সুফিবাদ (ইংরেজিতে Sufism) আরবিতে তাসাউফ (التصوف) নামে পরিচিত।
ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) তার বই “মাজমু’ আল-ফাতাওয়া” গ্রন্থে বিদআতের উদ্ভব এবং এর উৎস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ
তাবেয়ীনদের যুগের শেষের দিকে তিনটি বড় ধরনের বিদআত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে প্রবেশ করে। এগুলো হলো:
১/ রাই, শব্দটি আরবি “رأي” থেকে এসেছে, যার অর্থ মতামত বা ব্যক্তিগত যুক্তি। এই পদ্ধতিতে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সরাসরি প্রমাণ ছাড়াই মানুষের নিজের মতামত বা যুক্তির ভিত্তিতে শরিয়ত বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কুফা অঞ্চলের ফিকহ বিশেষজ্ঞরা এবং পরে হানাফি মাজহাবের কিছু অনুসারীরা এর প্রচলন করে। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) মনে করেন, এই “রাই” বা মতবাদের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করা ইসলামিক বিধানকে দুর্বল করে দেয়। তিনি মনে করেন, কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবীদের ইজমা (ঐক্যমত) অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি ইমাম মালিক (রহ.)-এর অবস্থানের পক্ষে ছিলেন, যিনি বলেছিলেন, “আমাদের শহর (মদীনা) ছেড়ে আসা মানুষের ‘রাই’ (মতামত) গ্রহণ করো না।”
২/ কালাম শাস্ত্র – যুক্তিবাদ ও তাত্ত্বিক আলোচনা। এই যুক্তিবাদে প্রাথমিকভাবে গ্রিক দর্শন (Greek Philosophy) এর সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল এবং পরে পারস্য, হিন্দু দর্শন ও মিশরীয় দর্শন সহ আরো অন্যান্য দর্শনের প্রভাবে ইসলামি আকিদা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। মুতাযিলা সম্প্রদায় এই কালাম শাস্ত্রের মূল প্রচলন করে যারা ইসলামিক দর্শনকে গ্রিক দর্শনের সাথে মিশিয়ে দেয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছি ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (৫) এ। ওয়াসিল ইবনে আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। তিনি ছিলেন হাসান বসরির শিষ্য। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই কালাম শাস্ত্র বসরা অঞ্চল থেকে আবির্ভাব হয়েছে।
৩/ তাসাউফ (সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক চর্চা) এর প্রচলক রাবেয়া আদবিয়া, হাসান বসরি এবং তাদের শিষ্যরা। এটিও বসরা অঞ্চল থেকে উৎপত্তি স্থান। এবং ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজের এই পর্বে এটা নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশালাহ।
প্রাথমিক পর্যায়ে তাসাউফ ছিল অহংকারহীন জীবন, ক্ষুধা ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করার পদ্ধতি। পরে এটি আধ্যাত্মিক তন্ত্র-মন্ত্র, জিকির এবং বিশেষ ধ্যান চর্চা-এর রূপ নেয়। জাহমিয়াদের পরে(ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ ৬ তে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে) আমার মনে হয় আজ ২০২৪ সালেও এই সূফিরাই সবচেয়ে বড় যুলুম করেছে আক্বীদাহের উপর যা আজও ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভিন্ন ধরণে বিদ্যমান।
ইসলামে ইবাদতের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন বা অতিরিক্ত কিছু করার কোন সুযোগ নাই। এই মর্মে একটি বিখ্যাত হাদিস আনাস ইব্নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ‘ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ‘ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য হতে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সলাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সবসময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, “তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহ্র কসম! আমি আল্লাহ্কে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সলাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫০৬৩
অর্থাৎ বুঝা গেলো যে ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির যে প্রবণতা, এটা রাসুল সাঃ এর যুগেও ছিলো। এবং রাসুল সাঃ তাদেরকে এসব চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে বলেছেন। মূলত এই ধরনের চিন্তা চেতনা থেকেই বিদআত এবং দ্বীনের মধ্যে অতিরঞ্জন, বাড়াবাড়ি সৃষ্টি হয়।
তাবেয়ী যুগে আমের ইবনে আব্দুল্লা ইবনে জুবায়ের নামের একজন ছিলেন যিনি অতিরিক্ত ইবাদত এবং বিশেষ করে কঠোর ইবাদতের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। একসময় তিনি এমন কিছু ইবাদত করছিলেন যা প্রথাগতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবীদের মধ্যে ছিল না, যেমন রাতভর নামায পড়া, দীর্ঘ সময় রোযা রাখা, এবং অন্যান্য অতিরিক্ত আত্মনির্বাসনমূলক কাজগুলো।
আয়েশা রা: এর বোন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) এই বিষয়টি লক্ষ করেছিলেন এবং তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজ করেননি এবং এসব কাজ ইসলামের নির্দেশিত পথে নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যমপন্থী ছিলেন এবং অতিরিক্ত কঠোরতার প্রতি সতর্ক ছিলেন। এই বিষয়টি ইবনে কাসীর এর “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া” (Al-Bidaya wa’l-Nihaya) গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল মধ্যমপন্থা। ইবাদতের ক্ষেত্রেও অত্যধিক কঠোরতা বা ত্যাগ করা পরিত্যাজ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“এই ধর্মকে কঠিনভাবে গ্রহণ করো না, তাহলে তা তোমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১২৩)
এখান থেকেই বোঝা যায় যে, অতিরিক্ত ইবাদত মুসলিম জীবনের আদর্শ নয়, বরং সুষমতা বজায় রাখাই ইসলামিক আদর্শ।
.
২য় হিজরির (৮ম শতাব্দী) পরবর্তী সময়ের একটি ঘটনা। ইব্রাহিম ইবনে আদহাম নামের এক রাজকুমার ছিলেন এবং বসরার ব্যবসায়ী ও সভ্যতার মধ্যে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। এই সেই বসরা যেখানে জাহাম ইবনে সাফওয়ান এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রশ্নে অনুপ্রাণিত হয়ে আক্বীদাহে বিভ্রান্তি ঘটিয়েছিলো। বিস্তারিত ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ (৬) তে উল্লেখ করেছি।
একইভাবে ইব্রাহিম এক দিন বসরায় একটি ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী তাকে দেখতে পেয়ে একটি গভীর বার্তা প্রদান করেন। সন্ন্যাসীটি ইব্রাহিম কে বলেছিলেন, “তুমি যখন খালি হাতে পৃথিবীতে আসো, তখন পৃথিবী থেকে কিছু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না।” এই বার্তা তার মনের গভীরে একটি পরিবর্তন আনে এবং পরবর্তীতে তিনি রাজকীয় জীবন ত্যাগ করেন এবং আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করেন।
__ তাবকাত ইবনে সাআদ
এক রাতে, ইব্রাহিম ইবনে আদহাম যখন তার বাড়িতে ছিলেন, তখন তিনি বাইরে থেকে চাদের শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তখন গভীরভাবে অনুভব করেন যে, তাঁর জীবন তৃপ্তি ও পূর্ণতার জন্য তার জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। এই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছে যে, তিনি একটি ভোগ-বিলাসী জীবনযাপন করছেন এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে আরও গভীর এবং পবিত্র করার জন্য তিনি কিছু বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। তখন তিনি তার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে সিদ্ধান্ত নেন।
আমি জেনে অবাক হলাম যে গৌতম বুদ্ধেরও একই কাহিনি। তিনিও রাজকুমার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে রাজকীয় প্রাসাদ ত্যাগ করে এক নির্জন জীবনযাপনের দিকে এগিয়ে যান।
ইব্রাহিম ইবনে আদহাম ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবেয়ী এবং তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামের জীবন বিধানে বিকৃত আনেন যা এই পোস্টের শুরুর দিকের উল্লেখীত হাদিসের পরিপন্থী এবং রাসুল সাঃ আমাদের এগুলা করতে নিষেধ করেছেন।
বিশল ইবনে আবদুল্লাহ আল-হাফি :-
আল-হাফি (الحَافِي), যার অর্থ “নির্মল পা-ধারী” বা “যিনি খালি পায়ে হাঁটেন”। একদিন বিশল হাফি তার বন্ধুদের সাথে ঘরে বসে আনন্দ-উল্লাস করছিলেন। হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে একজন মুসাফির বা আধ্যাত্মিক দরবেশ দরজা নক করে বললেন,
“এই ঘরের মালিক কি মুক্ত (স্বাধীন) না দাস?”
বিশল ভেতর থেকে জবাব দিলেন,
“তিনি একজন স্বাধীন ব্যক্তি।”
তখন মুসাফির বললেন,
“যদি তিনি স্বাধীন ব্যক্তি হন, তবে কেন আল্লাহর আদেশ পালন করছেন না? তিনি তো তার মালিকের আনুগত্য করতে বাধ্য।”
এই কথাটি বিশল-এর অন্তরে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, “আমি স্বাধীন, কিন্তু আমার জীবন তো আল্লাহর আনুগত্যে কাটানোর কথা। তাহলে কেন আমি আল্লাহর আদেশ থেকে দূরে আছি?”
এরপর তিনি তাওবা করলেন। তাওবা করার পর তিনি বিলাসী জীবন ত্যাগ করেন এবং সারা জীবন খালি পায়ে চলাফেরা শুরু করেন। খালি পায়ে চলাফেরার কারণ ছিল, তিনি মনে করতেন, “আমি এই পৃথিবীতে এক ভ্রমণকারী মাত্র, তাই আমি চাই না পৃথিবীর মাটির আরামদায়ক পথ আমার মনকে ভুলিয়ে দিক।”
এগুলা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং এই ধরণের ঘটনা অনেক সাধু-সন্যাস্যীদের মাঝে দেখা যায়। অমর ভারতী, যিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে তার ডান হাত উঁচু করে রেখেছেন। ১৯৭৩ সালে শিবের প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের জন্য এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে এবং সেই থেকে তাঁর হাতটি উঁচু অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে হাত উঁচু রাখার ফলে তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো কুঁকড়ে গিয়েছে এবং স্নায়ুগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে, ফলে হাতটি আর নামানো সম্ভব নয়। আপনারা “অমর ভারতী” লিখে সার্চ করলে ইউটিউবে পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ আমি বুঝতে চাচ্ছি এই ধরনের ত্যাগ তিতিক্ষা হিন্দু, বৌদ্ধ, সাধু-সন্নাসীদের মাঝে পাওয়া যায়। এগুলা ইসলামের শিক্ষা নয়।

২০০১ সালে কুম্ভ মেলায় অমর ভারতী , ছবি তোলার সময় পর্যন্ত ২৮ বছর ধরে হাত তুলেছিলেন। (wikipedia.org থেকে সংগৃহীত)
রাবেয়া বসরী :-
পুরো নাম রাবেয়া বিনতে ঈসমাঈল আদবিয়া – একজন প্রসিদ্ধ সুফি মহিলা সাধিকা। রাবেয়া আদবিয়া ছিলেন বিখ্যাত নারী সুফি সাধক, যিনি খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীতে (প্রায় ৯৫-১৮৫ হিজরি) বসরায়(বর্তমান ইরাকে) বসবাস করতেন। “আদবিয়া” তাঁর বংশের নাম, এবং বসরায় বসবাসের কারণে তাঁকে রাবেয়া বসরী নামেও ডাকা হয়। ইতিপূর্বে অনেকবার বলেছি এই বসরা হচ্ছে আক্বীদাহে হামলা করার একটা ঘাটি, সুফিবাদের সূতিকাগার। এখান থেকে জাহমিয়া মতবাদ এবং সুফীবাদের উৎপত্তি এটা মনে রাখা জরুরি।
৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়া ছিল উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী। আর উমাইয়া খেলাফতের সময় মুসলিমরা আফ্রিকা, স্পেন, পারস্য এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদ করছিলেন। মিসর তখন মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এবং সেখানে ইসলামের প্রসার, সামরিক অভিযান বেশি চলছিল। এরপর ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আন্দালুস (স্পেন) মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। আর অপরদিকে বসরায় তখন সুফিবাদ আর কালাম শাস্ত্রের চর্চা চলে।
রাবেয়া আদবিয়া ইসলামী সুফিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা “এশকে ইলাহি” বা “আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম” প্রচলিত করেন। তাঁর মতে, আল্লাহর ইবাদত দুই ধরণের হতে পারে:
১/ ভয়ে ইবাদত: জাহান্নামের ভয়ে বা শাস্তির ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করা।
২/ ভালবাসায় ইবাদত: আল্লাহর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার কারণে তাঁর ইবাদত করা।
রাবেয়া বলেছিলেন,
“আমি আল্লাহর ইবাদত করি না তাঁর জান্নাত পাওয়ার জন্য কিংবা জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য। আমি আল্লাহর ইবাদত করি শুধু আল্লাহকে পাওয়ার জন্য।”
কেউ তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি বলেছিলেন,
“আমার দুই প্রভু (আল্লাহ এবং নফস) আছে। আমি আমার নফসকে দমন করতেই ব্যস্ত। তৃতীয় প্রভুর দাসত্ব করার সময় আমার নেই।”
এসমস্ত কথা ইসলামের মূল আদর্শের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক এবং আল্লাহর শানে বেয়াদবি। আমরা আল্লাহর দাস এই কথাটা সর্বদা মনে রাখতে হবে। আল্লাহর সাথে প্রেম হয়না। কিন্তু সুফিবাদ চর্চাকারীদের কাছে এসব কথা খুবই প্রিয় এবং গ্রহনযোগ্য।
এশকে ইলাহির এই ধারণা এসেছে মূলত ভক্তিবাদ (Bhakti Movement) থেকে। ভক্তিবাদের মূল শিকড় প্রাচীন উপনিষদ, ভগবদ গীতা এবং পুরাণসমূহে পাওয়া যায়।
৩য় এবং ৪র্থ হিজরি শতাব্দীতে (১০ম-১১শ শতাব্দী) পীর-মুরিদ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে সুফি সাধকদের অনেক খানকা (আধ্যাত্মিক কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ সেখানে ইবাদত, জিকির এবং আত্মশুদ্ধি করত। পীরকে কেন্দ্র করে এই খানকা পরিচালিত হতো। সুতরাং বুঝতেই পারছেন বাংলাদেশে বর্তমানে এই যে পীর-মুরিদ এবং খানকার যে প্রচলন এর মূল উদ্ভাবক সুফিবাদেরাই।
হারেস ইবনে আসাদ আল-মুহাসিবি নামের একজন ছিলেন যিনি সর্বপ্রথম কালাম (দর্শন) এবং তাসাউফ (সুফিবাদ)-এর সংমিশ্রণ ঘটান। ১৬৫ হিজরি / ৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ তার জন্ম। তিনি আত্মশুদ্ধির জন্য মুহাসাবা (নিজেকে আত্মসমালোচনা করা) ধারণা প্রচলন করেন, যা পরবর্তী সুফি সাধকদের চর্চার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। তার দর্শন আবু হামিদ আল-গাজ্জালি-এর চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। তার প্রশিদ্ধ কিছু গ্রন্থ – আল-রিআয়া লি হুকুকিল্লাহ, কিতাব আল-ফাহম, মাসাইল আল-কুলুব, আদাবুন্নুফুস।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ন পয়েন্ট বলে নেই,
কালাম শাস্ত্রবিদ এবং সূফিবাদ এই দুই গ্রুপের সর্বশেষ স্তর হচ্ছে আল্লহর একত্ব মিলিয়ে ফেলা। যেমন মুতাযিলারা বলে, “আল্লাহ এক এবং আল্লাহর গুণগুলোও একের অংশ”। উদাহরণস্বরূপ: আল্লাহ জ্ঞানী (আলিম) — এখানে “জ্ঞান” (علم) যদি আল্লাহর সত্তার বাইরে আলাদা কিছু হয়, তবে তা আল্লাহর সাথে আলাদা একটি সত্তা হিসাবে গণ্য হবে, যা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এজন্য তারা বলে, আল্লাহর গুণ (সিফাত) আল্লাহর সত্তার সাথে একত্রীভূত। এমন চিন্তা চেতনার উদ্দ্যেশ্য, “আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ) সংরক্ষণ”, শুনতে ভালো হলেও এটা তাদের নিজস্ব যুক্তি-দর্শন যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ নয়। এই ধরণের যুক্তি রাসুল সাঃ কিংবা কোন সাহাবী করেন নাই। আর সূফিবাদের সর্বশেষ স্তর ইতেহাদ(একত্রীকরণ) তখন ঘটে যখন কেউ নিজের আত্মাকে আল্লাহর সাথে এক করে ফেলে যা বিস্তারিত সামনে আসছে।
বাতেনি পরিভাষা :-
সুফিবাদে “বাতেনি” শব্দের অর্থ হলো অন্তর্নিহিত বা গোপন দিক। এটি সাধারণত এমন জ্ঞান, ব্যাখ্যা বা আত্মিক বিষয়কে বোঝায়, যা বাহ্যিকভাবে (যাকে বলা হয় “যাহিরি”) সরাসরি দৃশ্যমান নয়, বরং আত্মার গভীরে লুকানো এবং বিশেষ ধ্যান-জ্ঞান বা আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়।
সুফিরা বিশ্বাস করেন, বাতেনি জ্ঞান শুধুমাত্র মুরশিদ (আধ্যাত্মিক গাইড বা পীর) বা আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, যেমন— মুরাকাবা, মুহাসাবা, রিয়াযাত, যিকির।
ইতিহাসে আবদুল্লাহ ইবনে সাবা-কে অনেক ক্ষেত্রে বাতেনি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি ছিলেন একজন ইহুদি, পরে ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে ইসলামে এসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। তিনি ইমাম আলী (রা.)-কে খলিফার পর আল্লাহর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং গোপন জ্ঞানের ধারণা প্রচার করেন।
পরবর্তীতে “বাতেনি” ধারণা ২য় হিজরি শতাব্দী (৮ম খ্রিষ্টাব্দ)-এ শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হয়। ইসমাইলি শিয়ারা কুরআনের গোপন অর্থ খোঁজার ধারণা দেয়, যা পরবর্তীতে সুফি দর্শনের কিছু ধারায় প্রচলিত হয়।
বাতেনি মতবাদে গ্রীক দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। প্লেটোর “আদর্শ জগৎ” ধারণা অনুযায়ী, দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে একটি “গুপ্ত জগত” রয়েছে, যা শুধু জ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত। এই ধারণাটি বাতেনি মতবাদের সঙ্গে মিলে যায়।
এরপরে সুফিবাদে আরো মারাত্মক কিছু পরিভাষা চালু হয় এবং এই সমকালকে সুফিবাদের শেষ স্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিভাষাগুলো পর্যায়ক্রমে ব্যখ্যা করছিঃ
ফানা ফিল্লা এবং বাকা বিল্লা :-
“ফানা” অর্থ “নিশ্চিহ্ন হওয়া”, “অস্তিত্ব বিলীন হওয়া” বা “ধ্বংস”। আল্লাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হওয়া বা নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে আল্লাহর অস্তিত্বে লীন হয়ে যাওয়া। আর বাকা” অর্থ “চিরস্থায়ী হওয়া”, “অস্তিত্ব লাভ করা” বা “চিরজীবী হওয়া”। আল্লাহর সঙ্গে চিরস্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করা। বাকা হচ্ছে ফানার পরবর্তী স্তর। যখন মুরিদ নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে একীভূত করেন, তখন আল্লাহর গুণাবলী মুরিদের চরিত্রে প্রকাশ পায়।
এই ধারণার শেকড় পাওয়া যায় হারেস আল-মুহাসিবি (মৃত্যু: ৮৫৭ খ্রি.) এবং জুনায়েদ আল বাগদাদী (মৃত্যু: ৯১০ খ্রি.)-এর শিক্ষায়। জুনায়েদ আল বাগদাদী হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি ফানা ফিল্লা এবং বাকা বিল্লা-এর স্পষ্ট দার্শনিক ব্যাখ্যা দেন। তবে বাযিদ বুস্তামি (মৃত্যু: ৮৭৪ খ্রি.)-কেও এই ধারণার প্রচারকদের মধ্যে গণ্য করা হয়। বাযিদ বুস্তামি-এর বিখ্যাত উক্তি, “সুবহানী! সুবহানী!” (গৌরব আমার!), যা ফানা ফিল্লা-এর একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফানা ফিল্লা এবং নির্বাণ (निर्वाण)—দুটি শব্দই অস্তিত্ব বিলীন করার ধারণাকে উপস্থাপন করে। আর এই নির্বাণ হচ্ছে বৌদ্ধ দর্শন যা লাভ করলে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি লাভ পাওয়া যায়। একইভাবে বাকা বিল্লা মূলত “মোক্ষ” (संस्कृत: मोक्ष) শব্দটির অর্থ “মুক্তি”, যা হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। হিন্দু দর্শনে মোক্ষ হল জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সংসার) থেকে চূড়ান্ত মুক্তি। আর সুফিবাদেরা বাকা বিল্লায় পৌছায় আল্লাহর সাথে স্থায়ী সম্পর্ক করার জন্য।
ইতেহাদ :-
সুফি তত্ত্বে, ইতেহাদ বলতে বোঝায়, স্রষ্টা (আল্লাহ) এবং সৃষ্টি (মানব আত্মা) একসাথে এক হয়ে যায়। তখন আত্মা (রুহ) এবং আল্লাহর মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। এই ধারণাটি অনেকটা হিন্দু দর্শনের “অদ্বৈতবাদ” বা “ব্রহ্মাত্মক” দর্শনের সাথে মিলে যায়, যেখানে বলা হয় যে, “জীবাত্মা” (জীবনের আত্মা) এবং “পরমাত্মা” (পরম সত্তা) আসলে একই।
জালালুদ্দিন রুমি তার বিখ্যাত গ্রন্থ “মসনবী-ই-মা’নাভী”-এর প্রথম চরণেই লিখেন “শুনো এই বাঁশির কান্না, যা তার বিচ্ছেদের গল্প বলছে”। বাঁশি (বাঁশের কঞ্চি) গাছ থেকে কেটে বাদ দেওয়া হলে, সে কাঁদতে থাকে। রুমি বলেন, এই বাঁশি হল মানুষের আত্মা। মানুষকে তার আসল উৎস (আল্লাহ) থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, তাই সে বিরহে কাঁদে। এই আত্মিক বিরহ মানুষকে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়। এই গল্পটি ইতেহাদ ধারণার সাথে সম্পর্কিত, কারণ আত্মা (মানব রুহ) চায় আসল গন্তব্যে (আল্লাহ) ফিরে যেতে।
ওয়াহদা :-
সুফিবাদে, ওয়াহদা বোঝায় যে, সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহরই এক অংশ। এটি কিছুটা ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদ (وجود وحدة) ধারণার সাথে সম্পর্কিত, যা ইবনে আরাবি প্রচলন করেন। ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদ বলতে বোঝায়, “সৃষ্টির সবকিছুই আল্লাহর অস্তিত্বের প্রকাশ”। যেমন: সূর্যের আলো এবং সূর্য এক। ঠিক তেমনই, সৃষ্টি এবং স্রষ্টা একই বাস্তবতার প্রকাশ। তবে, সৃষ্টি এবং স্রষ্টা এক নয়, বরং সৃষ্টির ভেতর স্রষ্টার অস্তিত্ব ফুটে ওঠে।
কিছু সুফি মনে করেন যে, ইতেহাদ ও ওয়াহদা একই ধারণার বিভিন্ন দিক। ইতেহাদ বোঝায় “স্রষ্টা-সৃষ্টির একত্রীকরণ”, আর ওয়াহদা বোঝায় “আল্লাহর অস্তিত্ব সর্বত্র বিরাজমান”।
হুলুল :-
হুলুল-এর মূল ধারণা হলো, আল্লাহর সত্তা মানুষের দেহে বা আত্মায় অবস্থান করতে পারে। হুলুল এর ২টা ব্যাখ্যা আছে। একটাতে বলা হয় আল্লাহর একটি গুণ বা আলো (নূর) মানুষের মধ্যে অবস্থান করে, আরেকটাতে বলা হয় আল্লাহ পুরোপুরি মানুষের মধ্যে অবস্থান করেন। যদি ২য় ব্যাখ্যা নেই তাহলে হুলুলের সাথে আবার ইতেহাদের সংঘর্ষ ঘটে। মানে দুইটা একই অর্থ দাঁড়ায়। কিন্তু ১ম ব্যাখ্যা নিলে পুরো বিষয়টা দাঁড়ায় – প্রথমে হচ্ছে হুলুল(আল্লাহর সত্তা বা গুণ মানুষের মাঝে অবস্থান করে), এরপর হুলুল থেকে ইতেহাদে(আল্লাহর সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি একাকার করা) প্রবেশ করে এবং শেষে ওয়াহদাতুল ওজুদ(মহাসংযোগ) আরো চরম পর্যায় পৌঁছে যায়। ওয়াহদাতুল ওজুদ সম্পর্কে একটু পরেই বলছি।
হুলুল মতবাদের শিকড় কিছুটা প্রাচীন দর্শন, যেমন নিও-প্লেটোনিজম (Neo-Platonism), খ্রিস্টান ইনকার্নেশন (ঈশ্বর দেহ ধারণ করেন) এবং হিন্দু ধর্মের “অবতার” ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ(মৃত্যু: ৯২২ খ্রি.) যিনি “আনাল হক্ব” (আমি সত্য) বলে বিখ্যাত হয়েছিলেন এবং তার এই উক্তিটি মূলত হুলুল মতবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেছিলেন, যখন কেউ আধ্যাত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তার আত্মা আল্লাহর সাথে একীভূত হয়ে যায়। এই উক্তির কারণে তাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) ঘোষণা করা হয় এবং ৯২২ খ্রিস্টাব্দে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদ :-
ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদ মূলত ইবনে আরাবী-এর দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণা। তার মতে, সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহরই প্রকাশ বা “তাজল্লি”। অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতীত আর কিছু নেই, এবং সৃষ্টিজগত আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতিফলন। এই ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদ হচ্ছে সুফিবাদের সর্বশেষ স্তর যা তাদের মধ্যে কেও স্পষ্ট ব্যখ্যা করে কেও করেনা বা করতে চায়না। অনেকে ইনিয়ে বিনিয়ে এটাই বলতে চায় যে ওয়াহদাতুল ওয়ুজুদের ধারণা অত্যন্ত গভীর, যা সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য নয়। একে ঠিকভাবে বোঝাতে হলে তাসাউফের (সুফিবাদের) উচ্চতর স্তরের জ্ঞান থাকা দরকার। সাধারন লোকেরা এই ধারণাকে “আল্লাহ এবং সৃষ্টির একত্ব” বলে ভুল বোঝে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে যে রাসুল সাঃ এর কাছ থেকে এই দ্বীন আগত সেই রাসুল সাঃ কি কখনো বলেছেন যে এই দ্বীনের এমন কিছু আছে যা সাধারন মানুষ বুঝতে পারবেনা?
সুফি দর্শনে অনেক বিষয়কে ‘বাতিনী জ্ঞান’ (গোপন বা গুপ্ত জ্ঞান) বলে বিবেচনা করা হয়, যা সরাসরি সবার সামনে প্রকাশ করার জন্য নয়। কারণ, অনেকে এই জ্ঞানকে ভুল পথে নিতে পারে। এই ধরণের গুপ্ত ধারণা কেবল মুরিদ (শিষ্য) এবং মুর্শিদ (গুরু) এর মধ্যে আলোচনা করা হয়। কোত্থেকে আসলো এই বাতিনী জ্ঞান আর পীর মুরিদের এসব ধারনা? শরিয়াত, তারিকাত, মারিফাত, হাকিকত এগুলা কি দ্বীনের নব্য উদ্ভাবন নয়? এগুলা কি রাসুল সাঃ এবং সাবায়ে কেরাম আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন? কয়টি বিষয়কে তারা অস্বীকার করবে যারা সুফিবাদের ভ্রান্ত আক্বীদা গোপন করতে চায়?
ইবনে সাবেইন নামক এক আন্দালুসিয়ান সুফি দার্শনিক তার “বুদ্দ আল-আরিফ” (Budd al-‘Ārif) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করে যে, একদিন ইবনে সাবেইনের একজন ছাত্র একটি কুকুরকে দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, “এই কুকুরই কি সেই(সত্য)?” ইবনে সাবেইন উত্তর দেন, “তুমি সবকিছুকে এক দেখো।” এই উক্তি “ওয়াহদাতুল উজুদ” দর্শনের প্রতিফলন। এখানে ইবনে সাবেইন বলতে চাচ্ছেন, বাস্তবে স্রষ্টা এবং সৃষ্টি আলাদা কিছু নয়। অর্থাৎ, এই সৃষ্টি (যেমন কুকুর) এবং আল্লাহ—এগুলো আলাদা কিছু নয়; বরং সৃষ্টিই স্রষ্টার এক প্রকাশ। নাউযুবিল্লাহ! ইবনে সাবেইন বিশ্বাস করতেন যে, পুরো সৃষ্টিজগত এবং স্রষ্টা একটিই অস্তিত্ব, এবং দৃশ্যমান পার্থক্য কেবল মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য। তার কাছে, দ্বৈততা (Duality) একটি ভ্রম।
কালাম শাস্ত্রের(যুক্তিবাদ) শেষ স্তর আল্লাহর গুণাবলি(সিফাত) একত্র করেছে আর সুফিবাদের শেষ স্তর স্রষ্টা এবং সৃষ্টিকে একত্র(ইতেহাদ) করেছে। কালাম শাস্ত্রের লোকেরা তো যাও আক্বল দিয়ে একটা কিছু করেছে যার মধ্যে যুক্তি আছে। কিন্তু সুফিবাদেরা তাসাওফের সাথে কালাম শাস্ত্র এবং বিভিন্ন দর্শন একসাথ করে কোথায় যে নিয়ে গেছে এর কোন সীমানা নেই। এগুলা নিয়ে আবার অনেকে গর্ব করে বলে সূফীজম অনেক গভীর জিনিস। আসলে এই সূফীবাদের মৌলিকত্ব বলতে কিছু নাই।
ইবনে সিনার দর্শন অনুযায়ী, গোটা জগতকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত এক শৃঙ্খল বা ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়। এই ধারাবাহিকতায় একটির থেকে আরেকটি সৃষ্টি হয়, যার চূড়ান্ত উৎস হল “ওয়াজিবুল ওজুদ” বা আল্লাহ। এই সৃষ্টির ধারায় “দশটি আক্বল” (দশটি বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা) থাকার কথা বলা হয়। এগুলোর মধ্যে, নবম আক্বলকে “জিব্রিল” বা “রূহুল কুদস” হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইবনে সিনার মতে, এই নবম আক্বল হল সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ বা ওহি (প্রকাশ) নবীদের কাছে পৌঁছায়। যারা এই ব্যাখ্যা জীবনের প্রথম শুনেছে তাদের কাছে বিষয়টি খুব অসাধারণ মনে হবে। অথচ এই দশটি আক্বলের ধারণা নিউপ্লেটোনিক দর্শনের “এমানেশন” (নিঃসরণ) তত্ত্ব থেকে গৃহীত।
সুফিবাদের আরো কিছু..
মাওলানা জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (১২০৭-১২৭৩) ছিলেন একজন বিশিষ্ট পারস্যের সূফী। তার কাব্যগ্রন্থ “মসনবি-ই-মানাভি” এবং গভীর আধ্যাত্মিক ও সুফীবাদী শিক্ষার জন্য পরিচিত। শামস তাবরিজি নামক এক আধ্যাত্মিক গাইডের (মুরশিদ) সাথে সাক্ষাতের পর তার জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আসে।
শামস-ই-তাবরিজি (Shams-e-Tabrizi) ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক গুরু এবং সূফী সাধক। যিনি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির আত্মার জাগ্রতকারী হিসেবে পরিচিত। এই ব্যাক্তি বাহ্যিক ধর্মচর্চার পরিবর্তে আত্মার মুক্তি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি-কে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের কোনিয়া নগরে শামস-ই-তাবরিজি প্রথমবার রুমির সাথে দেখা করেন।
শামস রুমিকে প্রশ্ন করেন:
– “হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বড় নাকি বায়েজিদ বসতামি বড়?”
– রুমি উত্তর দেন, “নবী (সাঃ) অবশ্যই বড়।”
– তখন শামস বলেন, “তাহলে কেন বায়েজিদ বলেন ‘আমি মহান’ (انا الحق), আর রাসূল (সাঃ) বলেন ‘আমি আল্লাহকে পুরোপুরি চিনতে পারিনি’?”
এই প্রশ্ন রুমির আত্মায় এক ঝাঁকুনি দেয়। তিনি অনুভব করেন, শামস তাবরিজি একজন সাধারণ ব্যক্তি নন। এই প্রথম রুমি আত্মার গভীরতায় প্রবেশ করার একটি পথ খুঁজে পান।
এই ঘটনা “মাকালাত-ই শামস-ই-তাবরিজি”, “ফিহি মা ফিহি” গ্রন্থ সহ বহু জীবনীগ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে।
রুমির একটি বিখ্যাত উক্তিঃ
“খোদ বা খোদা আল্লামা রুমি হার কামেল না শুদ, আ গুলামে শামসে তাবরিজি এনা শুদ।” অর্থ: “আল্লামা রুমি কখনো পূর্ণ বা ‘কামেল’ হতে পারেননি, যতক্ষণ না তিনি শামস তাবরিজির গোলাম হন।”
এই উক্তিটির গভীর তাৎপর্য হলো, মাওলানা রুমি একজন জ্ঞানী আলেম এবং ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন, কিন্তু শুধুমাত্র পাণ্ডিত্য বা বাহ্যিক শিক্ষা তাকে “কামেল” বা পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার স্তরে পৌঁছাতে সক্ষম করেনি। তিনি শামস তাবরিজির শিষ্য হওয়ার পরই তার আত্মা জাগ্রত হয় এবং তিনি সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতার স্বাদ পান।
বলা হয়ে থাকে, শামস তাবরিজি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর রুমি গভীর শোক ও ভালোবাসার অনুভূতিতে “মসনবি-ই-মানাভি” নামক কালজয়ী কাব্য রচনা করেন।
সুফি নাচ এবং ঘূর্ণায়মান নাচের প্রবর্তক হিসেবে সাধারণত জালাল উদ্দিন রুমি-কে গণ্য করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসার গভীর অনুভূতিকে প্রকাশের জন্য নাচ, সংগীত এবং কাব্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রুমির শিক্ষা অনুসরণ করে তুরস্কে মেভলভি তরিকা (Mevlevi Order) গড়ে ওঠে, যা ঘূর্ণায়মান নাচের জন্য বিখ্যাত। মেভলভি সূফীরা বিশেষভাবে সামা নাচ এবং সঙ্গীত ব্যবহার করে।
গানের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি প্রেম এবং পয়গাম পৌঁছানোর প্রচলন আছে চিশতিয়া তরিকায়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সুফি সাধক এবং মাইজভাণ্ডারী তরিক্বার প্রতিষ্ঠাতা গাউসুল আজম আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (১৮২৬-১৯০৬) -তেও আমরা সংগীত চর্চা দেখতে পাই।
“তরিক্বা” (আরবি: الطريقة) শব্দের অর্থ পথ, পদ্ধতি বা দর্শন। সুফি ধারায় সবচেয়ে প্রাচীন তরিক্বা হচ্ছে কাদরিয়া তরিক্বা। এছাড়াও চিশতিয়া তরিক্বা, নকশবন্দিয়া তরিক্বা, সুহরাওয়ার্দিয়া তরিক্বা, শাযেলিয়া তরিক্বা, মুজাদ্দিদিয়া তরিক্বা, রিফাইয়া তরিক্বা সহ ১২ থেকে ১৫টি প্রধান ও প্রতিষ্ঠিত তরিকা এবং এর শাখা উপশাখার তো হিসাবই নাই। অথচ ইসলামে একটা মাত্র তরিক্বা যা রাসুল সাঃ আমাদের দিয়ে গেছে। যিনি একমাত্র এবং সর্বশেষ পথ প্রদর্শক।
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, গাউসুল আজম একটি আরবি পরিভাষা যা মূলত “প্রধান সাহায্যকারী” বা “মহান সাহায্যকারী” হিসেবে অনুবাদ করা হয়। উল্লেখিত অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বড় সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা। কোনো মাখলুক বড় সাহায্যকারী হতে পারে না। কোনো মাখলুককে কেউ যদি বড় সাহায্যকারী মনে করে তাহলে তা সুস্পষ্ট কুফরী হবে। সুতরাং কোনো মাখলুকের জন্য উক্ত উপাধি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
সূফীবাদে আরো অনেক অনেক পরিভাষা আছে। ঘাটলে আরো কত যে তত্ব কত যে ব্যাখ্যা বের হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই। যেমন কিছু সূফি তত্ত্বে ফেরাউনের অহংকারকে (أنا ربكم الأعلى — “আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রভু”) আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাদের মতে, ফেরাউনের এই দাবি ছিল আত্ম-উপলব্ধির একটি বিকৃত রূপ, যা “নিজের ভেতরে আল্লাহকে খোঁজার” প্রচেষ্টার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যা প্রধানত ইবনে আরাবি এবং মানসুর আল-হাল্লাজের মতো সূফি দার্শনিকদের রচনায় পাওয়া যায়। ইবনে আরাবি তার “ফুসুস আল-হিকাম” (حكمة الفصوص) গ্রন্থে এবং মানসুর আল-হাল্লাজ তার বিভিন্ন কবিতা ও রচনায় এই ধরনের ধারণা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ফেরাউনের অহংকার ছিল সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার উপস্থিতি উপলব্ধির একটি বিকৃত প্রচেষ্টা।
অথচ ফেরাউন সম্পর্কে কোরআনে অসংখ্য সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছে, সূরা গাফির (40:46): আগুনে শাস্তি দেওয়া এবং কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি। সূরা ইউনুস (10:90-92): ফেরাউনের মৃত্যুর সময় ঈমান গ্রহণের চেষ্টা, কিন্তু তা গৃহীত হয়নি।
ফেরাউনের মৃত্যুর সময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) তার মুখে কাদা ঢালছিলেন। ফেরাউনের পাপ এতটাই চরম ছিল যে, জিব্রাইল (আ.) চাইতেন না সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ পায়। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, ফেরাউন যতই অহংকারী হোক, শেষ মুহূর্তে তার ভয় ছিল এবং সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে চেয়েছিল।
__সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৯৬।
আমি আরো জেনে অবাক হলাম আহমেদ আর বুনি (Ahmed al-Buni) নামের একজন সুফি সাধক “শামা ইল-ইশরা” (Shams al-Ma’arif) গ্রন্থ লিখে যা জাদুবিদ্যার শাস্ত্র নিয়ে! আমি বলছিনা যে তাসাউফের সাথে জাদুবিদ্যার সম্পর্ক আছে কিন্তু তাসাউফের শেষ স্তর সম্পর্কে তো আমরা জানলাম এবং একটা সাধনার পিছনে যদি কোন ভিত্তি না থাকে তাহলে সেটা কত ভয়ঙ্কর রাস্তা তৈরি করতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
Leave a Reply