صفات) এবং কর্মগত গুণ (فعلية صفات)। স্বত্বাগত গুণ বলতে সেই গুণাবলীকে বোঝানো হয় যা আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পর্কিত এবং তাঁর সত্তার অংশ। যেমন আল্লাহ আরশে আছেন এটা আল্লাহর সত্বাগত গুন।
আর কর্মগত গুণ হলো সেই গুণাবলী যা আল্লাহ তাঁর কর্ম বা ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। যেমন আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া করেন এবং তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন। ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (৬) -তে জাহমিয়া মতবাদ সম্পর্কে এবং আল্লাহর সিফাতসমূহ নিতে তাদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এরাই সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম ও গুণাবলী অস্বীকার করে রূপক হিসেবে গ্রহন করে। যেমন আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।” (সূরা আল ফাতহ: ১০)। জাহামিরা বলে, এখানে হাত বলতে শক্তি বা ক্ষমতা বোঝানো হয়েছে, এবং এটি আল্লাহর প্রকৃত হাত নয়। তবে আহলুস সুন্নাহ এ গুণটিকে প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করে, যেমনটা আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তবে কোনো কিছুর সাথে তুলনা বা تشبيه (তাশবীহ) ছাড়া।
এরপর আসে মুজাসসিমা-মুশাব্বিহা, যা আক্বীদাহ সিরিজ (৭) এ বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আল্লাহর সিফাত মাখলুকের মত যারা বলে এরা হচ্ছে মুজাসসিমা। আর মুশাব্বিহা হলো তাশবি করা, সাদৃশ্য করা, মাখলুক বা সৃষ্টির সাথে আল্লাহকে সাদৃশ্য করে ফেলেছে এরা। যেমন এরা বলে, আল্লাহর হাত আমাদের হাতের মতো, তবে আরও সুন্দর বা আরও শক্তিশালী।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত বলে,
যদি বলেন আল্লাহর হাত নাই তাহলে কুফর হবে, কারন এর দ্বারা কোরআনের আয়াত অস্বীকার করা হয়। আর যদি আল্লাহর হাতের সাথে কোন কিছু সাদৃশ্য করেন, যেমন ‘আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মত’ বলেন তাহলে হবে শিরক হবে। তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত শিরক করবেনা কুফরিও করবেনা। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন ঠিক সেইভাবে মেনে নিবে। কোন যুক্তি-দর্শন কিংবা ব্যখ্যা-বিশ্লেষন করতে যাবেনা।
আবার আল্লাহ সম্পর্কে আগ বাড়িয়ে বেশি বলা যাবেনা। যেমন আল্লাহ বলেছেন আল্লাহ শোনেন। কিন্তু আল্লাহ বলেন নাই যে আল্লাহর কান আছে। এবং আল্লাহর শোনা আমাদের শোনার মত নয়।
আবু হানিফা র. বলেন:
আমরা আল্লাহকে এমনভাবেই বর্ণনা করি, যেভাবে তিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন। আমরা তাঁর সম্পর্কে শরীর বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা বলি না এবং তাঁর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের সঙ্গে তুলনা করি না।
এখানে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে:
আল্লাহর সিফাতকে কুরআন ও সুন্নাহতে যেমন বলা হয়েছে, ঠিক তেমনভাবেই মেনে নিতে হবে। এই সিফাতের প্রকৃতি বা ধরন নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। আমরা আল্লাহর সিফাত বিশ্বাস করি, তবে কীভাবে তা কার্যকর হয় বা তার প্রকৃতি কেমন—তা আমাদের বোধগম্যের বাইরে। আল্লাহর সিফাত সৃষ্টির সিফাতের মতো নয়। ইমাম আবু হানিফা এখানে “তাশবিহ” বা তুলনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর গুণাবলিকে আমরা মানুষের বা সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা করতে পারি না।
.
কিছু গোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে পৃথিবীতে বিশেষ কিছু লোক, যাদের গাউস, কুতুব, আবদাল ইত্যাদি বলা হয়, তারা আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছে এবং দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা করে। যেমন, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী। এই ধরনের শিরকি আক্বীদাহ এসেছে সুফিবাদ থেকে। যা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ১৩ তে। অথচ আল্লাহ বলেন,
“জেনে রাখ, সৃষ্টি এবং পরিচালনা একমাত্র তাঁরই।” – সূরা আল-আ‘রাফ: ৫৪
.
আল্লাহর সিফাত সমূহ হচ্ছে গায়েবী জিনিস। যা আমারা দেখিনা এবং দেখতেও পারবোনা। সুতরাং এই গায়েবী জিনিস সম্পর্কে জানার একমাত্র পথ হচ্ছে ওহী। আর মানতেক বা যুক্তি-দর্শন হচ্ছে যুক্তি দিয়ে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা, পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা বা বোধগম্য করা।
.
আশআরি অনুসারিরা সালাফদের থেকে আল্লাহর সিফাত তাওয়িল করা হয়েছে বলে কিছু দলিল পেশ করে। নিচে এগুলা উল্লেখ করা হলো,
১. আয়াত: “وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ” (সূরা যারিয়াত: ৪৭)
আক্ষরিক অর্থ: “আমরা আকাশকে শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “আইদিন” দ্বারা বোঝানো হয়েছে “শক্তি এবং ক্ষমতা।” (তাফসিরে কুরতুবি ১৭/৫২)
এটি তাওয়িল নয়। কারণ এখানে “أيدٍ” শব্দটি আরবি ভাষায় মাসদার হিসাবে “শক্তি” অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি “يد” (হাত)-এর বহুবচন নয়। কোরআনের ভাষাগত দিক থেকে এটি স্বাভাবিক একটি ব্যাখ্যা। উদাহরণস্বরূপ, কোরআনের অন্য জায়গায় “ذو الأيد” (শক্তির অধিকারী) ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. এখানে শব্দের ভাষাগত ও প্রসঙ্গগত অর্থ দিয়েছেন, যা তাওয়িলের পরিবর্তে একটি ব্যাখ্যা।
২. আয়াত: “نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ” (সূরা আরাফ: ৫১)
আক্ষরিক অর্থ: “তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “নাসু” দ্বারা বোঝানো হয়েছে “ভুলে যাওয়া,” যা তাদের রহমত থেকে বঞ্চিত করার ইঙ্গিত দেয়। (জামিউল বায়ান ১১/১৯৪)
আরবি ভাষায় “نسيان” শব্দের অর্থ “ভুলে যাওয়া” ছাড়াও “বর্জন করা” বা “উপেক্ষা করা” হতে পারে। আল্লাহর ক্ষেত্রে “ভুলে যাওয়া” (যা মানুষের সীমাবদ্ধতা) প্রযোজ্য নয়। তাই এখানে “نسيان” অর্থ “বর্জন করা” বা “তাদের ত্যাগ করা।”
এটি আল্লাহর সিফাতের প্রকৃত সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার জন্য প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা।
৩. আয়াত: “يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ” (সূরা ক্বালাম: ৪২)
আক্ষরিক অর্থ: “যে দিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন: এখানে “সাক” দ্বারা বোঝানো হয়েছে “ভয়াবহতা এবং কঠিনতা।” (তাফসিরে তাবারি)
আরবি ভাষায় “ساق” শব্দটি কেবল শারীরিক অংশ নয়, বরং “অত্যন্ত কঠিন অবস্থা” অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাফসিরকারকরা এখানে ভাষাগত অর্থ দিয়েছেন, যাতে আল্লাহর কোনো সিফাত বা গুণ মানবীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত না হয়। তবে এটি বিতর্কিত হতে পারে, কারণ সাহিহ হাদিসে “ساق” আল্লাহর গুণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
“আমাদের প্রভু তার ‘পায়ের নলা’ (ساق) উন্মোচন করবেন, তখন প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী তাঁর সামনে সিজদা করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সিজদা করত, তারা সিজদা করতে পারবে না। বরং তাদের পিঠ শক্ত ও সমতল হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারি, কিতাবুত তাওহীদ, হাদিস নম্বর: ৪৯১৯)
আবু সাঈদ খুদরি, ইবনু মাসউদ, ইমাম বুখারি, আবু ইয়ালা, ইবনুল কাইয়্যিম, বিন বায রাহ. প্রমুখের নিকট তা সিফাতের আয়াত হিসেবে গণ্য।
আর যারা সিফাত হিসেবে গণ্য করেন না, তারা হলেন- ইবনে আব্বাস, হাসান বসরি, মুজাহিদ, সাঈদ বিন যুবায়ের, কাতাদাহ, ইকরিমা রা. প্রমুখ।
মতভেদের কারণ হচ্ছে, কোরআনে সাক (নলা) শব্দ আল্লাহ’র দিকে এজাফত হয়ে আসে নি, যার ফলে নলা শব্দ দ্বারা আল্লাহ’র নিজের পায়ের নলা বুঝালেন না কি কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহতা বুঝালেন এ নিয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করেছেন।
এতে নলা সিফাত হওয়ার অস্বীকৃতি নয়; বরং আয়াতটি নলা সিফাত হওয়ার নির্দেশ করে কি না এ নিয়ে বিরোধ।
কিন্তু উক্ত আয়াতের তাফসিরে রাসূল সা-এর হাদিসটি সিফাত হওয়াই সুবিদিত হয়ে পড়ে এবং প্রথম পক্ষের মত শক্তিশালী প্রতীয়মান হয়। সুতরাং যারা হাদিসকে সামনে রেখে তাফসির করেছেন, তারা আয়াতের সাক-কে সিফাত মেনেছেন। আর যারা স্রেফ শাব্দিক দিক ও বর্ণনাপ্রসঙ্গ বিবেচনা করেছেন, তারা ভয়াবহতা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ, আরবি ভাষায় ভয়াবহ অবস্থা বুঝাতে সাক শব্দের ব্যবহার বেশ প্রসিদ্ধ।
যেমন বলা হয়- قامت الحرب على ساق.
★দ্বিতীয়ত- ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এ তাফসিরের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। আর যদি তা বিশুদ্ধ মেনে নেয়া হয়, তবুও তাঁর তাফসিরকে কোনোভাবেই সিফাতের তাওয়িল বলা যায় না। কেননা তারা তো আয়াতকে সিফাতের অন্তর্ভুক্তই মনে করেন নি।
আরেকটি বিষয় সবিশেষ লক্ষ্যনীয় যে, উক্ত আয়াত নিয়ে সালাফের মতবিরোধ হলেও ইবনে আব্বাস বা অন্য কোনো সালাফ সাক (নলা) আল্লাহ’র সিফাত হওয়াকে কিন্তু অস্বীকার করেন নি। এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে সক্ষম হবে না। কারণ, তা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তাদের রীতিই ছিল কোরআন ও হাদিসে আল্লাহ’র সিফাত যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই মেনে নেয়া- কোনো তাওয়িল, অপব্যাখ্যা বা উপমা নির্ধারণ না করে। কিন্তু আশ’আরি বা মাতুরিদিরা আল্লাহ’র প্রতিটি গুণের যেসব মনগড়া উসুল-মূলনীতি ও তাওয়িল-ব্যাখ্যা দাঁড় করান, তা আল্লাহ’র গুণাবলি অস্বীকারের নামান্তর।
আরবীতে মোশতারাক (مشترك) শব্দটি এমন শব্দকে বোঝায় যার একাধিক অর্থ থাকে। ساق একটি মোশতারাক শব্দ।
Leave a Reply