ফরাসি বিপ্লবের আগে বেশিরভাগ সমাজেই শাসনব্যবস্থার কেন্দ্র ছিল ধর্ম এবং রাজতন্ত্র।
● ইউরোপের রাজতন্ত্রগুলো খ্রিস্টান ক্যাথলিক গির্জা এবং পরবর্তীতে প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। রাজারা দাবি করতেন যে তাদের শাসন ঈশ্বর প্রদত্ত (Divine Right of Kings)। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন গির্জা, রাজাদের বৈধতা দিত এবং জনগণকে শাসকের প্রতি আনুগত্য শেখাত।
● মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম ধর্ম প্রচলিত ছিল, শাসনব্যবস্থা ছিল খিলাফত, সুলতানাত, বা রাজতন্ত্রের রূপে। ইসলামে শাসকদের বৈধতা সরাসরি ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে না হলেও, শাসন ইসলামী আইন (শরীয়াহ) দ্বারা পরিচালিত হতো।
● ভারত ও এশিয়া: ভারতে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল হিন্দুধর্ম এবং পরে ইসলামের আবির্ভাব(মুঘল যুগ)। চীনে শাসনব্যবস্থা মূলত কনফুসিয়ানিজম এবং তাওবাদী নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
এরপর সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন যুগের মূল আদর্শগুলো হচ্চে — মানবতাবাদ, যৌক্তিকতা, নিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা ও সার্বজনীনতা। এসকল আদর্শ ইউরোপের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, এবং সংস্কৃতিকে আমূল পরিবর্তন করে আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি স্থাপন করে ঠিকই কিন্তু অন্যদিকে সমাজে নাস্তিক্যের চর্চা বেড়ে সেটা প্রকাশ্যে চলে আসে এবং সেই সাথে এই আদর্শের বিরোধী হিসেবে কাউন্টার এনলাইটেনমেন্টের ধারণাগুলোও উঠে আসে, যা জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও এলিটিজমের মতো মতবাদগুলোর জন্ম দেয়, এবং এই দ্বন্দ্ব আজও সমাজে বিদ্যমান। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবো পরের পোস্টে ইনশাল্লাহ।
মধ্যপ্রাচ্যে তখনও উসমানীয় খিলাফত (Ottoman Caliphate) শাসন করছিল। ফরাসি বিপ্লবের গণতন্ত্র বা সেক্যুলারিজমের আদর্শ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করেনি, নেপোলিয়নের মিশর অভিযান (১৭৯৮) এই অঞ্চলে ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী চিন্তাধারার প্রথম সূচনা ঘটায়। ইউরোপীয় আধুনিকতার প্রতিক্রিয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী পুনর্জাগরণবাদ (Islamic Revivalism) বৃদ্ধি পায়। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব এবং তার অনুগামীদের প্রচেষ্টায় সালাফি বা ওহাবি আন্দোলনের উত্থান ঘটে, যা ইসলামের বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল।
আর এদিকে ১৭৫৭ সালে প্লাসির যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতে তাদের শাসনের ভিত্তি তৈরি করে। ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপে গণতন্ত্র এবং সেক্যুলারিজম জনপ্রিয় হলেও, উপনিবেশ হিসেবে ভারত ব্রিটিশদের দ্বারা শোষিত হতে থাকে। ভারতের শাসনব্যবস্থায় সেক্যুলার ধারণা সরাসরি স্থান পায়নি। তবে ব্রিটিশ আইনের প্রভাব এবং পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ে।
.
ইসলামি আক্বীদাহ সিরিজ লিখতে গিয়ে এভাবে ইতিহাস টেনে আনার কারন হচ্ছে এই সিরিজ যত সামনে আগাবে ততই আমরা বুঝতে পারবো যে বর্তমানে সকল বিভক্তির মূল কারণগুলোর আসল গোড়া উৎপত্তি কোথায় ছিলো। খুব কমন একটা প্রশ্ন সাধারন মানুষদের মনে থাকে যে, ইসলামে কেন এত দল এবং বিভক্তি। এই কেন এর উত্তর খুজতে গিয়ে আমারও ইতিহাস জানতে হয়েছে। তাই আমি চেষ্টা করবো শুধু প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটগুলো তুলে আনতে।
তবে আমাদেরকে জানতে হবে। সহিহ আক্বীদাহ একজন মুসলিমের বিশ্বাস এবং কাজের ভিত্তি স্থাপন করে। তাই সহিহ আক্বীদাহ সম্পর্কে একজন মুসলিমের এলেম অর্জন করা ফরয। ভুল আক্বীদাহ থেকে বাঁচার জন্য ভুল আক্বীদাহ সম্পর্কে জানতে হবে, যেহেতু আমাদের সমাজে ভুল আক্বীদাহের ছড়াছড়ি। সহিহ আক্বীদাহই হচ্ছে দ্বীন ইসলাম বা ইসলামের মূল ভিত্তি।
Leave a Reply