বাংলাদেশে ইসলামের আগমন কয়েকটি ধাপে ঘটে। এসব ধাপে বিভিন্ন ব্যক্তি, দল এবং পরিস্থিতি কাজ করেছে। সাধারণত চারটি প্রধান উৎসের মাধ্যমে ইসলাম এখানে প্রচারিত হয়:

১/ সাহাবিদের আগমন (৬৫০-৭০০ খ্রিস্টাব্দ) — সর্বপ্রথম প্রচারক
২/ আরব বণিকদের মাধ্যমে (৭ম-৮ম শতাব্দী)
৩/ সুফি-দরবেশ ও পীরদের প্রচার (১০ম-১৩শ শতাব্দী)
৪/ তুর্কি-মুসলিম বিজয় ও মুসলিম শাসকদের আগমন (১২০৪ খ্রিস্টাব্দ)

ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইসলাম সর্বপ্রথম আসে হজরত তামিম আদ-দারি (রাঃ) এবং কিছু সাহাবি আরব থেকে চট্টগ্রাম ও সন্নিহিত অঞ্চলে আসেন। যদিও এটি নিয়ে মতবিরোধ আছে, তবে কিছু গবেষক বিশ্বাস করেন যে সাহাবিদের আগমনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ইসলাম প্রবেশ করে।

৭ম থেকে ৮ম শতাব্দীর মধ্যে আরব বণিকরা (যারা মুসলিম ছিলেন) চট্টগ্রাম, সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসা করতেন। এ সময় চট্টগ্রাম ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের আরাকান ও রামু অঞ্চলে অনেক মসজিদের নিদর্শন পাওয়া যায়, যা ৮ম-৯ম শতাব্দীতে নির্মিত বলে মনে করা হয়। চট্টগ্রামে “জাহাজি মসজিদ” নামে কিছু পুরনো মসজিদ রয়েছে, যা আরব বণিকদের আগমনের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।

তৃতীয় পর্যায়ে আসে সুফি-দরবেশরা। ১০ম-১৩শ শতাব্দীতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সুফি-দরবেশরা বাংলাদেশে আসেন। সুফি-দরবেশরা মূলত মানুষের হৃদয়কে নরম করার জন্য তাওহীদের দাওয়াত, আখলাকি শিক্ষা এবং শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। এই সময়েই আমরা শাহ সুলতান বলখী (রহঃ), শাহ জালাল (রহঃ), শাহ পরান (রহঃ) এবং শাহ মাখদুম রূপোশ (রহঃ)-এর নাম শুনতে পাই।

বাংলাদেশে ইসলামের চতুর্থ পর্যায়টি শুরু হয় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি-এর মাধ্যমে। তিনি লখনৌতি (গৌড়) বিজয় করেন এবং বাংলা অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন।

অনেকে দাবি করেন, পীর-আউলিয়ারা বাংলাদেশে ইসলাম এনেছেন, যা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশে ইসলাম সাহাবিদের মাধ্যমে, আরব বণিকদের মাধ্যমে এবং সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে আসে। শাহ জালাল (রহ.) একজন মহান প্রচারক ছিলেন, কিন্তু তিনি সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারক নন।

বাংলাদেশে বর্তমান ইসলামিক কালচার :-

পীর আউলিয়ারা বাংলাদেশে ইসলাম সূচনা করেছে এই দাবির মাধ্যমে এই বিশেষ দলের লোকেরা আসলে কি হাসিল করতে চায় তা মুটামুটি সবার জানা। বাংলাদেশে প্রত্যেকটি পীরের দরবার আছে। পীর মানেই দরবার, পীর মানে মাজার, পীর মানে লালশালু, পীর মানে সবুজ কাপড়, পীর মানে ভক্তবৃন্দের অন্ধভক্তি। এই বিষয়ে কথা না বাড়িয়ে একটা হাদিস কোট করতে চাই,

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“আল্লাহ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল।”
সহিহ বুখারি (হাদিস: 435), সহিহ মুসলিম (হাদিস: 529)

বাংলাদেশে মুশাব্বিহা(সাদৃশ্যকারী) আক্বীদাহর বিস্তার ব্যাপক। খুব কমন একটা উদাহরণ হচ্ছে, কিছু মাজারপন্থিরা বলে যে আল্লাহ আমাদের ডাক সরাসরি শুনেন না। যেমনটি আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি যেতে পারিনা। তাদের কাছে যেমন বার্তা পৌঁছাতে মাধ্যম লাগে তেমনি আল্লাহর কাছে বার্তা পৌঁছাতে পীর আউলিয়ার মাধ্যমে পৌছানো লাগে।

বাংলাদেশের রাস্তায় অলীতে গলিতে “কুতুব”, “গাউস” ইত্যাদি শব্দ হরহামেশায় চোখে পড়ে যার অর্থ হচ্ছে ঐ ব্যাক্তি(যে ব্যাক্তির নামের পাশে এসব শব্দ থাকে) আল্লাহর সাহায্যকারী বা যিনি পৃথিবীর আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু, বা আধ্যাত্মিকভাবে পুরো বিশ্বের পরিচালনাকারী ইত্যাদি। যা স্পষ্ট শিরক।

বংলাদেশের সাধারন মানুষ এখনো সঠিক ইলমের চর্চায় নাই এবং সঠিক ইলমের সন্ধানও জানা নাই এর প্রমান হচ্ছে মক্কা-মদিনার ইলম বিমুখিতা। বাংলার মানুষ মক্কা-মদিনায় হজ্জ করতে যায় ঠিকই কিন্তু মক্কা-মদিনার ইলম গ্রহন করতে নারাজ। অথচ মক্কা-মদিনা সম্পর্কে স্পষ্ট হাদিস আছেঃ

“এক সময় আসবে যখন মানুষ মদিনায় জ্ঞানের খোঁজে যাবে, যেমন সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে যায়।”
(মুসনাদ আহমদ: 14233)

“দাজ্জাল মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। এই দুই জায়গায় ফেরেশতারা পাহারা দেবে।”
(বুখারি: 1881; মুসলিম: 2943)

মদিনা সব সময়ই ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। নবী করিম (সা.)-এর জীবদ্দশা এবং তাঁর পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে মদিনা ইলমের উৎস হয়ে উঠেছিল। অথচ আমাদের দেশের মানুষ মক্কা-মদিনার সাথে সৌদি আরব এক করে গুলিয়ে ফেলে। সৌদির গান-কন্সার্ট দেখে মক্কা-মদিনার দিকে নাক শিটকায়। অথচ মদিনা হবে সেই নিরাপদ স্থান, যেখানে মানুষ শেষ আশ্রয়ের জন্য জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা খুঁজবে যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এবং বর্তমানে মদিনায় ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদে নববী এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলামের খাঁটি জ্ঞান প্রচার করে চলেছে।

বাংলাদেশে সঠিক ইলমের চর্চা থেকে দূরে রাখার পিছনে আছে অনেক বড় প্রোপাগান্ডা। যা বর্তমানে মানুষ ইন্টার্নেটের মাধ্যমে আলহামদুলিল্লাহ একটু হলেও ধরতে পারছে। কারন বক্তারা যাই বলে তা এখন রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তীতে সেটা কোরআন হাদিসের সাথে যাচাই বাছাই করার সুযোগ হচ্ছে।

ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ইলমকে (জ্ঞান) মানুষের অন্তর থেকে উঠিয়ে নেবেন না। বরং ইলম উঠিয়ে নেবেন আলেমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। এমনকি যখন কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন লোকেরা মূর্খদের নেতা বানাবে। তাদের কাছে (ধর্মীয়) প্রশ্ন করা হবে এবং তারা অজ্ঞতাবশত ফতোয়া দিবে, ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।”
সহিহ বুখারি: হাদিস নম্বর ১০০, ৭৩০৭

তাহলে এই হাদিসকে সামনে রেখে আমরা যদি বাংলাদেশ ইসলামি কালচারকে বিচার করি যে, আমাদের আলেমরা কি আমাদের সঠিক ইলম দিচ্ছে কিনা? তখন আপনি মানদন্ড হিসেবে কোনটা নিবেন?

বাংলাদেশে সঠিক ইলমের চর্চায় যে স্বাধীনতা নাই এর প্রমান হচ্ছে পিস টিভি বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর বাংলাদেশে যে বিদআতী এবং মাজার পুজারিদের প্রভাব ব্যাপক এর প্রমান মিজানুর রহমান আজহারীর বাংলাদেশ ত্যাগ। আমরা কি কিছু করতে পেরেছি এর বিরুদ্ধে? না! কারন অজ্ঞতা একটা অভিশাপ যার ফল সমগ্র দেশ জুড়ে ফল ভোগ করছে। এগুলা নিয়া কথা বললে আবার অনেকে বলে ঐক্য নষ্ট হচ্ছে। অথচ ঐক্যের ভিত্তি কি সেটা জিজ্ঞেস করলে বলতে পারেনা। বলে অমুসলিম আর ইহুদি নাসারাদের চাল, যা অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন একটা কথা।

ঐক্যের ভিত্তি হলো আক্বীদাহ ও মানহাজ। আক্বীদাহ ঠিক থাকলে সে মুসলিম। এবং মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই। আক্বীদাহে শিরক থাকলে তো সে মুসলিমই থাকেনা। ঐক্য আসবে কোত্তেকে?

আমাদের দেশে হানাফি মাজহাবেরও ব্যাপক প্রভাব। ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আবু জাফর আত-ত্বহাবির আক্বীদাহ ছিলো সেইম, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মূল আক্বীদা। তিনি মিশরে থাকায় তার আক্বীদাহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে, মাতুরিদি সমরকন্দে থাকায় ভারত, বাংলাদেশ, ও পাকিস্তানে মাতুরিদি আক্বীদা প্রসারিত হয়। এর প্রভাব আমাদের দেশে মাতুরিদি আক্বীদাহ বিস্তার লাভ করেছে। এবং এর প্রমান হচ্ছে, আমাদের দেশে আবু হানিফার মাযহাব বহুল প্রচলিত থাকা সত্বেও আল-আকীদাহ আত-ত্বহাবিয়া ও আল-ফিকহুল আক্ববার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, “যদি কোনো সহীহ হাদিস পাওয়া যায়, তবে সেটাই আমার মাযহাব।” অথচ সহিহ হাদিসকে উপেক্ষা করে আমাদের দেশে চলে অন্ধ তাকলীদ।

বাংলাদেশে শির্ক ও বিদআতের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কথা বলা এবং মানুষকে তাওহিদের দাওয়াত দেওয়া মূলত শুরু হয়েছিল শাহ ইসলাম এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহর শিক্ষার অনুসারীদের মাধ্যমে। এর ধারাবাহিকতায় মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের তাওহিদি আন্দোলনের প্রভাব বাংলার কিছু আলেমের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল তাওহিদের বিশুদ্ধ ধারণা প্রচার করা এবং মানুষের মধ্যে প্রচলিত শিরক, বিদআত এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো। এরপর তাঁর বিরোধীরা “ওহাবি” নামের প্রচলন শুরু করে যা আজও বিদ্যমান। বাংলাদেশে কাওকে “ওহাবি” বললেই বুঝবেন সে শির্ক ও বিদআতের বিরুদ্ধে বলেছে।

এছাড়াও বাংলাদেশে জোরে আমীন উচ্চারণ করে বলা, ২০ রাকাত তারাবীহ পড়া, বুকের উপর হাত বাঁধার মত মুস্তাহাব বা সুন্নাহ আমল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং বিভেদ সৃষ্টি প্রমান করে যে বাংলাদেশে ইসলামি ইলম চর্চা এতটা সুবিধার নয়। এসব ছোট বিষয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বক্তারা দ্বীন বুঝানোর পরিবর্তে হাওয়া-হাওস (নিজের প্রবৃত্তি) অনুসরণ করে এবং মানুষকে বিভক্ত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু বিষয়কে বড় ইস্যু বানিয়ে ফেলেন।

এবং এর পরিণামও ভালো নয় যা পরবর্তীতে হয়ত সবার উপর এসে পড়বে। নবী (সা.) বলেছেন,
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের ধ্বংসের কারণ ছিল, তারা ছোট বিষয়গুলোতে তর্কে লিপ্ত হতো।”
(সহিহ মুসলিম: 2666)

এছাড়াও,
বাংলাদেশে কাদ্বিয়ানি গ্রুপের ব্যাপক প্রভাব,
বাংলাদেশে হিজবুত তাওহীদের প্রভাব,
বাংলাদেশে দেওয়ান বাগীর অবাধ বিচরণ, যে কিনা বলে সে আল্লাহর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে, আল্লাহ তাকে নিয়া চিন্তিত, মা ফাতেমা তার স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহ)! কেও কিছু করতে পেরেছে এদের বিরুদ্ধে?

বাংলাদেশে খ্রিস্টান মিশনারীর ব্যাপক প্রচার সম্ভব হয়েছে একমাত্র আক্বীদাহ জ্ঞানের অভাবের কারনে।

চলবে..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *