মানহাজ (منهج) শব্দের অর্থ হলো “পদ্ধতি, পথ, নীতি বা কর্মপদ্ধতি”।

সূরা আল মায়েদার ৪৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“প্রত্যেক জাতির জন্য আমি একটি শরিয়ত এবং পথ নির্দেশ করেছি।”

এখানে শরিয়ত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য নির্ধারিত আইন এবং বিধান। যেমন হালাল, হারাম, ইবাদত, জীবনযাপনের নীতি ইত্যদি। এবং শরিয়তের মূল উৎস হচ্ছে কোরআন এবং সুন্নাহ।

মানহাজ হলো সেই পথ বা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরিয়তের বিধান বাস্তবায়ন করা হয়। অর্থাৎ শরিয়তের উৎস(কোরআন এবং সুন্নাহ)-কে বুঝতে বা মানতে যে পদ্ধতি বা পথ অবলম্বন করতে হবে সেটাই হচ্ছে মানহাজ।

কোন মুসলিমের আক্বীদাহে বিচ্যুতি ঘটলে সে কাফের হয়ে যায়। আর মানহাজে বিচ্যুতি ঘটলে বিদআতী হয়। যেমন কেও তাওহীদ(আল্লাহর একত্ববাদ) কে অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। অথবা আর্কানুল ইসলামের কোন একটা স্তম্বকে অস্বীকার করলে সেও কাফের হয়ে যাবে, কারন এগুলো সবই আক্বীদাহের অংশ।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, …এদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তাঁর এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের উপর ঈমান না আনবে।
__সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১

মূলত এখানে বুঝানো হয়েছে কাফেরদের কোনকিছুই কবুল করা হয়না, অর্থাৎ আক্বীদাহের কোন একটা বিষয়ে গলদ থাকলে বকি সবকিছুই বাতিল হয়ে যায়। এই হাদিসটিতে নির্দিষ্ট একটা গোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে যারা তাকদির(ঈমানের একটি রোকন) অস্বীকার করেছিলা এবং পুরো হাদিসটিতে তাওহীদের মৌলিক বিষয়গুলো খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হাদিসটি আলাদাভাবে পড়ে নিবেন।

এবার বুঝার চেষ্টা করি, মানহাজের বিচ্যুতি কেমন। ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (১৩) পর্বে একটা হাদিসে ৩ ব্যাক্তির ঘটনা উল্লেখ করেছিলাম, যাদের একজন প্রতিজ্ঞা করেছিলো, সে ঘুম ত্যাগ করবে এবং সারা রাত ইবাদত করবে, আরেকজন বলেছিলো সে সারা বছর রোজা রাখবে, আরেকজন বলেছিলো সে বিবাহ করবেনা(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫০৬৩)। এই ৩টা প্রতিজ্ঞাই বাহ্যিকভাবে শুনতে খারাপ কিছু মনে না হলেও সঠিক নয়, কারন এগুলো রাসুল সা: করেন নাই বা অনুমোদন দেন নাই এবং এই কারনে এটা মানহাজের ত্রুটি। এবং এসব কাজ কেও করলে বিদআতে লিপ্ত হবে। বিদআত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে পরের পর্বে ইনশাআল্লাহ।

আবার দেখুন, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া খুবই ভালো কাজ। কিন্তু কেও যদি সংগীতের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দেয় তাহলে সেটা মানহাজের ত্রুটি। কারন এই পদ্ধতিতে রাসুল সা: কিংবা সাহাবীগন দাওয়াত প্রচার করেন নাই। এভাবে একজন মুসলিমের জীবনে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় থেকে শুরু করে প্রতিটা কাজ এমনকি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও মানহাজ ফুটে উঠবে। যেমন,

– তাকওয়া (খোদাভীতি)
– ইখলাস (বিশুদ্ধ নিয়ত)
– আদল (ন্যায়পরায়ণতা)
– সাবর (ধৈর্য)
– ইহসান (সুন্দর আচরণ)
– ইত্তেবা (অনুসরণ): প্রতিটি কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী করা। দ্বীনের ব্যাপারে নিজস্ব ধারণার পরিবর্তে নবীর দিকনির্দেশনা অনুসরণ।
– শোকর (কৃতজ্ঞতা): জীবনের প্রতিটি ভালো অবস্থার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। আল্লাহর নেয়ামতগুলোর যথাযথ ব্যবহার করা।
– তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা)
ইত্যাদি।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ(ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ৯ তে বিস্তারিত আছে) এর ২টি বৈশিষ্ট – ওয়াসাতিয়াত এবং এ’তেদাল, খুবই গুরুত্বপূর্ন বুঝার বিষয় যাতে মানহাজকে সমগ্রীকভাবে তুলে ধরা হয়েছেঃ

১. ওয়াসাতিয়াত (الوسطية) :-
“ওয়াসাতিয়াত” শব্দটি আরবি “وسط” (ওয়াসাত) থেকে এসেছে, যার অর্থ “মধ্যপন্থা”, “সমতার অবস্থান” বা “মধ্যম পথ”। ওয়াসাতিয়াত এমন একটি মানসিকতা বা জীবনধারা, যা উম্মাহর (মুসলিম সমাজ) জন্য সর্বজনীন নির্দেশনা দেয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সমষ্টিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে (ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি) একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
“এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি।”
— (সূরা আল-বাকারা, ২:১৪৩)

“এবং আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হতে পারো।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৪৩)

ওয়াসাতিয়াত আসলে শরীয়তের নির্দেশনার সাথে সম্পর্কিত। যা শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই মধ্যপন্থা। তাই যেখানে কঠোরতা প্রয়োজন, সেটিই মধ্যপন্থা, আবার যেখানে কোমলতা প্রয়োজন, সেটাও মধ্যপন্থা। কোনো বিষয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া(চরমতা) এবং প্রয়োজনের চেয়ে কম হওয়া(অবহেলা), উভয় ক্ষেত্রই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতি করে দেয়। সঠিক পথ হচ্ছে বিষয়টির দুই চরম অবস্থার মধ্যবর্তী অংশ, অর্থাৎ মধ্যপন্থা।

২. এ’তেদাল (الإعتدال):
“এ’তেদাল” শব্দটি আরবি “اعتدال” (ই’তিদাল) থেকে এসেছে, যার অর্থ “ভারসাম্য”, “মিতব্যয়িতা” বা “সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা”। ওয়াসাতিয়াত যেমন একটি সামগ্রিক দর্শন বা নীতি, সেখানে ই‘তিদাল হচ্ছে নির্দিষ্ট আচরণ বা সিদ্ধান্তে ভারসাম্য। যেমন কোন ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত সম্পদ ব্যয়ে মিতব্যয়ী হওয়া।

আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা বলেন,
“আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা থেকে পরকালের গৃহ অন্বেষণ কর; এবং তোমার দুনিয়ার অংশ ভুলে যেয়ো না। আর ভালো কাজ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ বিপর্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)

এই আয়াতে ব্যক্তিগত জীবনে ই‘তিদালের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সম্পদ ব্যয় করার সময় অপচয় না করা, আবার এমন কৃপণও না হওয়া যে নিজের প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম হয়ে যায়। আবার পরিবারের সকল সদস্যের অধিকার যথাযথভাবে পালন করা — স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মায়ের অধিকার বজায় রাখা এবং নিজের কাজের ভারসাম্য বজায় রাখা।

ওয়াসাতিয়াত এবং এ’তেদাল, দুটির অভাব হলে মানুষ চরমপন্থা(একপেশে মনোভাব) বা অবহেলার দিকে চলে যায়, যা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ কারণেই সাহাবাদের জামাত বা সালাফে সালেহিনদের জীবনধারায় এ দুটি গুণ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

.

খেয়াল করলে দেখবে, আমাদের দেশে আক্বীদাহের ক্ষেত্রে মানুষ অবহেলা করে বা শিথিলতা করে অথচ রাসুল সাঃ কিংবা সাহাবীগন আক্বীদাহের ব্যাপারে ছিলেন কঠোর। আবার আমাদের দেশের মানুষ ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে হরহামেশায়ই বিদআতে লিপ্ত। এগুলো সবই ওয়াসাতিয়াত না বুঝার কারনে।

আবার আমাদের দেশে দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে নমনীয়তা হলেও ব্যাক্তির শিষ্টাচারে গলদ যা এ’তেদাল না বুঝার কারনে।

এটি বিশুদ্ধ ভাবে প্রমানিত যে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) শুধুমাত্র প্রথমবার(তাকবীরে তাহরীমার সময়) রাফউল ইয়াদাইন করতেন(সুনান আত-তিরমিযী: হাদিস নম্বর ২৫৭)। রাসুল সা: সালাতের সময় সামনে ও পিছনে উভয়েই দেখতে পেতেন(সহিহ বুখারি: হাদিস নম্বর ৭৪১)। কিন্তু এই ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে সংশোধন করেন নাই। কারন এটা ফিকহের বিষয়।

সুতরাং যারা বলবে রাফুলইয়াদাইন না করলে নামাজ হবেনা এবং যারা বলবে রাফুলইয়াদাইন করলে নামাজ হবেনা, উভয়ই মানহাজগত ভাবে বিভ্রান্ত। আবার কেও যদি রাফুলইয়াদাইন এর হাদিস অস্বীকার করে তাহলে আক্বীদাহে বিভ্রান্ত।

একবার একজন সাহাবী রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বলেছিলেন:
“ما شاء الله وشئت”
অর্থ: যা আল্লাহ চান এবং আপনি চান.

তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সংশোধন করে বললেন:
“أجعلتني لله ندًّا؟ قل: ما شاء الله وحده”
(তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাচ্ছ? বরং বল: শুধুমাত্র আল্লাহ যা চান)।
__আহমদ ১৮৩৯, বুখারীর আদব ৭৮৩, ইবনে মাজাহ ২১১৭, বাইহাক্বী ৫৬০৩, সিঃ সহীহাহ ১৩৯নং

সুতরাং বুঝা গেলো রাসুল সা: কারো আক্বীদাহে ত্রুটি দেখতে পেলে চুপ থাকতেন না। সাথে সাথে সংশোধন করে দিতেন।

আশা করি বাস্তব কিছু উদাহরণ পেশ করার মাধ্যমে ওয়াসাতিয়াত এবং এ’তেদাল দুটি বুঝাতে পেরেছি। যে কোন বিষয়ে নিজের বুঝকে একপাশে রেখে সাফালদের বুঝ অনুসরণ করলে এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে মানহাজ বিষয়টি আরো ক্লিয়ার হবে ইনশাআল্লাহ।

.

কোন আলেম থেকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের আগে সেই আলেমের মানহাজ সম্পর্কে পরিষ্কার জেনে নেওয়া উচিৎ। যেমন তিনি আক্বীদায়ে কোন মানহাজ পোষন করেন? সালাফী নাকি আশআরী অথবা মাতুরিদি? এখানে আবার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত বললে হবেনা। কারন অনেক সুন্নী নামধারী মাজার পুজারীরাও নিজেদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত দাবি করে।

ফিকহের ক্ষেত্রে কোন মাজহাব(হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি, হাম্বলি) অনুসরণ করে।

দাওয়াহের ক্ষেত্রে কোন মাজহাব ফলো করে? ইখওয়ানুল মুসলিমীন, জামাত-ই-তাবলীগ, নাকি আহলে হাদিস?

তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে কোন মানহাজ ফলো করে? সুফিবাদ বা তাদের কোন তরিকাহ, নাকি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে?

এভাবে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ ও মানহাজের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ সুবহানাওয়াতালা আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুক। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *